সারা পৃথিবীতে ফ্রেশওয়াটার সোয়াম্প ফরেস্ট বা স্বাদুপানির জলাবন আছে মাত্র ২২টি। ভারতীয় উপমহাদেশ আছে এর দুইটি…… একটা শ্রীলংকায় আর আরেকটা আমাদের সিলেটের গোয়াইনঘাটে। স্থানীয় মানুষজনের কাছে এইটা “সুন্দরবন” নামেই বেশি পরিচিত। যাবো যাবো করেও গত বর্ষায় আর প্ল্যান করা হয়ে ওঠেনি, এইবার তাই বর্ষা আসার আগেই দৌড় !

হুটহাট করে প্ল্যান নিয়েই আমরা বেরিয়ে যাই সবসময়। এবারো তাই। ঢাকায় অঝোরে বৃষ্টি, ভাবলাম সিলেট তো পানির তলে তলিয়ে যাবেই !!! আশ্চর্য, আমরা সিলেটের বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচার জন্য ব্যাগে করে ছাতা নিয়ে গেলাম………… সেই ছাতা সারাদিন মাথায় দিয়ে ঘুরতে হলো কড়া রোদ থেকে বাঁচার জন্য !!

ফকিরাপুল থেকে রাত সাড়ে এগারোটার বাসে উঠে আমরা সিলেটের কদমতলীতে নামলাম ভোর পাঁচটায়। এরপর সোজা দরগাহ গেট (হযরত শাহজালালের (রঃ) মাজার) চলে এসে নামাজ, নাস্তা খেয়ে টেয়ে বেরিয়ে পড়লাম। আম্বরখানা পয়েন্ট থেকে একটা সিএনজি নেয়া হলো, গন্তব্য মটরঘাট। লাক্কাতুরা – মালিনীছড়া চা বাগান আর ওসমানী বিমানবন্দরকে পাশে রেখে মসৃণ রাস্তায় ওড়া শুরু করলো সিএনজি।

মটরঘাটে নেমে এইবার নৌকা নেয়ার পালা……… ডিঙ্গি নৌকা। এতো ভোরে এখানে কোন মানুষজন নাই। মাঝি নুরু মিয়ার সাথে ৩০০ টাকায় রফা হলো। পাতলা নৌকা, একটু নড়াচড়া করলেই দুলে ওঠে। যাক, মূর্তার ঝাড়ের মধ্যখান দিয়ে ঝোপ কেটে কেটে নৌকা চলতে শুরু করলো। চেঙ্গীর খাল পার হয়ে এবার আসল রাতারগুলে ঢুকে গেলাম। এরপর আর কথাবার্তা নাই…………… স্তব্ধভাষ – রুদ্ধশ্বাস – বিমূগ্ধ – বিস্ময়ে বিমোহিত !!!!!!!

RR 01বনের নাম – রাতারগুল !!!

RR 07

মূর্তা’র ঝাড়…… সাদা সাদা ফুল ফুটে আছে

    RR 05  হিজল আর কড়চ গাছের জলমগ্নতা

RR 02

নিস্তব্ধতার মধ্যে শুধু বৈঠার ছলাৎ ছলাৎ শব্দ আর পাখির ডাক

RR 03

আমাজানের কথাই মনে পড়ে যায়

RR 04

এখানে নানাধরণের সাপ আছে, তবে আমরা ছোটখাটো যেগুলো দেখেছি সেটা ক্যামেরায় ওঠানো যায় নি।

RR 06

চেঙ্গী খাল থেকে রাতারগুল

ভারতের মেঘালয়ের জলধারা গোয়াইন নদীতে এসে পড়ে, আর সেখান কার এক সরু শাখা চেঙ্গী খাল হয়ে পানিটা প্লাবিত করে রাতারগুল জলাবনকে। বর্ষা মৌসুমের প্রায় সবসময়ই পানি থাকে বনে (মে – সেপ্টেম্বর)। শীতকালে অবশ্য সেটা হয়ে যায় আর দশটা বনের মতোই, পাতা ঝরা শুস্ক ডাঙ্গা।

রাতারগুল যাওয়ার পথ

প্রথম উপায় – সিলেট থেকে জাফলং – তামাবিল রোডে সারীঘাট হয়ে সরাসরি গোয়াইনঘাট পৌছানো। এরপর গোয়াইনঘাট থেকে রাতারগুল বিট অফিসে আসবার জন্য ট্রলার ভাড়া করতে হবে, ভাড়া ৯০০ – ১৫০০ এর মধ্যে (আসা – যাওয়া) আর সময় লাগে ২ ঘন্টা। বিট অফিসে নেমে ডিঙ্গি নৌকা নিয়ে বনে ঢুকতে হবে, এতে ঘন্টাপ্রতি ২০০-৩০০ নিবে।

দ্বিতীয় উপায় – সিলেটের আম্বরখানা পয়েন্ট থেকে সিএনজি নিয়ে গোয়াইনঘাট পৌছানো, ভাড়া পড়বে ৫০০ টাকা। ওসমানী এয়ারপোর্ট – শালুটিকর হয়ে যাওয়া এই রাস্তাটা বর্ষাকালে খুবই সুন্দর। এরপর একইভাবে গোয়াইনঘাট থেকে রাতারগুল বিট অফিসে আসবার জন্য ট্রলার ভাড়া করতে হবে, ভাড়া ৮০০ – ১৫০০ এর মধ্যে (আসা – যাওয়া) আর সময় লাগে ২ ঘন্টা। বিট অফিসে নেমে ডিঙ্গি নৌকা নিয়ে বনে ঢুকতে হবে, এতে ঘন্টাপ্রতি ২০০-৩০০ নিবে।

তৃতীয় উপায় – সিলেটের আম্বরখানা পয়েন্ট থেকে সিএনজি নিয়ে মটরঘাট (সাহেব বাজার হয়ে) পৌছাতে হবে, ভাড়া নেবে ২০০-৩০০ টাকা আর সময় লাগবে ঘন্টাখানেক। এরপর মটরঘাট থেকে সরাসরি ডিঙ্গি নৌকা নিয়ে বনে চলে যাওয়া যায়, এতে ঘন্টাপ্রতি ২০০-৩০০ নিবে। এই তৃতীয় পথটিতেই সময় ও খরচ সবচেয়ে কম।

বনে বা তার আশেপাশে খাবার বা থাকার কোন ভালো ব্যবস্থা নেই। তাই খাবার গোয়াইনঘাট বা সিলেট থেকে নিয়ে আসা যায়। আরেকটা বিষয়, নৌকায় করে ঘোরার সময় পানিতে হাত না দেয়াই ভালো………… জোক সহ বিভিন্ন পোকামাকড় তো আছেই, বিষাক্ত সাপও পানিতে বা গাছে দেখতে পাওয়া যায় অনায়াসেই। আর আছে বানর, এবং নাম জানা – অজানা অনেক অনেক পাখি।

তবে বনের পরিবেশ নষ্ট করবেন না, আর পলিথিন, বোতল, চিপস – বিস্কুটের প্যাকেট এইসব জিনিস পানিতে ফেলবেন না দয়া করে। আমাদের নিজেদের প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষার দায়িত্ব আমাদেরই।

হ্যাপি ট্র্যাভেলিং !!!

Advertisements