বিশ্বজুড়ে ইসলামী আন্দোলন – হিজবুল্লাহ ও লেবানন

হিজবুল্লাহ হলো লেবাননভিত্তিক একটি শিয়া আদর্শিক ইসলামী আন্দোলন, যারা ইসরাইলের সীমান্তবর্তী অবস্থানে থেকেও সামরিক এবং রাজনৈতিকভাবে জায়নবাদী দখলদার দেশটির উপর সবচেয়ে বেশি চাপ প্রয়োগ করে আসতে সক্ষম হয়েছে। সাইয়েদ হাসান নাসরুল্লাহ’র নেতৃত্বাধীন এই দলটি লেবাননের সাধারণ মানুষের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়, এবং সমগ্র মুসলিম জাহানের অগণিত মজলুম মানুষের প্রেরণার উৎস।

ইতিহাস

ইরান বিপ্লবের পর পর ইমাম আয়াতুল্লাহ খোমেনির কিছু শিষ্যের হাতে যাত্রা শুরু করে লেবাননের হিজবুল্লাহ। মূলত ইরানের রেভ্যুলুশনারী গার্ড বাহিনীর হাতে প্রশিক্ষণ নিয়ে ১৯৮৫ সালে আত্নপ্রকাশ করে দলটি। ছোট একটি সামরিক সংগঠন হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও একে একে সামাজিক কর্মকাণ্ড, রাজনীতিতে অংশগ্রহণ, নির্বাচনে জয়লাভ এবং নিজস্ব স্যাটেলাইট টিভিচ্যানেলসহ সাংস্কৃতিক জগতে সদর্পে পদচারণার মাধ্যমে হিজবুল্লাহ আজ এমন একটি অবস্থানে এসে উপনীত হয়েছে যে এটি এখন – “রাষ্ট্রের ভেতর আর এক রাষ্ট্র” হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে।

HIZZ 03

সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব

মধ্যপ্রাচ্যের সর্ববৃহৎ সামরিক শক্তি হিসেবে পরিচিত ইসরাইলের বিরুদ্ধে হিজবুল্লাহর বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধ অনেককেই বিস্মিত করেছে বলে বিশ্বেরসংবাদ মাধ্যমগুলো স্বীকার করে নিয়েছে৷ মার্কিন টিভি চ্যানেল সি.এন.এন তাদের এক প্রতিবেদনে বলেছে, হিজবুল্লাহকে বাহ্যত অন্যান্য গেরিলা গোষ্ঠীর মতো মনে হলেও বাস্তবে এই সংগঠনটি একটি সুশৃঙখল সেনাবাহিনীর মতো এবং এর রয়েছে শক্তিশালী চেইন অব কমান্ড ৷ বিপুল সংখ্যক আধুনিক রাইফেল ছাড়াও হিজবুল্লাহর কাছে ট্যাংক বিধবংসীরকেট,বোমা নিয়ন্ত্রণ সিস্টেম, নাইট ভিশন ও যোগাযোগ সরঞ্জাম রয়েছে এবং তিন হাজার নিয়মিত যোদ্ধা ইসরাইলী সেনাবাহিনীকে ঘায়েল করার জন্য তৎপর রয়েছে ৷ সি.এন.এন-র প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে,হিজবুল্লাহ/ প্রতিরোধ ও পাল্টা হামলার জন্যে গত পঁচিশ বছরে দক্ষিণ লেবাননের পাহাড়ী অঞ্চলে বিভিন্ন টানেল ও গোপন অস্ত্রাগার নির্মানের পাশাপাশি সমাজ সেবার লক্ষ্যে বিভিন্ন হাসপাতাল ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে৷ এছাড়া,দক্ষিণ লেবাননে এখন তাদের অসংখ্য সর্মথক ও শুভাকাংখী সৃষ্টি হয়েছে -যারা হিজবুল্লাহকে সহযোগিতার জন্য সর্বদা প্রস্তুত।

HIZZ 04

ইসরাইলের দৈনিক হার্টসে’র সামরিক বিষয়ক বিশ্লেষক বলেছেন: ইরানের তৈরী ড্রোন বিমান ফিলিস্তিনের দখলকৃত ভূখণ্ডে প্রেরণের মাধ্যমে প্রমাণ করেছে যে,মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলের সবচেয়ে বুদ্ধিমান শত্রু হচ্ছে হিজবুল্লাহ এবং ইসরাইল ও হিজবুল্লাহ্ পরস্পর হতে ভয় পায়। আমুস হারইল বলেন : ইসরাইলের নিরাপত্তা সংস্থা, হিজবুল্লাহ’র ড্রোন এদেশের আকাশ সীমার নিরাপত্তা ফাঁকি দিয়ে এ দেশের সীমান্তে প্রবেশ বিষয়ক তদন্তের বিষয়ে নিরব রয়েছে। কিন্তু যা কিছু স্পষ্ট তা হল,এ বিমানটি ৬ বছর পূর্বে প্রেরিত অপর ৩টি বিমানের মত ছিল না। প্রেরিত এ ড্রোনের কাজ ছিল ইসরাইলের অভ্যন্তরে বিভিন্ন লক্ষ্যের ছবি সংগ্রহ করা ও ইসরাইলের আকাশ সীমার নিরাপত্তা ব্যবস্থা পরীক্ষা করা এবং জায়নবাদীদের মাঝে এক প্রকার ত্রাসের সৃষ্টি করা। আমুস হারইল আরো বলেন : হিজবুল্লাহ ক্ষেপণাস্ত্রসমূহের বিষয়ে সৈয়দ হাসান নাসরুল্লাহ’র বক্তব্য এবং ইসরাইলের বেসামরিক ভবনসমূহকে টার্গেট করার বিষয়ে তার প্রদত্ত তথ্য অত্যন্ত সুক্ষ্ম। আর নাসরুল্লাহ কর্তৃক ড্রোন প্রেরণটিও ছিল হিজবুল্লাহর ক্ষমতার বহির্প্রকাশ, যা ইসরাইলের জন্য লজ্জার কারণ হয়েছে (কেননা এতদিন পর্যন্ত তাদের অহংকার ছিল যে, তাদের আকাশ সীমার নিরাপত্তা ফাঁকি দেওয়া অসম্ভব)।

রাজনৈতিক বিজয়

লেবাননে সংসদ নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশিত হবার পর হিজবুল্লাহর মহাসচিব হাসান নাসরুল্লাহ দেশের জনগণ এবং নব নির্বাচিত সংসদ সদস্যদেরকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। গত ৭ই জুন রোববার অনুষ্ঠিত লেবাননের সংসদ নির্বাচনে স্বাধীনতা পরবর্তী গত ৬০ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক ভোটার অংশ নিয়েছেন। সাদ উদ্দিন হারিরির নেতৃত্বাধীন ফোরটিন মার্চ গ্রুপ নির্বাচনে বেশি সংখ্যক আসন পেয়েছে। জাতীয় সংসদের ১২৮ টি আসনের মধ্যে ‘ফোরটিন মার্চ’ গ্রুপ ৭১ টি এবং হিজবুল্লাহর নেতৃত্বাধীন ‘এইট মার্চ’ গ্রুপ ৫৭ টি আসন পেয়েছে।

লেবাননের সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর জয়-পরাজয় বড় কোন বিষয় নয়, দেশটির গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো কোন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা পাবেন,তা সংবিধান অনুযায়ী আগে থেকেই নিধারিত হয়ে আছে। সংবিধান অনুযায়ী লেবাননের প্রেসিডেন্টকে অবশ্যই ম্যারোনাইট খ্রীস্ট্রান সম্প্রদায়ের, প্রধানমন্ত্রীকে সুন্নী মাজহাবের এবং সংসদ স্পিকারকে শিয়া মাজহাবভূক্ত হতে হবে। এছাড়া, বিভিন্ন সম্প্রদায় ও অঞ্চলের জন্য সংসদে আসন নির্ধারিত আছে। এ কারণে সেখানে সংসদে বেশি আসন পেলেও কোন দল বা জোটের একক সিদ্ধান্তে সব কিছু করার সুযোগ নেই। নির্বাচনের ফলাফল ঘোষিত হবার পর লেবাননের অধিকাংশ নেতাই বলেছেন, নির্বাচনে কোন দল বা জোট নয় বরং জনগণ ও গণতন্ত্রের বিজয় হয়েছে। তারা ঐক্যমত্যের ভিত্তিতে সরকার পরিচালনার উপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। লেবাননকে নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ষড়যন্ত্রের অন্ত নেই। এ কারণে দেশটির সরকার ও জনগণকে সর্বদা সজাগ ও সতর্ক থাকতে হয়। হিজবুল্লাহর নেতৃত্বাধীন জোট যাতে সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয় লাভ করতে পারে, সে লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র গত এক বছর ধরে ব্যাপক চেষ্টা চালিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে বিপুল অংকের অর্থ ব্যয় এবং হুমকি প্রদর্শনেরও বহু ঘটনা ঘটেছে। যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি ইসরাইলও ব্যাপক চেষ্টা চালিয়েছে নির্বাচনকে প্রভাবিত করার জন্য। এত ষড়যন্ত্রের পরও হিজবুল্লাহ যে কয়েকটি আসনে প্রার্থী দিয়েছিল, তার সব ক’টিতে বিজয় পেয়েছে। এর মধ্য দিয়ে ইসরাইল বিরোধী প্রতিরোধ আন্দোলনের প্রতি জনগণের ব্যাপক সমর্থন আরও একবার স্পষ্ট হয়েছে। এ অবস্থায় লেবাননে এখন সব দলের অংশগ্রহণে জাতীয় ঐক্যমত্যের সরকার গঠন করা দরকার,যাতে সবার প্রচেষ্টায় দেশ উন্নয়ন ও অগ্রগতির পথে এগিয়ে যায়। পাশাপাশি ইসরাইলের যে কোন আগ্রাসন ও ষড়যন্ত্র মোকাবেলায় প্রতিরোধ আন্দোলনকেও চাঙ্গা রাখতে হবে। আর এর ব্যত্যয় ঘটলে দেশ আবারও অতীত সংকটে ফিরে যাবে।

HIZZ 05

সামাজিক কর্মকাণ্ড

হিজবুল্লাহ ব্যাপকহারে সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়ে থাকে। শিক্ষা বিস্তার, চিকিৎসা ও সমাজসেবামূলক কাজে এর পরিধি পুরো লেবানন জুড়েই বিস্তৃত। পাশাপাশি হিজবুল্লাহ স্থাপন করেছে – “আল শহীদ সোস্যাল এসোসিয়েশন”, যার মাধ্যমে দ্বীনের পথে শহীদ হওয়া মুজাহিদদের পরিবারকে যথাযথভাবে পুনর্বাসিত করা হয়। জাতিসংঘ স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে, একটি দেশের সরকারের যা যা করা উচিত, হিজবুল্লাহ সেগুলোই করে থাকে। ২০০৬ সালে ইসরাইলের সাথে যুদ্ধের সময় পুরো বৈরুত শহরে পানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। হিজবুল্লাহ এককভাবে বিকল্প ব্যবস্থায় অয়ানি সরবরাহ নিশ্চিত করে। সিএনএন এর ভাষ্যমতে, হিজবুল্লাহ শহরের আবর্জনা পরিস্কার থেকে শুরু করে স্কুলঘর মেরামত পর্যন্ত সকল কাজই করে থাকে। এমনকি, যুদ্ধাহত মুজাহিদদের বিনোদনের জন্য হিজবুল্লাহ পরিচালিত অ্যামিউজমেন্ট পার্কগুলোও ব্যপকভাবে ব্যবহৃত হয়। এভাবেই লেবানিজ জনমানুষের মধ্যে হিজবুল্লাহ্র একটি ব্যপক গ্রহণযোগ্যতা সৃষ্টি হয়েছে।

ইসরাইলের বিরুদ্ধে হিযবুল্লাহর বিজয় – বন্দী বিনিময়

ইসলামী প্রতিরোধ আন্দোলনের কর্মীরা বছরের পর বছর ধরে সংগ্রাম চালাবার পর ২০০০ সালের মে মাসে প্রথমবারের মতো ইসরাইলী সেনাদেরকে দক্ষিণ লেবানন থেকে তাড়াতে সক্ষম হয়। ২০০৬ সালের জুলাই মাসে ইসরাইলী সেনারা হিযবুল্লাহকে নিশ্চিহ্ন করার লক্ষ্যে মার্কিন পৃষ্ঠপোষকতায় লেবাননের ওপর হামলা চালায়। কিন্তু ৩৩ দিন যুদ্ধ করার পর লেবাননের জনগণ এবং হিযবুল্লাহর পর্বত কঠিন প্রতিরোধের মুখে ইসরাইল মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত হয় এবং তাদের নৃশংস হামলা বন্ধ করতে বাধ্য হয়।

ইহুদিবাদী ইসরাইলের বিরুদ্ধে লেবাননের হিযবুল্লাহর তৃতীয় বিজয় অর্জিত হয় ইসলামী প্রতিরোধ আন্দোলন হিযবুল্লাহর শহীদদের লাশ এবং বন্দীদের ফেরত আনার মাধ্যমে। বিগত কয়েক মাস ইসরাইলের সাথে আলোচনাকালে তারা লেবাননী বন্দী ও শহীদদের লাশ ফেরত দিতে অস্বীকার করে আসছিলো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হিযবুল্লাহর চাপের মুখে তারা কেবল লেবাননী শহীদদের লাশ এবং বন্দীদেরকেই ফেরত দিতে বাধ্য হয় নি বরং বন্দী বিনিময়ের পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত তারা জানতেও পারে নি যে তাদের ঐ দুই সৈন্য যুদ্ধে নিহত হয়েছে। জার্মান সরকারের মধ্যস্থতায় ইসরাইলের সাথে পরোক্ষভাবে দীর্ঘ আলোচনার পর তাঁদের ৫ জন বন্দী এবং অন্তত ২০০ শহীদের লাশ দেশে ফেরত আনতে সক্ষম হয়েছে। পক্ষান্তরে হিযবুল্লাহ ইসরাইলী ২ সেনার লাশ অধিকৃত ফিলিস্তিনে ফেরত পাঠিয়েছে। এরফলে ইসলামী গণআন্দোলন হিযবুল্লাহ ইসরাইলের সামনে তাদের শক্তিমত্তাই প্রমাণ করলো।

হিযবুল্লাহ তাদের এই অভিযানকে ক’মাস আগে সিরিয়ায় ইসরাইলী গোয়েন্দাদের হাতে শহীদ ইমাদ মুগনিয়ার নামে নামকরণ করেছে। মুগনিয়া হাজ্জ্ব রেজোয়ান নামেই বেশি পরিচিত ছিলেন। সেজন্যে এই অভিযানের নাম দেওয়া হয়েছে রেজোয়ান অভিযান। ইসরাইলের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লেবাননের সাথে বন্দী বিনিময়ের দিনটিকে তাদের দেশের জন্যে শোক দিবস বলে মন্তব্য করেছেন।ইসরাইলী দৈনিক ইয়াদিউত অহরুনুত এ সম্পর্কে লিখেছে,’ইসরাইলীরা বেদনার অশ্রু ঝরাচ্ছে আর লেবাননীরা ঝরাচ্ছে গর্ব ও আনন্দের অশ্রু।

হিযবুল্লাহর বিজয়গুলো সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ যে প্রশ্নটি সামনে আসে তাহলো অন্যান্য আরব দেশ সুসজ্জিত সেনাবাহিনী থাকা সত্ত্বেও এবং উন্নত অস্ত্রশস্ত্রের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও কেন ইসরাইলের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত এ ধরণের বিজয় অর্জন করতে পারলো না! ইসরাইলের বিরুদ্ধে হিযবুল্লাহর বিজয়ের অনেকগুলো কারণ রয়েছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ কারণটি হলো,হিযবুল্লাহর মুমিন সংগ্রামীদের আল্লাহর প্রতি অগাধ বিশ্বাস ও নির্ভরতা এবং তাদের মুজাহিদদের প্রতি আল্লাহর সাহায্য। এ কারণেই হিযবুল্লাহর পতাকায় কোরআনের একটি শ্লোগান নজরে পড়বে। শ্লোগানটি হলো ‘জেনে রাখো,নিঃসন্দেহে হিযবুল্লাহ বিজয়ী।’

ইসরাইলের বিরুদ্ধে হিজবুল্লাহর বিজয়ের নেপথ্যে

হিজবুল্লাহ তার প্রতিষ্ঠার ২৬ বছরে বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেখিয়ে দিয়েছে যে,তারা নিজেদের দলীয় স্বার্থে নয় বরং লেবাননের জনগণকে ইসরাইলী আধিপত্য ও নির্যাতন থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্যেই সংগ্রাম করে। এই সংগঠনটি জনকল্যাণমূলক কাজে কীভাবে আত্মনিবেদিত তা লেবাননবাসী খুব ভালো করেই জানে। হিযবুল্লাহ নিরীহ-বঞ্চিতদের সাহায্যে তাদের হাত সবসময় বাড়িয়ে দিয়েছে। এ কারণেই হিযবুল্লাহর প্রতিরোধ আন্দোলন কেবল শিয়াদের কাছেই নয় বরং লেবাননের আহলে সুন্নাত,খ্রিষ্টান এবং সংখ্যালঘু দ্রুযদের কাছেও সমানভাবে জনপ্রিয়।

হিজবুল্লাহর প্রতিরোধ আন্দোলনের প্রতি জনগণের সমর্থনও ইসরাইলের বিরুদ্ধে হিযবুল্লাহর বিজয়ের আরেকটি প্রধান কারণ। দক্ষিণ লেবানন দখলের বছরগুলোতে এবং ২০০৬ সালে ৩৩ দিনের যুদ্ধের সময় লেবাননের জনগণ ইসরাইলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে হিযবুল্লাহকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন দিয়েছে। প্রতিরোধ যোদ্ধাদের পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়ার ক্ষেত্রে তারা মোটেও পিছপা হয় নি। লেবাননের জনগণ তাদের প্রতিরোধ যোদ্ধাদেরকে নিজেদের সন্তান বলে মনে করে।কেননা; তারা তাদের জীবনোৎসর্গ করে তাদের ধর্ম,দেশ ও জাতিকে রক্ষা করার জন্যে সংগ্রাম করে।

HIZZ 06

এসবের বাইরেও হিজবুল্লাহর বিজয়ের পেছনে সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহর মতো সচেতন,সৎ,বিচক্ষণ ও দেশপ্রেমিক নেতারও যথেষ্ঠ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে । অধিকৃত ফিলিস্তিন থেকে প্রকাশিত দৈনিক মাআরিভ হিযবুল্লাহ এবং ইসরাইলের মধ্যে বন্দী বিনিময় সম্পর্কে লিখেছে-‘ইসরাইল পরাজিত হয়েছে এবং হিযবুল্লাহর মহাসচিব সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহর ভাবমূর্তি ব্যাপক শক্তিশালী হয়েছে। ইসরাইলের সাথে যুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী নেতা সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহ আরব বিশ্বের এক নম্বর নেতার শিরোপা অর্জন করেছেন। এই মহান স্বীকৃতি ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা হয়ে গেছে।

হিজবুল্লাহ কেবল স্বার্থপরের মতো নিজেদের শহীদদের ব্যাপারেই তৎপরতা চালায় নি বরং তারা দল-মত নির্বিশেষে পরিপূর্ণ ইসলামী মানবিক আচরণ করে সকল বন্দীর জন্যেই সমানভাবে চেষ্টা চালিয়েছে। সামির কান্তারের মুক্তিই তার প্রমাণ। কেননা সামির কান্তার ৩০ বছর আগে অর্থাৎ হিযবুল্লাহ নামক সংগঠনটি গঠিত হবারও আগে ইসরাইলীদের হাতে বন্দী হয়েছিল। তাকে মুক্ত করার জন্যে হিযবুল্লাহ যে প্রচেষ্টা চালিয়েছে,সেই প্রচেষ্টার ফলে সামির কান্তার এতো বেশি প্রভাবিত হয়েছে যে,সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহকে তিনি তাঁর নেতা এবং শিক্ষক বলে মন্তব্য করতেও কুণ্ঠিত হন নি। তিনি বলেছেন-তাঁর ভাষায়-‘গতকাল পর্যন্ত শত্রুদের হাতে বন্দী ছিলাম,কিন্তু আজ থেকে আরো বেশি উৎসাহ-উদ্দীপনার সাথে শত্রুদের বিরুদ্ধে লড়ে যাবো।’

মজার ব্যাপার হলো,হিযবুল্লাহ অন্যান্য দেশের বন্দীদের মুক্তির জন্যেও বিশেষ করে ফিলিস্তিনী বন্দীদের মুক্তির ব্যাপারেও চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এ বিষয়টির প্রতি ইঙ্গিত করে হিযবুল্লাহ নেতা জনাব হাসান নাসরুল্লাহ বলেছেন,’বন্দী বিনিময়ের ক্ষেত্রে ইসরাইলীদের হাতে বন্দী ফিলিস্তিনীদের মুক্তির বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার জন্যেও আমরা জোর প্রচেষ্টা চালিয়েছিলাম। জাতিসংঘকে লেখা আমাদের চিঠিপত্রগুলোতে তার সুস্পষ্ট প্রমাণ বিধৃত আছে।’লেবাননের ইসলামী প্রতিরোধ আন্দোলন হিযবুল্লাহ,আরব লীগকেও অনুরোধ করেছে,তারা যেন ইসরাইলীদের কারাগারে বন্দী আরব ও ফিলিস্তিনীদের মুক্তি দেওয়ার জন্যে ইসরাইলের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে বিশ্ববাসীর প্রতি আহ্বান জানায়।

HIZZ 02

ইসরাইলী কারাগার থেকে মুক্ত বন্দীদের অভ্যর্থনা জানানোর অনুষ্ঠানে হিজবুল্লাহ নেতা হাসান নাসরুল্লাহ বলেছেন-‘সকল প্রতিরোধ আন্দোলন এবং এ অঞ্চলকে জুলুম নির্যাতন থেকে মুক্ত করার জন্যে যারাই চেষ্টা-প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে,তাদের পরিচয়,তাদের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য আসলে এক এবং অভিন্ন,তাহলো-দখলদার শক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা। লেবাননের জনগণ অত্যন্ত সচেতনতা এবং বিচক্ষণতার      সাথে এই প্রতিরোধ সংগ্রাম চালিয়ে এসেছে। এই সংগ্রামের মাধ্যমেই হিযবুল্লাহ ইসরাইলকে পতনের অতল গহ্বরে নিক্ষেপ করেছে। জুলুম-নির্যাতনের বিরুদ্ধে দৃঢ়তার সাথে দাঁড়িয়ে অত্যাচারীদেরকে আত্মসমর্পনে বাধ্য করা এবং নিজেদের অধিকার ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে লেবাননের ইসলামী প্রতিরোধ আন্দোলন ইরাক কিংবা ফিলিস্তিনের মতো দখলদারদের যাঁতাকলে পিষ্ট দেশগুলোর জন্যে সফলতার এক অনন্য আদর্শ ও নিদর্শন।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

w

Connecting to %s