বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক সংকট এখন আসলে কোন পর্যায়ে আছে তা পরিমাপের কোন মাপকাঠি সম্ভবত পাওয়া যাবে না। গত ২৮ ফেব্রুয়ারী আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুন্যালের দেয়া মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর রায়পরবর্তী সহিংসতার বলী হয়ে যেভাবে রাজনৈতিক নেতাকর্মী। পুলিশ ও সাধারণ মানুষের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে, তা বর্ণনাতীত। মানবাধিকারবিষয়ক সংগঠন অধিকার-এর ৮ই মার্চের তথ্যমতে, সহিংসতায় কমপক্ষে ১৪৩ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন কয়েক হাজার মানুষ। অন্য সূত্রগুলোর মতে নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৬৫তে। আহতের সংখ্যা ৩৮২৮। হতাহতের মধ্যে শতকরা ৯০ ভাগেরও বেশি বেসামরিক মানুষ। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, সঙ্কটের সময় বিশেষ করে যুদ্ধের সময় নারী ও শিশুরা কোন সংঘাতের সঙ্গে জড়িত না থাকলেও তাদেরকেই বেশি দুর্ভোগের শিকার হতে হয়। সাম্প্রতিক সহিংসতায় এটি ফুটে উঠেছে আরো প্রকটভাবে। ক্ষেত্রবিশেষে কারনে অকারণে পুলিশ এবং সরকারদলীয় ক্যাডারদের হাতে প্রত্যক্ষভাবে নিগৃহীত হচ্ছেন নারীরা, যাদের অনেকেই রাজনৈতিক পরিচয় বহন করেন না, এবং তা ঘটছে সরকারী মদদেই। ফলে পরিস্থিতির দিন দিন অবনতি ঘটছে। সত্যিকার অর্থে, রাজনৈতিক কারণে নারীদের উপর এরকম উৎকট পুলিশী হামলা চালানোর ঐতিহ্য আমাদের দেশে ছিলো না। এই সংস্কৃতি কবে কিভাবে কখন বন্ধ হবে বলা হঠিন, কেননা সরকারী চাপে বা সরকারী মতের মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই বিষয়টা একরকম উপেক্ষা করেই যাচ্ছে। গত এক মাসের কিছু ঘটনা আমাদের সামনে বিষয়টি আরও পরিস্কার করে দেবে।

Women Jamaat 2

বগুড়ায় নিহত নারীদের লাশ এভাবেই টেনে হিচড়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে

১। গত ৩রা মার্চ জামায়াতের ডাকা হরতালে বগুড়াতে পুলিশের সাথে সংঘর্ষে তিনজন নারী, এক শিশু সহ ১৪ জন মানুষ গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বগুড়ায় সেনা মোতায়েন করা হয়। হরতালে বিক্ষোভকারীদের সাথে বগুড়ার শাজাহানপুরে পুলিশের সাথে সংঘর্ষে পুলিশ গুলি চালায়। এতে গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলে দুই নারীসহ ৩ জন এবং হাসপাতালে আরও এক নারী মারা যান। নিহতরা হলেন- সাজাপুর পশ্চিম পাড়ার মেহেরাজ উদ্দিনের স্ত্রী আরজিনা বেগম (৪৫), ডোমনপুকুর মণ্ডলপাড়ার তোতা মিয়ার স্ত্রী মনজিলা বেগম (৪৮), ডোমনপুকুরের রকিব উদ্দিনের ছেলে আব্দুর রহমান (৬০) ও ডোমনপুকুর নতুনপাড়ার মনছের আলীর স্ত্রী আছিয়া বেগম (৪৫)

২। গত ৫ মার্চ বিএনপি’র ডাকা সকাল-সন্ধ্যা হরতাল চলাকালে স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও বিএনপি কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এ ঘটনায় ৯ মার্চ সন্ধ্যায় গোলখালী গ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা রেজাউল মোড়ল বাদী হয়ে ৩৬ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত ১০০-১৫০ জনের নামে কয়রা থানায় মামলা করেন। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা আংটিহারা পুলিশ ফাঁড়ির উপ-পরিদর্শক মোমিন ১০-১২ জন পুলিশ সদস্য নিয়ে ঐদিন মধ্যরাতের পর গোলখালী গ্রামে অভিযান চালায়। এ মামলার এক নম্বর আসামি আবদুল গনি সরদারের বাড়িতে তাকে না পেয়ে তার কলেজপড়ুয়া ছেলে সিরাজুলকে আটক করে। এ সময় সিরাজুরের মা আয়শা খাতুনসহ প্রতিবেশীরা ছেলেকে ছাড়িয়ে নেন। এ ঘটনার জেরে পুলিশ-গ্রামবাসীর মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। গ্রামবাসীকে ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ ২৫ রাউন্ড রাবার বুলেট ও শটগানের গুলি ছোঁড়ে। এতে পাঁচ মহিলাসহ সাতজন গুলিবিদ্ধ হয়। এ সময় পুলিশের গুলিতে জাহেদা খাতুন (৪৫), হালিমা (৪০), শাহিদা (৪৫), জাহানারা (৩৬), মেহেরুন্নেছা (৩৬), মহিবুল্যাহ (১৬) ও আবুল বাশার মোড়ল (৫০) গুলিবিদ্ধ হন।

BNP Arrest

গ্রেফতার করা হচ্ছে মহিলা সাংসদদের

Shammi MP

৩। গত সাতই মার্চ বিএনপি’র ডাকা হরতাল চলাকালে সকাল সাড়ে দশটার দিকে আটক করা হয় সংরক্ষিত আসনের চার মহিলা এমপিকে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, সোয়া দশটার পর সংরক্ষিত আসনের চার এমপি আশিফা আশরাফী পাপিয়া, রেহেনা আক্তার রানু, শাম্মী আক্তার ও রাশেদা বেগম হীরা পার্টি অফিসের দিকে আসেন। এ সময় তাদের আটকের চেষ্টা করলে তারা পার্টি অফিসের তালাবদ্ধ প্রবেশ পথের কাছে রাস্তায় বসে পড়েন।একপর্যায়ে টানাহেঁচড়া করে তাদের পুলিশের একটি মাইক্রোবাসে (ঢাকা মেট্রো-চ-১৩৮০৫৪) তোলা হয়। গাড়িটি ডিবি অফিসের উদ্দেশ্যে চলতে শুরু করলে গাড়ির শোরুম হকস বে এর কাছে পুলিশের চলন্ত মাইক্রো থেকে রাস্তায় পড়ে যান শাম্মী আক্তার, আঘাত পান হাতসহ নানা জায়গায়।অবশেষে বিকেলের দিকে ছেড়ে দেয়া হয় এই চার এমপি কে।

RTNN

ফতুল্লায় গ্রেফতারকৃত ছাত্রীরা

৪। গত ১৯ মার্চ নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার ভূইঁঘর এলাকা থেকে জামায়াতে ইসলামীর সহযোগী সংগঠন ছাত্রী সংস্থার ফতুল্লা থানা কমিটির সভানেত্রী ও সাধারণ সম্পাদিকাসহ ১৮ জনকে আটক করেছে পুলিশ। ফতুল্লা মডেল থানার ওসি আকতার হোসেন জানান, ভূইগড় এলাকায় কেফায়েতউল্লাহ মিয়ার মালিকানাধীন ৪র্থ তলা ভবনের ওই স্থানীয় দারুন্নেছা ইসলামিক মাদ্রাসার নবম শ্রেণীর ছাত্রীদের নিয়ে একটি সভা চলছিল। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, জেএসসি পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করা নবম শ্রেনীর ছাত্রীদের সংবর্ধনা দেয়া হচ্ছিলো সেই সভায়; আটক ১৮ জনের মধ্যে বেশিরভাগই নবম শ্রেনীর স্কুলছাত্রী।

৫। গত ২২শে মার্চ জামায়াতের মহানগর নেতা শফিকুল ইসলাম মাসুদের স্ত্রী ডাক্তার জাকিয়া ফারহানা গ্রেফতার করে র‍্যাব। তিনি কাশিমপুর কারাগারে আটক তার পিতা জামায়াতে ইসলামীর রাজশাহী মহানগরীর আমির আতাউর রহমানকে দেখার জন্য গিয়েছিলেন এবং সেখান থেকে ফেরার পথে র‍্যাব সদস্যরা তাকে আটক করে। জাকিয়ার পিতা আতাউর রহমানকে সম্প্রতি র‍্যাব আটকের পর মিরপুর থানায় সোপর্দ করে। সেখানে পুলিশ তাকে রিমান্ডে নিয়ে ব্যাপক নির্যাতন করে। এতে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। তার চিকিৎসক কন্যা মাঝে মধ্যেই পিতাকে দেখতে কারাগারে যান। তবে জাকিয়াকে কোথায় রাখা হয়েছে, কেন তাকে আটক করা হয়েছে সে সম্পর্কে র‍্যাবের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। আনুষ্ঠানিকভাবে র‍্যাবের কোনো কর্মকর্তা এই আটকের বিষয়টি স্বীকারও করেননি। এক বছর বয়সী একটি দুগ্ধপোষ্য শিশুর মাকে আটক করার কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন,শিশুটির পিতা জামায়াতের আরেক নেতা ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ একজন পলাতক আসামি। আর তাকে ধরতেই এই অমানবিক ও নিষ্ঠুর পন্থা গ্রহণ করেছে তারা। ডা: জাকিয়ার মাধ্যমেই তারা শফিকুল ইসলাম মাসুদকে গ্রেফতারের অভিযান চালাচ্ছে। এ ঘটনায় মানবাধিকার সংস্থা ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

Jamaat WOmen 2

এরও আগে, গত বছর ১৭ই ডিসেম্বর মগবাজারে জামায়াতের অঙ্গসংগঠন ইসলামী ছাত্রী সংস্থার কেন্দ্রীয় অফিস থেকে বিশ জন ছাত্রী ও মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় বিচারাধীন জামায়াত নেতা আব্দুল কাদের মোল্লার স্ত্রীকে আটক করে পুলিশ। সেখানে একজন গর্ভবতী মহিলাকেও পুলিশ আটক করে, যাকে আদালতে হাজির করার সময় আটতলা ভবনে জোর করে সিড়ি দিয়ে হেটে উঠতে বাধ্য করা হয়, এবং জামিনও নামঞ্জুর করা হয়। এর প্রতিবাদে ৫ই জানুয়ারী ঐ একই সংগঠন প্রেসক্লাবে একটি প্রতিবাদ সভার আয়োজন করলে সেখান থেকেও অনুষ্ঠানে আগত বক্তাদের গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হয়।

এছাড়াও পুরো মাসজুড়ে দেশব্যাপী হরতাল ও রাজনৈতিক কর্মসূচীতে বিএনপি সহ বিরোধীদলীয় মহিলা কর্মীদের উপর পুলিশের অ্যাকশন। এদের মধ্যে অনেক সাধারণ নারীও পড়ে যান।

Women Police

সাধারণ নারীদের উপর পুলিশী অ্যাকশন

POlice women beatingd

সাধারণ নারীদের উপর পুলিশী অ্যাকশন

Jhenaidah Women

ঝিনাইদহে বিএনপি’র মহিলা দলের মিছিলে পুলিশ ও ছাত্রলীগের যৌথ হামলা

BNP Women

পটুয়াখালীতে মহিলাদের উপর র‍্যাবের অ্যাকশন

BNP WOMEN২রা এপ্রিলের হরতালে ঢাকা থেকে আটক বিএনপি’র মহিলা কর্মী

সবমিলিয়ে পুলিশের অসহিষ্ণু আচরণ ও প্রশাসনের মদদে সরকারদলীয় ক্যাডারদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে নারী নির্যাতনের যে নতুন ‘ট্রেন্ড’ চালু হয়েছে, এটা কোন শুভ লক্ষণ বহন করে না। বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থায় নারীদেরকে সবসময় সম্মানের আসনে রাখা হয়, কিন্তু রাজপথে তাদের এধরণের অবমাননা বিরোধীপক্ষকে আরও ক্ষিপ্ত করে তুলবে, যা সংঘাত নিয়ন্ত্রন ও সহিংসতা বন্ধ করার প্রক্রিয়াকে অসম্ভব করে তুলবে্বে। নিরস্ত্র নারীদের উপর এভাবে ক্রমাগত রাজপথে হামলা চালিয়ে কিংবা ঘর থেকে উঠিয়ে নিয়ে গেলে যে কোন বিবেকবান মানুষের মনেই তা আঘাত করে, আর ভুক্তভোগীরা সুযোগ খোজে প্রতিঘাতের। এই ঘাত-প্রতিঘাত আর রক্তক্ষয় আমাদের গণতন্ত্র এবং দেশকে কতটুকু এগিয়ে নিচ্ছে সেটা বলাই বাহূল্য।

Advertisements