bangladesh-militia-beating-man-3
আপনি যদি আজকে সকালের খবরের কাগজটি পড়েন, নিশ্চয়ই চোখে পড়বে আমাদের নিজের দেশ এবং পৃথিবীর যে কোন দেশেই সরকারী বাহিনী কর্তৃক মানবাধিকার লঙ্ঘনের কোন একটি নিউজ। ক্রসফায়ার থেকে শুরু করে গুয়ান্তানামো কারাগার – পৃথিবীর বেশির ভাগ দেশেই এ ধরণের অত্যাচার একটি নৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। আজকের আলোচনার শুরুতে সদ্য কারামুক্ত আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের কারাভোগের কাহিনী (আমার দেশ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত) থেকে তাঁর ভাষাতেই দু’টি ছোট ঘটনা উল্ল্যেখ করতে চাই।
১. প্রথম গল্পটি একজন উঠতি মাস্তানের বড়ই হ্রস্ব জীবনের কাহিনী। কলেজের গন্ডি পেরুবার পর চাকরী জোটেনি, বিন্তু প্রেম করে ঘরে বউ নিয়ে এসেছিল, এক পুত্র সন্তানের পিতাও হয়েছিল।বড় মাস্তানদের ফুট-ফরমায়েশ খাটা আর ছোটখাটো অপরাধই ছিল তার আয়ের একমাত্র পথ। একদিন আইন-শৃংখলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়ায় অবধারিতভাবে তাকে যেতে হল রিমান্ডে। সেখানে নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচার জন্য যে টাকা-পয়সার দরকার, তার সংস্থান দরিদ্র পরিবারটির ছিল না। শুরু হল মার। প্রথমে হাত, পা,বুট ব্যবহৃত হল। এরপর লাঠি, সবশেষে দেশি ও বিদেশী নানা রকম যন্ত্রপাতি। অস্ত্রপাতির সন্ধানে চলা এ নির্যাতনের মাত্রা বাড়লো, এক সময় অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে মারা গেল ছেলেটি। তার স্থান হল নিখোঁজদের খাতায়। মৃতদেহ গায়েব করে ফেলার বন্দোবস্ত সহজেই হয়ে গেল। ঝামেলা বাঁধালো অবুঝ স্ত্রী।সে মনে করে, তার স্বামী এখনও বেঁচে আছে। অল্প বয়সী মেয়েটি কোলের বাচ্চাটিকে কাঁখে নিয়ে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ক’দিন পরপরই স্বামীর খোঁজে আসে। স্বামীর বন্ধুদের কেউ কেউ এখনও জেলে আছে। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে সে তাদের সাথে দেখা করে পঞ্চগড়, নেত্রকোণা বা অন্য কোন জেলা কারাগারে। স্বামী বন্দি হয়ে আছে এমন উড়ো খবর দিয়ে স্বামীকে খুঁজে দিতে অনুরোধ করে। সেসব অচেনা জায়গায় নিজেই গিয়ে খোঁজ করবে কিনা, সেই পরামর্শও চায়। পুলিশ হেফাজতে একসাথে বন্দী থাকা অবস্থায় যে বন্ধুটির সামনে হতভাগা, পথভ্রষ্ট সেই তরুণটি চিরতরে চোখ বুঁজেছিল, সে বন্ধুটির সাথে জেলে আমার দেখা হয়েছিল। বন্ধুপত্নীকে সত্য কথাটা বলবে নাকি, পরামর্শ চাইলে আমি কোন জবাব দিতে পারিনি। চুপ করে সেই মাস্তান ছেলেটির অশ্রুভরা চোখের দিকে তাকিয়ে থেকেছি।
২. দ্বিতীয় গল্পের মূল চরিত্র জেলের ভাষায় একজন টিটি – টপ টেরর। প্রায় আট বছর জেলে থাকাকালে সহবন্দিদের কাছে অপরাধ জগত ছেড়ে দিয়ে বিদেশ চলে যাবার স্বপ্নের কথা বলেছে বহুবার।নিজের অতীত কর্মকান্ড নিয়ে অহরহ অনুতাপ করত। পথভ্রষ্ট ছেলেকে অন্ধকার জগৎ থেকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টায় সর্বস্ব বিক্রি করে বিদেশ পাঠানোর প্রস্তুতিও নিয়েছিলেন মধ্যবিত্ত পিতা। ছেলের জেল থেকে মুক্তি পাবার দিন উৎকন্ঠিত পিতা অপো করছিলেন জেল গেটের বাইরে। ছেলে জেল থেকে বেরুলেই তাকে সঙ্গে নিয়ে বাড়ি ফিরবেন, যেখানে প্রিয়জনেরা ব্যাকুল হয়ে অপোর প্রহর গুণছে।তরুণটি জেল গেট থেকে বের হয়েই দেখলো, সাক্ষাত মৃত্যু ওৎপেতে বসে আছে। ভয়ার্ত কন্ঠে চিৎকার করে আবার জেল গেটের ভিতরে ফিরে আসার চেষ্টা করল। ততক্ষনে জেল গেটের দরজা বন্ধ হয়ে গেছে। এলিট বাহিনীর সদস্যরা অপেক্ষমান দামী গাড়ি থেকে দ্রুত নেমে এসে শিকারের দু’হাত ধরল। পিতার চোখের সামনেই ঘটছে এই নাটকীয় দৃশ্য। ছেলেকে রা করার জন্য উদভ্রান্তের মত নিরাপত্তা রীদের কর্ডন ভেঙ্গে ছুটে আসার চেষ্টা করলেন। এক ধাক্কায় তাকে ফেলে দেয়া হল রাস্তায়। সদ্য কারামুক্ত টপ টেররকে ততনে টেনেহিঁচড়ে গাড়ীতে ওঠানো হয়েছে। অনেক কষ্টে বৃদ্ধ পিতা উঠে দাঁড়ালেন, চলন্ত গাড়ির পেছন পেছন দৌড়ানোর ব্যর্থ চেষ্টাও করলেন। যন্ত্রের গতির কাছে স্বাভাবিকভাবেই মানুষের গতি পরাস্ত হল। পরের দিনের সংবাদপত্রে সেই অতিপরিচিত গল্প। সন্ত্রাসীদের সাথে আইনশৃংখলা বাহিনীর বন্দুকযুদ্ধে আরও একজন টপ টেরর নিহত, সংঘটিত স্থান  থেকে একটি আগ্নেয়াস্ত্র এবং কয়েক রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়েছে, ইত্যাদি ইত্যাদি। পুত্রহারা পিতা অনেক সাহস করে সত্য ঘটনা জানানোর জন্য সংবাদ সম্মেলন করেছিলেন। সেখানে কান্নারুদ্ধ কণ্ঠে প্রকৃত ঘটনা তুলেও ধরেছিলেন। কিন্তু রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে একাকী নাগরিকের প্রতিবাদ অব্যাহত রাখা যায় নি। পরিবারের অন্যান্য সদস্যদেরও একই পরিণতির হুমকিকে উপেক্ষা করা সম্ভব হয়নি। এক পুত্র গেলেও অন্য পুত্র, কন্যা, কন্যা জামাতারা তো রয়েছে।তাদের প্রতিও তো পিতার কর্তব্য রয়েছে।
মর্মস্পর্শী এ কাহিনীগুলো বাংলাদেশের সাম্প্রতিক বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মানবাধিকার লংঘনের একটি চিত্র তুলে ধরেছে। ক’দিন আগেও র‌্যাবের গুলিতে লিমন নামক এক তরুণের পঙ্গুত্ব বরণ করা নিয়ে দেশে তোলপাড় পড়ে গিয়েছিল। ইতিপূর্বে কমিশনার চৌধুরী আলমকে নিয়েও এ ধরণের আলোড়ন পড়ে গিয়েছিল, অজ্ঞাত পরিচয়ের গোয়েন্দা দিয়ে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া মানুষটির সন্ধান আজও মিলেনি। এছাড়াও ভিন্ন মতাবলম্বী রাজনৈতিক দলগুলোকে দমন করতে ব্যবহৃত হচ্ছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও গোয়েন্দা বিভাগ। গোলাম মর্তুজা নামক একজন ছাত্রনেতা, মুফতী আমিনীর ছেলে সহ আরও অনেক ব্যক্তিকে সাদা পোশাকের গোয়েন্দা সদস্যরা গ্রেফতার করে নিয়ে যান, তাদের উপর চালানো হয় চরম নির্যাতন। দীর্ঘ সময় পর কেউ কেউ মুক্তি পান, আবার কেউ চিরতরে হারিয়ে যান। মূলত সার্বিক ভাবে দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি এখন বিগত সময়ের চেয়ে অনেক ভয়াবহ পর্যায়ে রয়েছে। এ থেকে বেরিয়ে আসতে প্রয়োজন সদিচ্ছা এবং দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন।
বাংলাদেশ সংবিধানের তৃতীয় ভাগে ২৬ থেকে ৪৭ অনুচ্ছেদ পর্যন্ত নাগরিকদের মৌলিক অধিকরসমূহ সুবিন্যস্ত করা রয়েছে, কিন্তু বাস্তবে তার কতটুকু মানা হচ্ছে সে বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ। অনুচ্ছেদ ২৭ এ বলা হচ্ছে, আইনের দৃষ্টিতে সকলেই সমান এবং সকলেই আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী। অনুচ্ছেদ ৩৩ এ বলা হচ্ছে, গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিকে যথাসম্ভব শীঘ্র গ্রেপ্তারের কারণ না জানিয়ে প্রহরায় আটক রাখা যাবে না। অনুচ্ছেদ ৩৫(৫) এ বলা হচ্ছে, কোন ব্যক্তিকে যন্ত্রণা দেয়া যাবে না কিংবা নিষ্ঠুর, অমানুষিক বা লাঞ্ছণাকর কোন দন্ড দেয়া যাবে না বা এ ধরণের কোন আচরণ করা যাবে না। এছাড়াও অনুচ্ছেদ ৩৯(২) এ প্রত্যেক নাগরিক এবং সংবাদ মাধ্যমগুলোর বাক স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছে।সংবিধানের এ নীতিগুলোর বাস্তব প্রয়োগ এখন কতটুকু দেখা যাচ্ছে তা নিয়ে অনেকেই সন্দিহান। বিনা কারণে, বিনা ওয়ারেন্টে গ্রেফতার করা, সরকার বিরোধী কোন বক্তব্য বা লেখনী প্রকাশ হলে তার লেখক/ প্রকাশক সম্পাদক সকলকে হয়রানি, রিমান্ডের নামে অমানবিক নির্যাতন আর বিচার-বহির্ভূত হত্যাকান্ড এখন আমাদের দেশে নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। সব মিলে মানবাধিকার লংঘনের এক স্বর্গরাজ্যে পরিণত হতে চলেছে বাংলাদেশ। এতে দেখা যাচ্ছে যে, অপরাধী চক্র যেমন মানবাধিকার লংঘন করছে, তেমনি আইন শৃংখলা বাহিনীও কমে যাচ্ছে না। আবার, অপরাধীদের সংশোধনের জন্য যে কারা ব্যবস্থা, তাতেও হরহামেশা লংঘিত হচ্ছে মানবতা, গুরুতরভাবে। সম্প্রতি কারামুক্ত মাহমুদুর রহমান বা কারান্তরাল থেকে বেরিয়ে আসা বিরোধীদলীয় নেতাদের কিছু কিছু বক্তব্য/ ঘটনায় এর অনেক প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। সব মিলিয়ে,দেশের বর্তমান মানবাধিকার পরিস্থিতি চরম ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে, এ থেকে বের হয়ে আসার পথ খুঁজে বেড়াচ্ছে।
দেশের বিরাজমান মানবাধিকার পরিস্থিতিতে উদ্বিগ্ন বহির্বিশ্বের দেশগুলোও। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোও চোখ রাখছে বাংলাদেশের প্রতি। কানাডিয়ান পার্লামেন্টের বিরোধী দলীয় হুইপ জাস্টিন ট্রোডো বলেন, বাংলাদেশের মানবাধিকার লংঘন মেনে নেবে না কানাডা। এছাড়াও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও এশিয়ান হিউম্যান রাইটস কমিশনও বাংলাদেশের মানবাধিকার লংঘন ও বিচার-বহির্ভূত হত্যাকান্ড নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ প্রকাশ করেছে ৭৬ পৃষ্ঠার একটি রিপোর্ট যাতে দেখানো হয়েছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কর্তৃক মানবাধিকার লংঘন এবং বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ডের নানা দিক। এতে বলা হয়,আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার ঐ সকল সদস্যকে কোন শাস্তির মুখোমুখি না করা হলে এ ধরণের হত্যাকান্ড চলতেই থাকবে। অতি সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট থেকে প্রকাশিত একটি মূল্যায়নে বলা হয়, বাংলাদেশে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড, নির্যাতন, হয়রানিমূলক গ্রেফতার ঘটিয়েই চলেছে। সেখানে একটি বিশেষ বাহিনীর নাম উল্ল্যেখ করা হয়।এছাড়াও দেশের বিরাজমান সামগ্রিক মানবাধিকার পরিস্থিতিতে হতাশা ব্যক্ত করে যুক্তরাষ্ট্র সরকার। তবে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান বলেন, “যেনতেন ভাবে এ রিপোর্ট তৈরী করা হয়েছে, এতে অনেক পুরোনো তথ্য ব্যবহৃত হয়েছে।” তবে  বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও বুদ্ধিজীবি ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, “যাদের হাতে মৌলিক মানবাধিকার রার দায়িত্ব,তাদের হাতেই মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে।” তবে সার্বিকভাবে এ বিষয়টি সবার কাছেই পরিস্কার, দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি চরম হুমকির মুখে রয়েছে। আর এর দায়দায়িত্ব আইন প্রয়োগকারী সংস্থা তথা সরকারের ওপরই বর্তায়।
মূলত মানবাধিকার পরিস্থিতি হল একটি দেশের গণতান্ত্রিক সুস্বাস্থ্যের মাপকাঠি। মানবাধিকার লংঘনের ঘটনা যত বাড়বে, জাতি হিসেবে আমাদের অসুস্থতাও তত বাড়বে। এ থেকে বেরিয়ে আসার একমাত্র পথ সদিচ্ছা। সরকারের  পরমতসহিষ্ণুতা আর বিরোধী দলের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ পারে আমাদের বর্তমান পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাতে। এর পাশাপাশি উদার দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে সকল সমস্যার সমাধান করবার প্রচেষ্টা আমাদের দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতির পরিবর্তন আনতে সম। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে জবাবদিহিতা এবং দায়িত্বের নির্দিষ্ট সীমারেখার মধ্যে নিয়ে আসা হলে বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড চিরতরে হয়ে যাবে বলে আমাদের বিশ্বাস। এতে সমুন্নত হবে মানবাধিকার, গণতন্ত্র পাবে পূর্ণতা।
Advertisements