১১ই মে, ২০১১

সকাল বেলা ক্লাসে আসবার সময় বাইরে ঝাঝা রোদই ছিল। গুমোট গরমের মধ্যে ভূমি আইনের মারপ্যাচ বুঝার জন্য মানসিক প্রস্তুতি নিতে নিতে ঢুকলাম ডিপার্টমেন্টে। হঠাৎই, মনে হয় পনেরো কি বিশ মিনিট হবে, আকাশ কালো করে এলো। বহুদিন এমন অন্ধকার দেখিনি। ধুম ধাম শব্দে জানালাগুলো বাড়ি খাচ্ছে। কিসের আর লেখাপড়া ?

এক এক করে জানালা বন্ধ করা হচ্ছে আর ব্যাকবেঞ্চ থেকে আমরা গাইছি, ‘সারা বেলা বন্ধ জানালা…..’ ! বেচারা আরিফ জামিল স্যার তাও ক্লাস নিচ্ছেন, গেল কারেন্ট চলে। আহা রে, ক্লাসের মধ্যে যে রাতের অন্ধকার। বাধ্য হয়ে স্যার একটা বিরতিতে গেলেন আর সাথে সাথে, দে দৌড় বাঙ্গালী………. !

বাইরে ঝুম বৃষ্টি, একটু দ্বিধা করে নেমে গেলাম মাঠে; যা আছে কপালে। আমাদের দেখাদেখি সাহস করল আরো দু’চারজন, এরপর আরো কেউ কেউ। যারা নামতে চাচ্ছিল না, টেনে হিচড়ে নামিয়ে এনে প্রথমেই মাঠে জমে যাওয়া পানিতে এক আছাড়……পালাবে কোথায় বাছাধন !!!

আর তারপর ?

Rain 01

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এনেক্স ভবনে আমার গত দেড় বছরের পদচারণায় বৃষ্টিভেজা তারুণ্যের এমন উচ্ছাস আমি আর দেখিনি। সিনিয়র ভাইয়েরাও কেউ কেউ যোগ দিলেন। এ ওকে ভিজিয়ে দাওয়া, ল্যাং মেরে ফেলে দেয়া, পানি ছিটানো আর মাঠে গড়াগড়ি, কি নেই ? অবোধ শিশুদের এ খুনসুটিতে আরো উতসাহ দিতেই যেন প্রকৃতিও নিজেকে খুলে দিল অবারিত ভাবে, মুষলধারে বৃষ্টি আর সেই সাথে ঠান্ডা বাতাস ! দৌড় লাফ পিছলে যাওয়া আর কুস্তি, এত শক্তি কোথায় ছিল আমাদের মধ্যে জানি না। একটু পর খেয়াল হল, না জমছে না। শুরু হল চিরুণী অভিযান। কর্দমাক্ত দেহ আর টপটপ করে পড়া পানিতে পুরো ক্লাস ভিজিয়ে খুজে বের করা হল সেই সব লুক্কায়িত নরাধমদের, যারা এই উৎসবে এখনো যোগ দেয়নি। যথারীতি টেনে হিচড়ে পানিতে গোসল, সাথে সাথে সেও যে আমাদের অংশ! তবে হ্যা, একটা ফুটবলের প্রয়োজনীয়তা খুব বেশি অনুভূত হচ্ছিল। এমন বৃষ্টির দিনে যদি……..

Rain 02
আসিফ স্যার ইন অ্যাকশন

আসিফ স্যার ইন অ্যাকশন

মেঘ না চাইতে জল পাওয়া – একটা প্রবাদ শুনেছি। কিন্তু হঠাতই মেঘ না চাইতেই একটা বল এসে গেল ! কিভাবে? আমাদের উচ্ছাস দেখে আসিফ নজরুল স্যার বেরিয়ে এসেছেন তার রুম থেকে, লোক পাঠিয়ে একটা ফুটবলও আনিয়ে নিয়েছেন। স্যারের তত্ত্বাবধানে দু’টো টীম হল….আমাদের ব্যাচ – ২য় বর্ষ বনাম সিনিয়রস, কর্দমাক্ত আকাশের নিচে মেঘ’যুক্ত’ মাঠে আসিফ স্যারও আমাদের সাথে নেমে গেলেন মাঠে, ব্যাকে খেললেন। দুর্দান্ত ডিফেন্ডিং আর পিছলা খাবার প্রতিযোগিতায় গোলশূন্য ড্র হলো খেলা। এবার মেয়েরা…… স্যার আমরাও খেলব। যথারীতে স্যার টিম করলেন, ১ম বর্ষ বনাম ২য় বর্ষ। এবারে স্যার গোলকিপার, গোলশূণ্য খেলা গড়ালো টাইব্রেকারে।

আসিফ স্যার চলমান রাজনৈতিক ও আইনী বিতর্কের ক্ষুরধার বিশ্লেষণ করতে পারেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে সোচ্চার কন্ঠে কথা বলতে পারেন, আজ কিন্তু গোলবারের সামনে দাড়িয়ে পারলেন না, জয় হলো আমাদেরই। উল্লাসে ফেটে পড়ল সবাই, বৃষ্টিস্নাত এক নির্মল এবং পবিত্র আনন্দে। ডিপার্টমেন্টের অন্য স্যার, ম্যা’মরাও দেখেছিলেন তাদের শিষ্যদের এ আনন্দ…… ততক্ষনে প্রকৃতি তার স্নেহাশীষ ঝরিয়ে ঝরিয়ে শান্ত হয়ে এসেছে।

খেলা শেষ, বৃষ্টিও শেষ, এবারে আসর ভাংলো। কারো মোবাইল ভিজে বন্ধ, কারো হাত-পা ব্যাথা, জীবনে প্রথমবারের মত ভিজে কেউ বা আসন্ন জ্বরের চিন্তায় ভীত……….. কিন্তু প্রত্যেকেই আচ্ছন্ন এক নির্মল আনন্দের শিহরণমাখা আবেশে, শুধু যে সত্তর-আশিজন মেতে উঠেছিল এ অবগাহনে তারাই নয়, বরং এনেক্স বিল্ডিঙ এর বারান্দাগুলোতে দাড়িয়ে যারা পুরো জিনিসগুলো উপভোগ করেছেন, তারাও বাদ যাননি। এ এক অবর্ণনীয় আনন্দ, শুধু যারা ছিলো তারাই বুঝেছে……………

Rain 03

ধন্যবাদ কি বলে জানাবো স্যারকে, তরুণ মনের এ উচ্ছাস উচ্ছলতাকে সম্মান দেখানোর জন্য? ভাষা নেই, তবে তরুণ অন্তরের কৃতজ্ঞতার উত্তাপ স্যারকে স্পর্শ করবে কি?

নিশ্চয়ই, আশা করতে তো আর দোষ নেই !!!

১১ই মে, ২০১১

Advertisements