স্বাধীনতা সংগ্রামঃ দেশে দেশে, যুগে যুগে

war-of-1812
একটি দেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বের, মর্যাদার আর আবেগের বিষয়টি কি? একবাক্যে আমরা স্বীকার করে নেব, অবশ্যই স্বাধীনতা। আর তা যদি হয় রক্ত দিয়ে কেনা, তাহলে? সেই সংগ্রাম আর সংগ্রামী মানুষেরা চিরভাস্বর হয়ে বেঁচে থাকে সেই দেশের ইতিহাসে, মানুষের হৃদয়ের প্রতিটি স্পন্দনে।
আমাদের গৌরবময় স্বাধীনতার মাস – মার্চ। সাতচল্লিশে দেশ বিভাগের পর থেকে কেবল জুলুম আর পদে পদে নিপীড়ন, একাত্তরের মার্চের সেই অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি আর তারই মধ্যে স্বাধীন বাংলাদেশের ঘোষণা, এই বাংলার খেটে খাওয়া নির্যাতিত মানুষের জীবনে এনে দিয়েছিল এক মৃত্যুঞ্জয়ী স্বপ্ন; যে স্বপ্নের বাস্তব রূপ ন’মাস পরে প্রতিভাত হয় সূর্যের আলোর চেয়েও উজ্জ্বলভাবে, এই বিশ্বের বুকে বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্রটির জন্ম হবার মধ্য দিয়ে। এ সংগ্রাম বড়ই গৌরবের, আর তাই শিল্পে, সাহিত্যে, সমাজের নানা স্তরে এমনকি রাজনৈতিক কাদা ছোড়াছুড়ির মাঝেও এ মহান সংগ্রামের চেতনার প্রয়োগ, অতিপ্রয়োগ এবং অপপ্রয়োগ আমরা দেখে আসছি গত চল্লিশ বছর ধরে।
তবে এরকম গৌরবজ্জ্বল সংগ্রামের ইতিহাস বিশ্বের আরও অনেক দেশে রয়েছে, তবে সেগুলো সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান মোটামুটি সীমিতই বলা চলে। আজকে মহান স্বাধীনতার এ মাসে বিশ্বের আরও কিছু দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম আমরা এখানে তুলে ধরব, যাতে করে ভ্রাতৃপ্রতিম এবং প্রতিবেশী বা সহযোগী দেশগুলোর আত্মদানের ইতিহাস, সে দেশের মানুষের আবেগ-ভালবাসা ও মনমানসিকতার উপর আমরা একটি স্বচ্ছ ধারণা লাভ করতে পারি।
প্রাচীনতম স্বাধীনতা সংগ্রাম: স্কটল্যান্ড
স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতা সংগ্রামই সম্ভবত আমাদের জানা ইতিহাসের মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন। দু’টি পর্যায়ে এ সংগ্রামটি সম্পন্ন হয়, যার মধ্যে প্রথম পর্যায়ের স্থায়িত্ব হল ১২৯৬ থেকে ১৩২৮ খ্রিষ্টাব্দ আর দ্বিতীয়টি ১৩৩২ থেকে ১৩৫৭ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হয়। যে মহান সংগ্রামী যোদ্ধার অধ্যাবসায় আর কঠোর পরিশ্রমের কথা আমরা সবাই জানি, সেই রবার্ট ব্র“স এই স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রথম পর্যায়ে স্কটল্যান্ডকে মুক্তি দেন, আবার তাঁর পুত্র ও বংশধরেরাই স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতা সংগ্রামের সর্বশেষ পর্যন্ত এর নেতৃত্ব দেন।
১২৯৬ সালে স্কটিশ রাজা ৩য় আলেক্সান্ডার তার অল্পবয়স্কা নাতনী মার্গারেটকে উত্তরাধিকারী রেখে মারা যান। স্কট সাম্রাজ্যের প্রভাবশালীরা তখন মার্গারেটকে ইংল্যান্ডের রাজা ১ম এডওয়ার্ড এর ছেলের সাথে বিয়ে দেয়। ক’মাস পর কোন কারণে মার্গারেট মারা যান এবং সুচতুর এডওয়ার্ড স্কটল্যান্ডকেও ইংলিশ রাজত্বের একটি অংশে পরিণত করেন। এর পরিপ্রেেিত শুরু হয় স্বাধীনতা সংগ্রাম, ইংল্যান্ডের সাথে স্কটল্যান্ডের যুদ্ধ। বারংবার পরাজিত হয়েও রবার্ট ব্র“স কিভাবে তার রাজ্য পুনরুদ্ধার করেন, সে গল্প আমরা সবাই জানি। ১৩২৮ খ্রিষ্টাব্দে সম্পাদিত এডিনবার্গ-নর্দাম্পটন চুক্তির মাধ্যমে এর একটি আপাত সমাপ্তি দেখা যায়।
তবে রবার্ট ব্র“সের মৃত্যুর পর আবারও ব্রিটেন তার চুক্তি ভঙ্গ করে স্কটল্যান্ডে আগ্রাসন চালায়। এক দীর্ঘ সংগ্রামের পর ১৩৫৭ সালে বারউইক চুক্তির মাধ্যমে স্কটল্যান্ড সম্পূর্ণভাবে ব্রিটিশ আগ্রাসন মুক্ত হয়। এ সংগ্রাম মধ্যযুগের ইতিহাসে এক বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। অস্ত্র হিসেবে ‘লং বো’ – বড় আকারের ধনুকের ব্যবহারও ঐ সময় শুরু হয়। ২৯টি বড় যুদ্ধ এবং চারটি চুক্তির সমন্বয়ে গঠিত এ সংগ্রামের স্থায়িত্বকাল ছিল প্রায় ৫৭ বছর।
ডাচ বিদ্রোহ: স্বাধীনতাকামী নেদারল্যান্ডস
স্প্যানিশ উপনিবেশের বিরুদ্ধে নেদারল্যান্ডসের স্বাধীনতা সংগ্রাম ইউরোপের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ১৫৬৮ সালে শুরু হওয়া এ বিদ্রোহ শুরু হয়। মূলত ১৫৫৬ সালে ডাচ রাজা চার্লস মারা গেলে তার পুত্র ২য় ফিলিপ সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হিসেবে অধিষ্ঠিত হন, যার বাল্যকাল এবং শিাদীা সবই সম্পন্ন হয় স্পেনে। ফিলিপ সম্পূর্ণভাবে স্প্যানিশ ভাবধারায় আচ্ছন্ন ছিলেন এবং ডাচ ভাষায় কথা পর্যন্ত বলতে পারতেন না। এ বিদ্রোহ প্রাথমিকভাবে স্পেন চেপে রাখতে সম হয় ১৫৭২ সাল পর্যন্ত, কিন্তু এরপর তা নেদারল্যান্ডসের নানা স্থানে ছড়িয়ে পড়ে। ১৫৮৫ থেকে ১৬০৯ এ চব্বিশ বছরে খন্ড খন্ড ঘটনা ঘটে, যার মধ্যে উল্ল্যেখযোগ্য হল বিদ্রোহীদের দ্বারা ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডকে আমন্ত্রণ জানানো, ডাচ সাম্রাজ্য অধিকার করার জন্য! এছাড়াও সুবিখ্যাত স্প্যানিশ নৌবহর আর্মাডা কে প্রতিরোধের জন্য ডাচ বিদ্রোহীরা শক্তিশালী নৌবাহিনী গড়ে তোলে। একই সাথে ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি গঠিত হয়, দূর প্রাচ্যে ব্যবসা বাণিজ্য পরিচালনা করবার জন্য।
বিদ্রোহের মাত্রা যখন তুঙ্গে তখন স্প্যানিশ প বাধ্য হয় বিদ্রোহীদের সাথে একটি শান্তিচুক্তিতে আবদ্ধ হয়। যার মেয়াদ ছিল বারো বছর, ১৬০৯ থেকে ১৬২১ সাল পর্যন্ত। এরপরও বিপ্তি ঘটনাবলীর মাধ্যমে ডাচ উপনিবেশের বিভিন্ন এলাকা কার্যত স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিণত হয়। তবে স্পেন মরণ কামড় দিতে ভোলেনি। ১৬৩৯ সালে ২০,০০০ সৈন্যের সমন্বয়ে একটি বাহিনী পাঠায় স্পেন, নেদারল্যান্ডসে এসে যা বিদ্ধস্ত হয়ে যায়। এরপর ১৬৪৮ সালে মুনস্টার চুক্তির মাধ্যমে স্পেন একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, সমাপ্ত হয় আশি বছরব্যাপী দীর্ঘ স্বাধীনতা সংগ্রাম।
হৃত-রাজ্য পুনরুদ্ধার: পর্তুগালের স্বাধীনতা
পর্তুগালের সাম্রাজ্যে স্প্যানিশ আগ্রাসনের কারণে কিছুকালের জন্য স্বাধীন রাষ্ট্রের মর্যাদা হারায় দেশটি। ১৬৪০ সালে ব্রাগানসা রাজবংশের শাসনকালে এ স্প্যানিশ সম্রাট ফিলিপের আক্রমণ দেশের শাসকগোষ্ঠীকে পরিণত করে এক পুতুল সরকারে। স্পেনের এ ধরণের কার্যকলাপ ব্যতিব্যস্ত করে তোলে আশেপাশের রাজ্যগুলোকেও। তাই তৎকালীন ফরাসী সম্রাট ত্রয়োদশ লুইয়ের উপদেষ্টা কার্ডিনাল রিশালিও নিজেদের স্বার্র্র্থেই পর্তুগীজ শাসক চতুর্থ জোয়াও কে সাহায্য করবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। ১৬৫৪ সালে জোয়াও এর সাথে ইংরেজ রাজা ক্রমওয়েলের একটি পারস্পরিক সহযোগিতা চুক্তি সম্পন্ন হয়। পরের বছর জোয়াও মারা যান এবং তার ছেলে ষষ্ঠ আলফানসোর পে জোয়াওর স্ত্রী এবং আলফানসোর মা রাজ্যের শাসনভার গ্রহণ করেন।
তবে ১৬৫৯ সালে পিরেনিজ চুক্তির মাধ্যমে ফ্রান্স ও স্পেনের মধ্যে শান্তিচুক্তি হয়ে যাওয়ায় চাপে পড়ে পর্তুগাল। তবে ১৬৬৫ সালের মন্টি-কার্লোতে সংঘটিত যুদ্ধে পর্তুগালের কাছে পরাজিত হয় স্পেন। পরবর্তীতে ১৬৬৮ সালে লিসবন চুক্তির মাধ্যমে পূর্ণভাবে স্বাধীনতা পায় পর্তুগাল, স্প্যানিশ আগ্রাসন তার থাবা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়।
হাঙ্গেরী – সংগ্রামী স্বাধীনতা:
ষোড়শ শতাব্দীতে তুরস্কের উসমানিয়া খিলাফতের অধীনে আসে হাঙ্গেরী। সুলতান দ্বিতীয় মাহমুদের সাথে মৈত্রী চুক্তিতে আবদ্ধ হন বিদ্রোহী নেতা ইমরে থকোলী, যার হাত ধরে পোলিশ হ্যাবসবার্গ সাম্রাজ্যের হাত থেকে মুক্তি পায় হাঙ্গেরী। তবে সতেরো শতকের মাঝামাঝিতে পুনরায় হাঙ্গেরী দখল করে নেয় স্পেন, আর এই হাঙ্গেরীকে পুনরায় স্বাধীনতা দিতে এগিয়ে আসেন অভিজাত সমাজের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিত্ব ফ্রান্সিস রাকোজ্জি। তার নেতৃত্বে শাসকগোষ্ঠীর বিপে সশস্ত্র সংগ্রামে এগিয়ে আসে বিদ্রোহীরা। হাঙ্গেরীয়ান অভিজাত ও নেতৃস্থানীয় সমাজ রাকোজ্জিকে প্রিন্স উপাধিতে ভূষিত করে। তবে ইংল্যান্ড ও নেদারল্যান্ডসের মধ্যস্থতায় রাকোজ্জি এবং শাসকগোষ্ঠীর মধ্যে শান্তি আলোচনা শুরু হয় ১৭০৫ সালে।
তবে ১৭০৮ সালে ট্রান্সেইন যুদ্ধের এক পর্যায়ে ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়ে গিয়ে অচেতন হয়ে পড়েন রাকোজ্জি, আর তাকে মৃত ভেবে হীনবল হয়ে পালিয়ে যায় তার যোদ্ধারা। সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ১৭১১ সালে পূর্ণভাবে স্বাধীনতা পায় হাঙ্গেরী।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র: রক্তে কেনা স্বাধীনতা
বর্তমান পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে প্রভাবশালী দেশ আমেরিকাও স্বাধীনতা পেয়েছে এক রক্তয়ী স্বাধীনতা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। ব্রিটিশ কলোনীভুক্ত এ দেশটির এ সংগ্রাম শুরু হয় ১৭৭৫ সাল থেকে। এ সময় ব্রিটিশ অধিভুক্ত ১৩টি কলোনী (আজকের যুগের অঙ্গরাজ্য) বিদ্রোহ করে ইংল্যান্ডের বিপ।ে আমেরিকার সাদা মানুষেরাই ছিল এ বিদ্রোহের সংগঠক ও পরিচালক, যদিও তারা ছিল ব্রিটেন থেকে আগত। কালো দাস এবং রেড ইন্ডিয়ানরা ব্রিটেনকেই সমর্থন দেয়, এছাড়াও নাগরিকদের একটি বড় অংশই স্বাধীনতার যুদ্ধের বিরোধিতা করে। ঐতিহাসিকদের মতে একটি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, আমেরিকার স্বাধীনতা আন্দোলনে পূর্ণ সমর্থন দেয় ৪০-৪৫% মানুষ, বিরোধিতা করে ১৫-২০% এবং নিরপে থাকে ৩৫-৪৫% মানুষ। জর্জ ওয়াশিংটনের নেতৃত্বে এ সংগ্রামের বিভিন্ন পর্যায়ে একে একে রক্তয়ী সংগ্রামে জড়িয়ে পড়ে ম্যাসাচুসেটস, নিউইয়র্ক, নিউ জার্সি, ফিলাডেলফিয়াসহ আরও অন্যান্য রাজ্য। শক্তিশালী নৌবাহিনী থাকার কারণে উপকূলীয় এলাকাগুলোতে ব্রিটেন তার অধিকার বজায় রাখতে পারলেও দেশের অভ্যন্তরভাগ, যেখানে ৯০% মানুষের বসবাস, সেখানে স্বাধীনতাকামীদের আধিপত্য ক্রমশ বাড়তে থাকে।
আমেরিকার এ স্বাধীনতা সংগ্রামের সাথে আমাদের এ উপমহাদেশের পরো কিছু সম্পর্ক রয়েছে। প্রথমত, আমেরিকায় সেনাসমাবেশ করতে গিয়ে অধিক সংখ্যক ব্রিটিশ সৈন্য প্রয়োজন হয়, সেই সৈন্য ভারতবর্ষ থেকে নিয়ে গিয়ে মোতায়েন করা হয়। ঐতিহাসিকদের মতে, এ কারণে মহীশূরে টিপু সুলতান এবং ফরাসীদের মিলিত আক্রমণ প্রতিহত করতে বেগ পেতে হয় ব্রিটিশদের। এছাড়াও, আমেরিকায় স্বাধীনতাকামীদের বিপে ব্রিটিশ বাহিনীর অধিনায়ক ছিলেন লর্ড কর্ণওয়ালিস, যাকে পরবর্তীতে ভাইসরয় করে ভারতবর্ষে পাঠানো হয়।
স্বাধীনতাকামীদের অব্যাহত আক্রমণ এবং পরাজয়ের ফলে ১৭৮৩ সালে লর্ড কর্ণওয়ালিস আত্মসমর্পণ করেন জর্জ ওয়াশিংটনের কাছে। এভাবেই জন্মলাভ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
অগ্নিগর্ভ দক্ষিণ আমেরিকা ও সাইমন বলিভার: সংগ্রাম-বিপ্লবের লীলাভূমি
উনবিংশ শতাব্দীর প্রথম তিরিশ বছরে একের পর এক স্বাধীন হতে থাকে ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলো। মূলত এ দেশগুলোর বেশিরভাগই ছিল স্পেনের কলোনী। এ দেশটিতে নেপোলিয়ন বোনাপার্ট আক্রমণ করে সম্রাট ৭ম ফার্ডিন্যান্ডকে উৎখাত করেন, যার ফলে হাজার হাজার মাইল দূরের উপনিবেশগুলোর দিকে মনোযোগ দেবার মত সুযোগ তাদের ছিল না, এর পূর্ণ সদ্ব্যবহার করে একে একে স্বাধীনতা অর্জন করে চিলি, মেক্সিকো, ভেনিজুয়েলা, কলাম্বিয়া, বলিভিয়া, ইকুয়েডর এবং উরুগুয়ে।
চিলি:
১৮০৮ সালে ফ্রান্সিসকো গার্সিয়া কারাসকো নামক এক অত্যাচারী ব্যক্তি চিলিয়ান উপনিবেশের গভর্ণর জেনারেল নিযুক্ত হন। তিনি দমন-নিপীড়ন ও নির্যাতনের এক স্টিম রোলার চালানো শুরু করেন। মূলত তার বিরুদ্ধেই আন্দোলন শুরু হয়, যা মোড় নেয় স্বাধীনতা আন্দোলনের দিকে। মাতিও ডি তোরো ই জাম্বেরানো নামক ৮৩ বছর বয়স্ক এক প্রভাবশালী সৈনিকের নেতৃত্বে সর্বপ্রথম এ বিদ্রোহ শুরু হয় ১৮১০ সালে। পরবর্তীতে জোসে মিগুয়েল ক্যারেরা নামক এক সুচতুর উচ্চাভিলাসী যুবক নানা ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে মতার মঞ্চে আরোহণ করেন। চিলি সম্পূর্ণরূপে স্বাধীনতা অর্জন করে ১৮১৮ সালে।
মেক্সিকো:
স্প্যানিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম বিদ্রোহের আগুন জ্বলে উঠে ১৮১০ সালে, মিগুয়েল হিদালগো ই কসটিলার হাতে। তাকে ১৮১১ সালে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়। তার পর বিদ্রোহীদের নেতা হন জো মারিয়া মোরালেস, তার নেতৃত্বে ১৮১৩ সালে মেক্সিকোর স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়া হয়। বিভিন্ন ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে অবশেষে ১৮২১ সালে কর্ডোভা চুক্তির মাধ্যমে স্বাধীনতা লাভ করে মেক্সিকো।
ভেনিজুয়েলা:
স্পেনের অন্তর্গত কলোনী ভেনিজুয়েলা ১৮১১ সালে সর্বপ্রথম স্বাধীনতা ঘোষণা করে। মহান বিপ্লবী সাইমন বলিভারের প্রত্য তত্বাবধানে থেকে রক্তয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে ১৮২১ সালে স্বাধীন হয় দেশটি।
কলাম্বিয়া:
কলাম্বিয়ার স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হয় ১৮১৫ সাল থেকে। নানা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার পথে এগিয়ে যেতে থাকে দেশটি, যার মধ্যে বুয়্যাকা যুদ্ধটি প্রণিধানযোগ্য। এ যুদ্ধে সাইমন বলিভার ৩০০০ সৈন্য নিয়ে আন্দিজ পেরিয়ে আক্রমণ করেন এবং জয়ী হন। ১৮২০ সালে সশস্ত্র আক্রমণের মাধ্যমে রাজধানী বোগোটা মুক্ত হয়। স্বাধীন কলাম্বিয়ার প্রথম প্রেসিডেন্ট হন সাইমন বলিভার।
ইকুয়েডর:
আশেপাশের সকল দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের উত্তাপ ইকুয়েডরেও এসে লাগে। ১৮২২ সালের ২৪ মে জেনারেল অ্যান্টোনিও জোসে ডি সুক্রে আক্রমণ চালিয়ে দখল করে নেন রাজধানী কুইটো।
বলিভিয়া:
ঔপনিবেশিক শক্তির বিরেুদ্ধে দেশটি স্বাধীনতা ঘোষণা করে ১৮০৯ সালে। রক্তাক্ত সংগ্রামের মধ্য দিয়ে পচিঁশ বছর পর ১৮২৪ সালের ৯ই ডিসেম্বর আয়াচুপে যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন হয় বলিভিয়া। তাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের অগ্রনায়ক এবং মহান বিপ্লবী সাইমন বলিভার এর নামে দেশটির নামকরণ হয় বলিভিয়া।
উরুগুয়ে:
১৮১১ সালে স্পেনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম শুরু হয় স্বাধীনতা ঘোষণার মধ্য দিয়ে। জোস গার্বাসিও আর্টিগাস এ আন্দোলনের অগ্রদূত। তবে স্প্যানিশ উপনিবেশের কাছ থেকে মুক্তি পেয়ে ১৮২১ সালে ব্রাজিলের অংশ হিসেবে যুক্ত হয় উরুগুয়ে, যেখান থেকে আবার স্বাধীনতা ঘোষণা করে দেশটি। অবশেষে ১৮২৮ সালে মন্টিভিডিও তে সম্পাদিত চুক্তির মাধ্যমে উরুগুয়ে স্বাধীনতা লাভ করে।
গ্রীসের স্বাধীনতা: উসমানিয়া খিলাফতের ভাঙ্গন
১৮২১ সালে গ্রীস প্রথম এলাকা হিসেবে তুর্কী খিলাফতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। আলেক্সান্ডার ইপসিলান্টিস এর নেতৃত্বে স্বাধীনতা ঘোষণার মাধ্যমে এ সংগ্রাম শুরু হয়। একে একে ক্রীট দ্বীপ, মেসিডোনিয়া সহ গ্রীসের বিভিন্ন এলাকায় স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হয়। পরবর্তীতে ১৮৩২ সালে কন্সট্যান্টিনোপল চুক্তির মাধ্যমে স্বাধীনতা লাভ করে গ্রীস। এ দেশটির স্বাধীনতা ইতিহাসের পাতায় একটি তাৎপর্য্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কেননা এর মাধ্যমেই উসমানিয়া খিলাফতের ভাঙ্গনের সুর স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
সিপাহী বিদ্রোহ: উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সূতিকাগার
আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থান দখল করে আছে ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ। ভারতের উত্তরাংশের বিভিন্ন প্রদেশে চলা এ বিপ্লব কাঁপিয়ে দিয়েছিল ব্রিটিশ রাজের সাম্রাজ্যের ভিতকে। ১০ই মে বাংলার ব্যারাকপুরে শুরু হওয়া এ বিদ্রোহের আগুন ছড়িয়ে পড়ে ভারতবর্ষজুড়ে। মুঘল সম্রাট ২য় বাহাদুর শাহ জাফরকে কেন্দ্র করে কানপুরের নানা সাহেব, ঝাঁসির রাণী লীবাঈ ও আরও অনেক শাসক ঐক্যবদ্ধ হয়ে যোগ দিয়েছিলেন এ সংগ্রামে।
মূলত ব্রিটিশদের অব্যাহত শোষণ-নিপীড়নের বিরুদ্ধে পুঞ্জিভূত ােভ, নানান ধর্মীয়-সামাজিক কারণ এবং সর্বশেষে ‘এনফিল্ড প্যাটার্ণ ১৮৫৩’ রাইফেলের প্রচলন এ আগুনকে উস্কে দেয়। দাঁতে কেটে টোটা ব্যবহারের প্রযুক্তি ব্যবহৃত হওয়ায় গুজব রটে যে, এতে গরু এবং শুকরের চর্বি ব্যবহৃত হয়েছে। যার ফলে হিন্দু ও মুসলমান উভয় ধর্মের সৈন্যদের মনেই তীব্র অসন্তোষ জেগে ওঠে। ১৮৫৭ সালের ২৯ মার্চে ৩৬ বিএনআই কোম্পানির মঙ্গল পান্ডে নামক এক সিপাহী ঐ কোম্পানীর জমাদার ঈশ্বরীপ্রসাদের সঙ্গে পরামর্শ করে বিদ্রোহের সূচনা করে। শেখ পল্টু নামক একজন সিপাহী ছাড়া সকলেই তাদের সমর্থন করে। তবে ব্রিটিশ সেনারা সহজেই এ বিদ্রোহ নিয়ন্ত্রণ করে, মঙ্গল পান্ডে ও ঈশ্বরীপ্রসাদের কোর্ট মার্শাল করে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয় এবং শেখ পল্টু জমাদারের পদে উন্নীত হয়।
তবে পরবর্তী পর্যায়ে বিদ্রোহ চূড়ান্তভাবে ছড়িয়ে পড়ে। তবে কর্ণেল মুনরো ও অন্যান্য ব্রিটিশ অফিসারের চেষ্টায় এবং কিছু বাস্তব সমস্যার কারণে, মূলত যোগ্য নেতৃত্বের অভাবে এ বিদ্রোহ ব্যর্থতা পর্যবসিত হয়। তবে এটুকু লাভ হয় যে, ভারতবর্ষের শাসনভার ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাত থেকে সরাসরি ব্রিটেনের রাণীর হাতে ন্যস্ত হয়।
এছাড়াও এ বিদ্রোহ পরবর্তীকালের সকল স্বাধীনতা সংগ্রামে অনুপ্রেরণাদায়ক ভূমিকা পালন করে। ২০০৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহের দেড়শত বর্ষপূর্তি উদযাপন করা হয়।
রুমানিয়া: খিলাফতের ভাঙ্গন স্পষ্টতর
১৮৭৭ সালের এপ্রিলে রাশিয়ার প্রত্য মদদে উসমানিয়া খিলাফতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে রুমানিয়া, রাশিয়ার ১,২০,০০০ সৈন্যকে নিজ দেশে প্রবেশাধিকার দিয়ে। তুর্কী আক্রমণের বিরুদ্ধে এ বিপুল রুশ সৈন্যকে ঢাল হিসেবে রেখে ২১শে মে মিহেলি কোগালনিচেনিউ স্বাধীনতা ঘোষণা করেন, যাতে রুমানিয়ান রাজপুত্র প্রিন্স ১ম ক্যারল অনুমোদন করেন। রুমানিয়া তখন থেকে তুর্কীদের কর দেয়া বন্ধ করে দেয় এবং সেই অর্থ যুদ্ধ মন্ত্রণালয়ে প্রদান করে। অব্যাহত চাপ ও সামরিক তৎপরতা চালানোর ফলে ১৮৭৮ সালে সান স্টেফানোতে শান্তিচুক্তি হয়, এর মাধ্যমে রুমানিয়া স্বাধীনতা পায়।
আয়ারল্যান্ড: রক্তাক্ত অভ্যুদয়
ব্রিটিশ রাজত্বের হাত থেকে মুক্তি পেতে আয়ারল্যান্ডে তৎপরতা শুরু হয় ১৯১৯ সালে। এ সময় আইরিশ পার্লামেন্ট একটি স্বাধীন সত্তা হিসেবে কাজ শুরু করে, যার নাম দেয়া হয় ড্যালিল ইরিয়ান। এই ড্যালিল এর প্রত্য তত্ত্বাবধানে গঠিত হয় আইরিশ রিপাবলিকান আর্মি (IRA), যা সামরিক তৎপরতা শুরু করে। মাইকেল কলিন্স ছিলেন এর উদ্যোক্তা। এ সংগঠন তাদের গুপ্ত হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে জওঅ কে, যারা ছিল রয়াল আইরিশ কনস্ট্যাবুলারি অর্থাৎ ব্রিটিশ অনুগত পুলিশ বাহিনী। অসংখ্য হত্যাকান্ডের পর ওজঋ গঠন করে ওচঋ – আইরিশ পুলিশ ফোর্স এবং স্থবির হয়ে পড়া ব্রিটিশ আদালতকে প্রতিস্থাপিত করে ড্যালিল কোর্ট দ্বারা। আর্থার গ্রিফিথকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ঘোষণা দেয় IRA. অব্যাহত গুপ্তহত্যা ও রক্তাক্ত সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ১৯২১ সালে অ্যাংলো-আইরিশ চুক্তির মাধ্যমে ইংল্যান্ডের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে আয়ারল্যান্ড। অবশ্য এর পরপরই এক রক্তয়ী গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে দেশটির উত্তর ও দক্ষিণ অংশ, আর এর বলি হন মাইকেল কলিন্স, আর্থার গ্রিফিথ।
বিংশ শতাব্দীর আরও কিছু স্বাধীনতা সংগ্রাম:
১৯৫৪ সালে স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হয় আলজেরিয়ায়, আধিপত্যবাদী ফ্রান্সের কবল থেকে থেকে বেরিয়ে আসবার জন্য। অত্যন্ত নৃশংস ভূমিকা এখানে গ্রহণ করে দু’টি পই। তবে সব বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে ১৯৬০ সালে স্বাধীন হয় আলজেরিয়া। এছাড়াও ১৯৬১ সালে পর্তুগালের কাছ থেকে স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম শুরু করে অ্যাঙ্গোলা, স্বাধীনতা লাভ করে ১৯৭৪ সালে এলভোর চুক্তির মাধ্যমে।
এভাবেই যুগে যুগে স্বাধীনতা আন্দোলনে রক্ত ঝরিয়েছে পৃথিবীর বহু দেশের মানুষ। আর এখনও ফিলিস্তিন, কাশ্মীরসহ আরও অনেক দেশে চলছে রক্তাক্ত সংগ্রাম। যেহেতু একটি গৌরবময় স্বাধীনতা সংগ্রামের উত্তরাধিকারী আমরা, সে কারণে চলমান সকল স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতিও আমাদের সকলের শ্রদ্ধা থাকা উচিত। অত্যাচারী ও ঔপনিবেশিক শক্তির কাছ থেকে মুক্তি পেয়ে একবিংশ শতাব্দির সকল সংগ্রামী মানুষেরা পাবে মুক্ত জীবনের স্বাদ, একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের স্বপ্ন – এ প্রত্যাশা আমাদের সকলের।
Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

w

Connecting to %s