বিভক্ত ঢাকা, বিভক্ত মতামত – আইনী দৃষ্টিকোণ

চারশ বছরের পুরোনো শহর ঢাকা মাত্র চার মিনিটে দু’ভাগ করা হল – এ ধরণের একটি বুলিতে সরব হয়ে উঠেছে গোটা দেশ। সরকারী এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বিরোধী রাজনৈতিক দলসহ সুশীল সমাজ ও সাধারণ মানুষের কন্ঠস্বর শোনা যাচ্ছে জোরালো ভাবেই। তবে সরকার বলছেন প্রশাসন বিকেন্দ্রীকরণ এবং নাগরিক সুবিধা প্রদানে কর্পোরেশনের দক্ষতা বাড়ানোর কথা। আজকের আলোচনায় তুলে আনা হবে বিষয়টির আইনী  দিকসমূহ।
Dhaka_City_Corporation
ঢাকা – বাংলাদেশের রাজধানী। সুদীর্ঘ এক ইতিহাস পেছনে রেখে কালের সাক্ষী হয়ে শহরটি দিনে দিনে পরিণত হয়েছে প্রায় দু’কোটি মানুষের এক মেগাসিটিতে। তবে গত ২৯শে নভেম্বর জাতীয় সংসদে পাস করা একটি আইনের বলে ঢাকা সিটি কর্পোরেশন এখন বিভক্ত – ঢাকা উত্তর এবং ঢাকা দক্ষিণ এ দু’ভাগে। এ আইন অনুসারে ঢাকার দু’টি সিটি কর্পোরেশনে দু’জন নির্বাচিত মেয়র থাকবেন, আর নব্বই দিনের মধ্যে নির্বাচন করবার বাধ্যবাধকতা থাকায় সরকার এখন চাপ প্রয়োগ করছে নির্বাচন কমিশনের ওপর। যদিও বিরোধী দল এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা শুরু থেকেই এ সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করে আসছিলেন, তবুও সে মত উপেক্ষা করে সরকার দুই ঢাকার জন্য অতিরিক্ত সচিব পর্যায়ের দু’জন অন্তর্বতী প্রশাসক নিয়োগ করেছেন। বিরোধী দল যথারীতি রাজপথে, ডাকা হয়েছে হরতাল। সব মিলিয়ে অনেকটা আকস্মিক ভাবে কোন বাহ্যত প্রয়োজন ছাড়াই ঢাসিক ভেঙে ঢাকা উত্তর এবং ঢাকা দক্ষিণ করবার এ সিদ্ধান্ত নেয়ায় সাধারণ মানুষ এক বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতিতে পড়ে গিয়েছে।
মুঘল সুবাদার ইসলাম খানের হাতে গড়া এ শহরটিতে প্রথম ঢাকা পৌরসভা প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৬৪ সালে। বঙ্ঘভঙ্গকালীন সাত বছর প্রাদেশিক রাজধানী থাকবার পর ১৯৪৭ পেরিয়ে ১৯৭১ এ এসে স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি পায় ঢাকা। ১৯৭৮ সালে ঢাকা পৌরসভা রূপ নেয় পৌর কর্পোরেশনে। ১৯৮৩ সালে জেনারেল এরশাদ জারী করেন ঢাকা সিটি কর্পোরেশন অধ্যাদেশ। ঐ পর্যন্ত পৌরসভা চেয়ারম্যান এবং কর্পোরেশনের মেয়র, সকলেই ছিলেন সরকার কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত। ১৯৯৩ সালে বিএনপি সরকার ঢাকা সিটি কর্পোরেশন (সংশোধনী) আইন পাস করে যার ফলে সর্বপ্রথম মেয়র নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের প্রথম নির্বাচিত মেয়র হিসেবে পাঁচ বছরের জন্য শপথ নেন মোহাম্মদ হানিফ। তার পর মেয়র নির্বাচিত হন সাদেক হোসেন খোকা। তবে ২০০৮ সালে রাষ্ট্রপতি জারি করেন স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) অধ্যাদেশ, যার মাধ্যমে পূর্বেকার সকল সিটি কর্পোরেশন আইন বাতিল তরা হয়। আওয়ামী লীগ সরকার ২০০৯ সালে অধ্যাদেশটিকে আইনে পরিণত করেন। সর্বশেষ, ২০০৯ সালের এ আইনটিতে কিছু  মৌলিক পরিবর্তন এনে গত ২৯শে নভেম্বর সংসদে পাস করা হয় স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) সংশোধনী আইন, ২০১১।
এ সংশোধনীর মাধ্যমে মূল আইনের ৩ক ধারার পর নতুন চারটি উপধারা যোগ করা হয়েছে, যেখানে বলা হচ্ছে ঢাকা সিটি কর্পোরেশন এ আইনের ফলে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন এ দু’অংশে বিভক্ত হবে। একই সাথে ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের সকল কর্মকর্তা-কর্মচারী, সম্পদ, তহবিল, দায়, ঋণ, মামলা-মোকাদ্দমা, প্রদানকৃত লাইসেন্স, ইজারা সহ সকল বিষয়াদি সরকারি আদেশ মোতাবেক উভয় কর্পোরেশনে ক্ষেত্রমত হস্তান্তর, ন্যস্ত, স্থানান্তর কিংবা বদলীর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এছাড়াও মূল আইনের ২৫ এর (১) উপধারার পরিবর্তে নতুন উপধারা সংযোজন করা হচ্ছে। সেখানে কোন সিটি কর্পোরেশন প্রতিষ্ঠা বা বিভক্ত করা হলে একজন সরকার নিযুক্ত প্রশাসকের নিয়োগের বিধান রাখা হয়েছে, তবে কর্পোরেশন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে উক্ত প্রশাসকের মেয়াদ হবে ১৮০ দিন, আর বিভক্ত কর্পোরেশনের ক্ষেত্রে মেয়াদ ৯০ দিন, অর্থাৎ এ সময়ের মধ্যেই মেয়র নির্বাচন আয়োজন করতে হবে। তবে মূল আইনের ২(১) ধারায় একটি লক্ষণীয় পরিবর্তন আনা হয়েছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সংজ্ঞায় যেখানে আগে পুলিশ, র‌্যাব ও আনসারের পাশাপাশি বাংলাদেশ রাইফেলস, কোস্ট গার্ড বাহিনী এবং প্রতিরক্ষা কর্মবিভাগ বলা হয়েছিল, সংশোধনীর ফলে ঐ সংজ্ঞা থেকে বাদ পড়েছে প্রতিরক্ষা কর্মবিভাগ। অর্থাৎ, সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন বা অন্য কোন কাজে সেনাবাহিনী ব্যবহার করবার কোন বিধান আর থাকছে না। এছাড়াও মূল আইনের প্রথম তফসিলে পরিবর্তন এনে দুই কর্পোরেশনের মধ্যে ওয়ার্ড সমূহ ভাগ করে দেয়া হয়েছে। ৯২টি ওয়ার্ডের মধ্যে ঢাকা উত্তরকে দেয়া হয়েছে ৩৬টি যার মধ্যে রয়েছে উত্তরা, গুলশান, বাড্ডা, মহাখালী, পূর্ব রামপুরা, তেজগাঁও, কাফরুল, পল্লবী, মিরপুর এবং মোহাম্মদপুর। ঢাকা দক্ষিণকে দেয়া হয়েছে ৫৬টি যার মধ্যে রয়েছে ধানমন্ডি, রমনা, মতিঝিল, ডেমরা, সবুজবাগ, সূত্রাপুর, কোতয়ালী এবং লালবাগ।

সরকারী মুখপাত্ররা বলছেন প্রশাসনিক সুবিধা এবং নগরবাসীর সেবার মান আরও বৃদ্ধি করবার প্রচেষ্টা হিসেবেই এ বিভক্তি। এ ক্ষেত্রে লন্ডন, ম্যানিলা এবং আরও কিছু বড় শহরের দৃষ্টান্তও টেনেছেন তারা। তবে বাস্তবতা হল এই যে, একই শহরে দু’জন সমপর্যায়ের মেয়র এ ধরণের শাসনব্যবস্থা বর্তমানে পৃথিবীর কোথাও নেই। লন্ডন শহরকে প্রশাসনিক সুবিধার্থে ৩২ টি ‘বরো’ তে ভাগ করা হয়েছে, তার দায়িত্বে রয়েছেন একজন মেয়র। অবশ্য লর্ড মেয়র নামে আরেকটি অরাজনৈতিক এবং প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী পদ রয়েছে, যাকে কোন ভাবেই সিটি মেয়র হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। সুতরাং, লন্ডন শহরে মেয়র একজনই। ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলা সিটি হচ্ছে ‘ম্যানিলা মেট্রো’র অন্তর্ভুক্ত একটি শহর, যেখানে  এ রকম আরও পনেরোটি শহর রয়েছে। প্রত্যেক শহরের জন্য আলাদা মেয়র রয়েছেন, কিন্তু যেহেতু ঢাকার প্রশাসনিক কাঠামোর সাথে এর কোন মিলই নেই, সুতরাং ঢাকাকে ম্যানিলার সাথে তুলনা করা যাবে না। এছাড়াও সিডনী, মেলবোর্ণ, নিউইয়র্ক, তেহরান বা কলকাতাসহ পৃথিবীর প্রতিটি বড় শহরেই মেয়র রয়েছেন একজন।
পাশাপাশি, সরকার যেভাবে বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে জনগণের সেবার মান বাড়াবার চিন্তা করছে, তাতে সফলতা কি পরিমাণ আসতে পারে এ বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। কেননা, ঢাকা শহর একক কাঠামোতেই দশটি জোনে বিভক্ত ছিল, যার প্রতিটি জোনের জন্য আলাদা এক্সিকিউটিভ অফিসার ছিলেন। এছাড়াও নব্বইটি ওয়ার্ডের প্রতিটিতেই নির্বাচিত ওয়ার্ড কমিশনার রয়েছেন। সিটি কর্পোরেশন না বিভক্ত করে জোন সংখ্যা বাড়িয়েও বিকেন্দ্রীকরণ করা যায়। সবচেয়ে বড় কথা হল নতুন আইনটিতে কিংবা আগের কোন আইনেই মেয়রের একচ্ছত্র ক্ষমতার কিছু অংশ তার ওয়ার্ড কাউন্সেলরদের মধ্যে ভাগ করে দেবার বিধান রাখা হয়নি। এমন কি নাগরিক সেবা প্রদানকারী কোন প্রতিষ্ঠানের উপরই (ওয়াসা, ডেসা কিংবা পুলিশ) সিটি কর্পোরেশনের কোন ধরণের কর্তৃত্ব বর্তমান আইনে রাখা হয়নি, এমন কি কখনও তা ছিলও না। এ অবস্থায় শুধুমাত্র সিটি কর্পোরেশন বিভক্তি নাগরিক সেবার কতটুকু উন্নত করবে তা প্রশ্নসাপেক্ষ।

dhaka_city_map
এদিকে ঢাকা বিভক্তিকে চ্যালেঞ্জ করে বর্তমান মেয়র সাদেক হোসেন খোকা হাইকোর্ট বিভাগে একটি রিট দায়ের করেছেন, যার প্রেক্ষিতে সরকারী ঐ সিদ্ধান্তকে কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না তার জবাব চেয়ে রুল জারি করেছেন আদালত। চার সপ্তাহের মধ্যে জবাব চেয়ে এ আদেশ জারি করেন বিচারপতি ফরিদ আহমদ এবং বিচারপতি শেখ হাসান আরিফের একটি ডিভিশন বেঞ্চ। একই সাথে নতুন প্রশাসক নিয়োগের উপর দুই মাসের স্থগিতাদেশ জারি করেন বিচারপতি ফরিদ আহমদ, কিন্তু তার সাথে দ্বিমত পোষণ করে বেঞ্চের জুনিয়র বিচারক বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ বিষয়টি তৃতীয় বেঞ্চে নিস্পত্তির জন্য প্রধাণ বিচারপতির কাছে পাঠিয়ে দেন। যদিও মেয়র খোকার আইনজীবি ব্যারিস্টার আখতার ইমাম বলেন, বিষয়টি পূর্ণ নিস্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান মেয়র তার দায়িত্ব পালন করতে থাকবেন, কিন্তু সরকার ইতোমধ্যে অতিরিক্ত সচিব পর্যায়ের দু’জন কর্মকর্তাকে দুই ঢাকার প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দিয়ে দিয়েছে। রিটকারীর পক্ষে শুনানীতে ড. কামাল হোসেন বলেন, বাংলাদেশ সংবিধানের ৫ম অনুচ্ছেদে বাংলাদেশের রাজধানী বলা হয়েছে ঢাকা। কিস্তু এই বিভক্তির ফলে সংবিধান লংঘিত হচ্ছে।

dhaka-bangladesh
সব মিলিয়ে হঠাৎ করেই ঢাকার এ বিভক্তি সরকারের কোন রাজনৈতিক অভিসন্ধির বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করছেন অনেকেই। উইকিপিডিয়া অনুসারে, জনসংখ্যা ভিত্তিক র‌্যাংকিং অনুযায়ী ঢাকা পৃথিবীর ২৪ তম বৃহত্তম শহর। ঢাকার আগের ২৩টি বৃহত্তম শহরের কোনটাতেই প্রশাসনিক সুবিধার জন্য দু’টি কর্পোরেশন করা হয়নি। সামাজিক-রাজনৈতিক বিতর্ক এড়াতে এবং একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌছাতে আইনী প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই হয়তো নির্ধারিত হবে ঢাকা মহানগরীর ভাগ্য, জনগণের তাই এখন অপেক্ষা করা ছাড়া গতি নেই।

Advertisements

One comment

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

w

Connecting to %s