সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তার ভ্রমণ সংকলন “পায়ের তলে সর্ষে” বইয়ের নানান কাহিনীতে এক বুড়োর কথা উল্ল্যেখ করেছেন, যে একবার তার জেলার সীমানায় এসে বিহবল হয়ে গিয়েছিলো ! জেলার শেষ প্রান্ত !!!

মোটামুটিভাবে আমরাও তাই হয়েছিলাম একবার……… তিন জেলার মিলনস্থল এক অদ্ভুত জায়গায় গিয়ে। তার পাশ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে ব্রহ্মপুত্র নদী আর সেখানে আছে এমন এক খাবার জায়গা যেখানে নাকি বাংলাদেশের সরবোচ্চ সংখ্যক আইটেম রান্না হয় !!!

জায়গাটার নাম টোক বাজার। গাজীপুরের কাপাসিয়া, কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া আর ময়মনসিংহের গফরগাঁও………… এই তিন জেলা যেখানে কাটাকাটি করে, সেখানেই এই শান্ত ছোট্ট বাজারটা দাঁড়িয়ে আছে। ঢাকা থেকে ভুঙ্গামার্কা এক লোকালে ২৫ টাকা দিয়ে নামলাম গাজীপুর চৌরাস্তায়। এরপর সেখান থেকে বাস, বাসের নাম “অনন্যা” !! সরাসরি টোক বাজার নামিয়ে দিবে ভাড়া ৭০ টাকা।

  niribili-001

তোতা মিয়ার নিরিবিলি হোটেল, টোক বাজার, কাপাসিয়া, গাজীপুর

টোক বাজারে পৌছে দেখি এগারোটার মত বাজে, অথচ তোতা মিয়ার নিরিবিলি হোটেলে লাঞ্চ আওয়ার শুরু হয় বারোটার পর থেকে। জানা গেলো, পাশেই আছে মহামতি ঈশা খাঁ’র স্মৃতি বিজড়িত এগারোসিন্দুর। সেটা পড়েছে অবশ্য কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া থানায়। দশ টাকা করে অটো ভাড়া দিয়ে আমরা চলে আসলাম। এখানকার সবচেয়ে বিখ্যাত নাকি একটা মাজার……… শাহ গরীবুল্লাহ’র মাজার। সেই মাজারের পাশের এক ঈদ্গাহের গেটে আমাদের নামিয়ে দিলো অটো। আর আমরাও পূর্ণমাত্রায় ট্রোলড।tok-001

এই হলো মাজার !!! টিলার ওপর অশ্বত্থ গাছটার নিচে !

এর আশেপাশে দুটো পুরনো মসজিদ আছে, যার খোজে আমরা হাটা দিলাম। ঈশা খাঁর সময়ে দু’জন দরবেশ এগুলো তৈরি করেন। আর মূল যে আকর্ষণ, এগারোসিন্দুর যুদ্ধক্ষেত্র…………… যেখানে বাংলার মসনদ-ই-আলা’র বীরত্ব ও মহত্ত্বের কাছে মুঘল সেনাপতি রাজপুত বীর মানসিংহ পরাজিত হয়েছিলেন……… সেখানে আজ দিগন্তজোড়া ধানক্ষেত। কিছু পুরনো কেল্লা টাইপ স্ট্রাকচার নাকি ছিলো, সেগুলো গ্রামের মানুষ মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়ে সেখানে চাষাবাদ করেছে। নিজেদের গৌরবজ্জল ইতিহাস মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে আমরা যথেষ্ট পটু।tok-04

হযরত শেখ মাহমুদ শাহ মসজিদtok-03

হযরত শেখ সাদী মসজিদtok-05

হযরত শেখ মাহমুদ শাহ মসজিদ – প্রবেশদ্বার

যাক, এভাবেই দুপুর গড়িয়ে গেলো। মসজিদে যোহরটা পড়ে নিয়ে আমরা ফিরে আসলাম টোক বাজারের নিরিবিলি হোটেলে। ইতোমধ্যে গাড়ীতে করে লোকজন আসা শুরু হয়েছে, ভিড় বাড়তে শুরু করেছে। ভাবগতিক যা বুঝলাম………… হঠাত করেই নাম কামিয়ে ফেলার কারণে তোতা মিয়া তার খাবার দাবারের দামও বাড়িয়ে দিয়েছেন।

niribili-002

এখান থেকে বাছাই করুন !!!

আমরা মূলত ভর্তা – ভাজি খাবার জন্যই এসেছি এখানে, তাই পারহেড ১২০ টাকায় প্রায় পেটচুক্তি খাওয়া হয়ে গেলো !!!niribili-003

আলুভর্তা, শুটকি ভর্তা,অসাধারণ একটা টাকি মাছের ভর্তা আর বরইয়ের চাটনি !!!niribili-004

ভর্তা – ভাজি রিলোডেড

এখানে মাছ, গোশত, সবজি মিলিয়ে প্রায় ৭০টি (অন্তত তারা তাই বলেন) আইটেম করা হয়, যার মধ্যে ৪০ টিই থাকে ভর্তা – ভাজি। দাম এখনও রিজনেবলী কম, তবে আকাশ ছুতে হয়তো বেশি সময় লাগবে না। আর মাটির চুলায় লাকড়ির রান্না খাবারের স্বাদ আরও বাড়িয়ে দেয়।tok-002

নদীর নাম ব্রহ্মপুত্র

খেয়ে দেয়ে বের হতে পড়ন্ত দুপুর……… প্রায় বিকেল। বাজার পেরোলেই দেখি নদী। কি নাম? ব্রহ্মপুত্র। লোকজন হরদম খেয়ায় আসা যাওয়া করছে। আমরা উঠে বসলাম, দেখি না কি হয়। পাঁচ টাকা ভাড়া দিয়ে মিনিট বিশেক পর ওপারের ঘাটে নামলাম……… গফরগাও, ময়মনসিংহ এসে গেছি !!! এখানে একটা ফেরীঘাট আছে, সেখানে ভুংভাং কিছু ছবি তোলা হলো। এরপর আবার খেয়া পার হয়ে আমরা ধরলাম ঢাকায় ফেরার পথ।

অত্যন্ত নিষ্ঠাবান ভোজন যোদ্ধা নাহলে সাধারণত ঢাকা থেকে কেউ এদিকে পা মাড়ান না। তবে, জায়গাটা নেহায়েত অখাদ্য না। ভগ্ন হলেও একটা প্রাচীণ ইতিহাস আছে, ঐতিহ্য আছে, দুর্দান্ত একটা খাওয়া আছে, নদী আছে…………

আর সবকিছুই যখন সস্তাতেই মিলে যাচ্ছে, মন্দ কি ?

Advertisements