বাড়ির পাশের জেলা, কিন্তু এখানে যে এতো ঐতিহ্য লুকিয়ে আছে, সেটা আবিস্কার করতে লাগলো এতো দিন। ঘোরাঘুরির প্ল্যান ছাড়াই কাজে এসেছিলাম ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলায়। এখানে মূল অ্যাট্রাকশন তিনটা – বারোবাজারের প্রাচীণ জনপদ, কিংবদন্তীর গাজী কালু আর চম্পাবতীর কবর আর মল্লিকপুরে এশিয়ার বৃহত্তম বটগাছ। সবকিছু মিলে এক বেলার বেশি লাগা উচিত না। তবে আমাকে সবচেয়ে আকর্ষিত করেছে এখানকার যেই জিনিসটা তা হলো ইতিহাস, এবং এই ইতিহাস আমি জানলাম জায়গাটা ঘুরে আসার পরে :p

বারোবাজার অনেক প্রাচীণ একটা জনপদ। কেউ কেউ বলেন, খ্রীষ্টীয় প্রথম শতাব্দীতে এই অঞ্চলে গংগায়িত রাজ্যের উল্লেখ পাওয়া যায়। এই গংগায়িত বা গংগা রাষ্ট্রের রাজধানী ছিল বারোবাজার (!!!)। তবে এখনকার যা ইতিহাস, তা মুসলিম আমলের। প্রথমে কোন মুসলমান পীর দরবেশ ধর্মপ্রচারে এইখানে পদার্পণ করেছিলেন,ইতিহাসে তার কোন পরিচয় নেই। লোকমুখে এবং অনৈতিহাসিক পুঁথি মারফত যতটুকু জানা যায়, তাতে গাজী কালু ও মহান সাধক উলুখ খান জাহান আলীর নামই বিশেষভাবে প্রসিদ্ধ।

যাক, খুব সকালেই কালীগঞ্জ শহর থেকে বাইক নিয়ে আমরা চলে আসলাম বারোবাজারে। প্রথমেই পড়লো ট্যিপিকাল মুঘল বা সুলতানী স্ট্রাকচারের একটা পুরনো মসজিদ। নাম, গলাকাটা মসজিদ !!!

Jhn 01গলাকাটা মসজিদ

Jhn 02 সাইড ভিউ – গলাকাটা মসজিদ Jhn 03     এই অদ্ভুত ম্যাপটা দেখে কিছুক্ষন হতবাক হয়ে ছিলাম বলা চলে।

এই মসজিদের ভেতর একটা শেলফে পেলাম এক মিনি জাদুঘর !!! সেখানে সুলতান মাহমুদ ইবনে হুসাইনের আমলের ৮০০ হিজরীর আরবি -ফার্সিতে লেখা কয়েকটা পাথর, একটা মরচে ধরা তলোয়ার আর সুলতানের নিজ হাতে লেখা কুরআন রাখা আছে। (মাহমুদ বিন হুসাইন ছিলেন আলাউদ্দিন হুসেন শাহী বংশের সুলতান)। গলাকাটা মসজিদের পাশেই গলাকাটা দীঘি অবস্থিত। প্রবল জনশ্রুতি আছে, এই দীঘি হযরত খান জাহান আলী (রঃ) এর সমসাময়িক। তবে ইতিহাস ঘাটতে গিয়ে বেশ ইন্টারেস্টিং বিষয় জানতে পারলাম। এই মসজিদটার মাত্র ২০০ গজ দক্ষিণ পূর্বদিকে আছে সুপ্রাচীণ গোড়াই মসজিদ এবং মাত্র ১৫০ গজ দূরে পশ্চিমে আরেকটা পুরনো মসজিদ, যার নাম চেরাগদানী মসজিদ। সুতরাং দু’দুটো মসজিদের এত কাছে আরেকটা মসজিদ একটু অসামঞ্জস্যই মনে হয়। তাই কেউ কেউ বলেন, এইটা আসলে ছিলো একটা কালীমন্দির, যেখানে নরবলী হত। গলাকাটা নামটা সেখান থেকেই এসেছে। কালের গর্ভে মন্দির কি মসজিদ হয়ে গেলো কি না তা কে জানে !

এরপর গেলাম এখানকার সবচেয়ে পুরাতন মসজিদটি দেখতে, নাম গোড়ার মসজিদ। এ মসজিদের বাইরের দেয়াল সম্পূর্ণটাই টেরাকোটার কাজ দ্বারা চমৎকার ভাবে সাজানো। ধারণা করা হয়, সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহ বা তার পুত্র নসরত শাহ কর্তৃক এই মসজিদটি নির্মিত হয়েছে। স্ট্রাকচারের দিক দিয়ে চাঁপাই নবাবগঞ্জের খানিয়াদীঘি মসজিদ, দিনাজপুরের সুরা মসজিদ, টাঙ্গাইলের আতিয়া মসজিদের সাথে এই মসজিদের মিল খুঁজে পাওয়া যায়।

Jhn 04গোড়াই মসজিদ

Jhn 05সাইড ভিউ – টেরাকোটার কাজ। গোড়াই মসজিদ

এরপর এক মাঠের মাঝখানে এলাম, এক গম্বুজওয়ালা ছোট্ট একটা মসজিদ। নাম – জোড় বাংলা মসজিদ। ঠিক এর প্যারালালে আরেকটা দূরের মাঠে দেখলাম অবিকল একই রকম মসজিদ।

Jhn 06জোড়বাংলা মসজিদ

আকাশে মেঘ করে আসছে, আপাতত বারোবাজারের পালা সাঙ্গ করা হলো। এখানে আরও বেশ কিছু পুরনো মসজিদ আছে। মৃতপ্রায় ভৈরব নদের তীরে জাহাজঘাটা নামের একটা স্ট্রাকচারও নাকি আছে, যেটা প্রাচীণকালে বন্দর হিসেবে ব্যবহৃত হতো।

এরপরের স্টপ গাজী কালু চম্পাবতীর মাজার। এটাও অবশ্য বারোবাজারেই পড়েছে।

Jhn 07গাজী কালুর মাজারের গেট। সব তকতকা টাইলসের কাজ।

Jhn 08এই অশ্বত্থ গাছে রঙ্গীন ফিতা বেঁধে মান্নত করে অশিক্ষিত মানুষেরা

গাজী-কালু-চম্পাবতীর পরিচয় নিয়ে আছে নানা কিংবদন্তী। জনশ্রুতিতে পাওয়া যায় যে বৈরাগ নগরের শাসক দরবেশ শাহ সিকান্দরেরর পুত্র ছিলেন গাজী কালু, আর চম্পাবতি ছিলেন সাপাই নগরের সামান্ত রাজা রামচন্দ্র ওরফে মুকুট রাজার কন্যা। এক পর্যায়ে গাজীর সাথে চম্পাবতির প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তাদের মিলনের মাঝে দুর্বেধ্য প্রাচীর হয়ে দাঁড়ালো সামাজিক ও ধর্মীয় বাঁধা। কিন্তু গাজী কালু খন্ড খন্ড যুদ্ধে রাজা মুকুট রায়কে পরাজিত করে চম্পাবতীকে উদ্ধার করে নিয়ে আসেন কালীগঞ্জ উপজেলার বারোবাজারে। এখানে নাকি গভীর বন জঙ্গল ছিলো, আর প্রতি বৃহস্পতিবার রাত্রে গাজীর ব্যাঘ্রকুলের আগমন ঘটতো। এখন আর তা হয় না, কারণ জংগলের অভাবে বাঘদের আবাসভূমির অভাব ঘটেছে। কে জানে !!!

এরপর আজকের দিনের ফাইনাল স্টপ – মল্লিকপুরের সেই বটগাছ। ছোটোবেলা থেকেই বইয়ে পড়তাম, এশিয়ার বৃহত্তম বট গাছ !!! প্রাচীর দেওয়া জায়গাটায় ঢুকেই মেজাজ খারাপ হয়ে গেলো। ছোট্ট ছোট্ট অনেকগুলো নতুন গাছ, আসল বড়টা নাকি মরেই গেছে :/

Jhn 09মল্লিকপুরের একটি বটগাছ; আসল গাছের সন্তান।

Jhn 10মল্লিকপুরের একটি বটগাছ; আসল গাছের আরেকটি সন্তান।

Jhn 12গাছটির কবর (??!!) এর এপিটাফ :p

বিশ্বব্যাপী গাছটির পরিচিতি ঘটে ১৯৮২ সালের বিবিসিতে করা একটি রিপোর্টের মাধ্যমে। এখন সবই স্মৃতি। আর জায়গাটার অবস্থাও যাচ্ছেতাই। তবে পাখির কলকাকলী আর টুপটাপ করে ঝরে পড়া বট ফলের শব্দ মোটামুটি একটা মোহময়ী আবেশ দিয়ে ঘিরে রাখে জায়গাটুকু।

ইতিহাস ঐতিহ্য আর দুর্দশাগ্রস্থ পর্যটনের এক মিশ্র অভিজ্ঞতা নিয়ে ফের উঠে বসলাম বাইকে। ঢাকার গাড়ী ধরতে হবে।

Jhn 11যে বাসায় আমরা ভুরিভোজ করেছিলাম, সেখানেই এই বিশাল পাম বাগান। আমি প্রথমে খেজুর গাছ ভেবে ভুল করেছিলাম :p

 

Advertisements