Bastards 02

পনেরো বছর আগের কথা।

মায়ের বিশাল স্বপ্ন ছিল ছেলেকে “আলেম” বানাবেন। তাই, হঠাত করেই মিলিটারী স্কুলে ক্লাস থ্রি’তে পড়াকালীন নিয়ে ভর্তি করিয়ে দিলেন এক ইবতেদায়ী মাদ্রাসায়, ক্লাস টু’তে। স্কুল থেকে ছাড়িয়ে নয়, বরং প্যারালালী। সপ্তাহে তিন-চার দিন স্কুলে যাই, আর লুকিয়ে-চুরিয়ে মাথা নিচু করে দুই এক দিন মাদ্রাসায় যাই। মাতৃআজ্ঞা শিরোধার্য !!! সবই ঠিক ছিলো। দু’জায়গাতেই ক্লাস করতাম, দুই পৃথিবীর মধ্যে পার্থক্যটা খুব সহজেই বুঝে ফেলেছিলাম। একদিকে চকচকে ইউনিফর্ম, পালিশ করা বুট (বুট চকচক না করলে এসেম্বলী থেকে ধরে নিয়ে পিটানী দেয়া হতো) আর নেমট্যাগ/ ব্যাজ লাগিয়ে ব্যাগ-ফ্লাস্ক ঝুলিয়ে ছেলেপেলে স্কুলে আসে, ওদিকে আবার লিল্লাহ বোর্ডিং থেকে মলিন কাবলী আর আশপাশ থেকে পাঞ্জাবীপরা ছেলেগুলো টুপি মাথায় বই-খাতা বুকে চেপে ক্লাসে আসে। আমি সম্ভবত দুই জায়গাতেই মিসফিট ছিলাম, তবুও নতুন জগত বলে মাদ্রাসার প্রতি আমার অন্যরকম একটা আকর্ষণ ছিল।

সব কিছু ঠিকমতই চলছিলো; প্রথম যেদিন মাদ্রাসায় রোলকল পেলাম, তখন আমি কনফিউজড। আমার রোল সবার শেষে। ইয়েস স্যার বলবো, না প্রেজেন্ট উস্তাদ বলবো, না স্রেফ জি হুজুর দিয়ে ট্রাই করবো, সেটা বুঝতে বুঝতে দেখি যাবতীয় ছেলেপেলে লাব্বায়েক লাব্বায়েক করছে। মানে জানতাম না তখনো, যা আছে কপালে……… আমিও “লাব্বায়েক” হয়ে গেলাম। বিপত্তিটা লাগলো পরীক্ষার সময়। সম্ভবত টার্ম পরীক্ষা, বিষয় – ইংরেজী। দুই ঘন্টার পরীক্ষা, আমি ঝড়ের বেগে লিখছি আর লিখছি। একফাকে তাকিয়ে দেখি ছেলেপেলে কলম কামড়ায়, বসে বসে আকাশ দেখে। ঘটনা বুঝলাম প্রথম ঘন্টা দেয়ার পর। আমাদের উস্তাদ এসে বই খুলে প্রশ্নের উত্তরগুলো বোর্ডে লিখতে লাগলেন। এইবার ছেলেপেলে ঝড়ের বেগে লিখতে শুরু করলো, আর আমার কলম বন্ধ।

মানে কি ? সব কিছু লিখে দিলে লেখাপড়া করার কি দরকার ??

বাল্যকালের বুঝ। কেন যেন আমার আর ভালো লাগে নি সেখানকার কোনকিছু। এক পর্যায়ে ছেড়েছুড়ে সুবোধ বালকের মত স্কুলের বেঞ্চে ফিরে আসলাম। আমার মাস কয়েকের মাদ্রাসা জীবনের সমাপ্তি ঘটলো :/ যাই হোক। রিসেন্ট দু’চারটা ঘটনা দেখে-পরে এই পুরনো ত্যানা প্যাচাইতে হলো। গতকাল শুরু হওয়া এসএসসি পরীক্ষায় সাম্প্রতিক ঐতিহ্যের আলোকে এবারও টিচার/ পরিদর্শকদের সহযোগিতামূলক মনোভাব অব্যাহত আছে। তারা ফেসবুকে প্রশ্ন পাবার পরও যারা ঠিকমত বুঝে উঠতে পারছে না কি করবে, তাদের জন্য পরীক্ষার হলেই ছাত্রছাত্রীদের সহায়তা করছেন তারা। ভাবতে ভালই লাগে।

Ramgonj-pic-Dakhil“শিক্ষার্থীরা প্রকাশ্যে যে যার মতো করে একে অন্যের কাগজ দেখে পরীক্ষা দিতে থাকে। তবে এ সময় দায়িত্বরত শিক্ষরা নিবৃত না করে পরীক্ষার্থীদের উত্তরপত্র হাতে নিয়ে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। এ ব্যাপারে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষক বাংলামেইলকে জানান, কেন্দ্র সচিবের নির্দেশে তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন।”

মফঃস্বলের একটা কেন্দ্রে বেয়াড়া সাংবাদিক ঢুকে কোনভাবে ছবিটা তুলে এনেছে, আর না হলে দেশের প্রতিটা জেলায় এমন সহানুভূতিশীল শিক্ষক/ কেন্দ্র সচিব পাওয়া যাবে বলে আমাদের বিশ্বাস।ঢাকার এক নামী স্কুলের পরীক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে অবশ্য শিক্ষকেরা এতটা নমনীয় ছিলেন না। তারা বলেছেন, ‘তোমরা কথা বলো, কিন্তু আস্তে আস্তে।’ পরীক্ষার্থী নিজে এসে আমাকে বলেছে এই কথা। তাকে আমি আগামী পরীক্ষার জন্য ভালো করে পরিশ্রম করে পড়ার চাপ কিভাবে দেই ? কোমলমতি এই শিশুদের প্রতি আমাদের সহানুভূতির মাত্রাটা উছলে উছলে পড়ে। প্রশ্ন পাওয়া, পরীক্ষার হলে সহযোগিতা, খাতা দেখার সময়ে পরীক্ষকদের উপর সুস্পষ্ট নির্দেশনা, সব কিছুর ফলাফল হবে হাজারে হাজারে এ প্লাস। এই এ প্লাসের সংখ্যা যত বাড়ে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তিপরীক্ষায় নূন্যতম পাসমার্ক পাওয়া ছেলেমেয়েদের সংখ্যা ততই কমতে থাকে। প্রশ্ন শুধু একটাই……… এই নাহিদ-জাফর যুগের শতভাগ এ প্লাস পাওয়া এই ছাত্রছাত্রীদের ভবিষ্যৎটা কি হবে? SSC Ramganj জব সেক্টরে অলরেডী পলিটিক্যাল প্রাধান্য ছাড়া কোন কথা নেই। আর যেখানে যেখানে যোগ্যতা বিচার করা হয়, সেখানে  যোগ্যতা-দক্ষতাবলেই হয়তো বিদেশী নাগরিকেরা চাকুরীরত। তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশ হয়েও আমরা নাকি আরেকটি উদীয়মান পরাশক্তির ৫ম বৃহত্তম রেমিট্যান্স প্রোভাইডার। দুঃখ রাখার জায়গাও নাই। হতাশাগ্রস্থ বেকার এক বু’আজিজির আত্নহননের পথ ধরে আরব বিশ্বে বসন্ত নিয়ে আসা বিপ্লবগুলোর বেশিরভাগই মুখ থুবড়ে পড়েছে। কিন্তু তার নিজের দেশ তিউনিসিয়া ঠিকই ধীরে ধীরে ছাই থেকে উঠে দাঁড়াচ্ছে, সত্যিকারের উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। আমাদের দেশে বু’আজিজিরা প্রতিনিয়তই মরে। রাস্তায় আগুনে পুড়ে, নয়তো বুলেটের আঘাতে, নয়তো হতাশার আগুনে। ফলাফল, দেড় লক্ষ পিস ইয়াবার চালান আর এয়ারপোর্ট থেকে উদ্ধার হওয়া হাজার কেজি স্বর্ণ।

ছোটবেলার সেই মাদ্রাসার উস্তাদের প্রতি আমার রাগ ছিলো অনেকদিনই, কেন এইভাবে ছেলেদের পড়ালেখার নামে তামাশা করলেন তিনি !!! হয়তো তিনি খুবই ”দূরদর্শী” (?!) ছিলেন, দিব্যচোখে দেখেছিলেন আজকের এই নাহিদ-জাফর যুগের সবকিছু, যে নির্লজ্জ তামাশা সকল কিছুকে হার মানায় !!! Bastards 01

এর সমাধান চাই, দ্রুত সমাধান। না হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। এখন স্রেফ রাজনৈতিক দাঙ্গা আর ফায়দা হাসিলের জন্য পেট্রোল দিয়ে আগুন দেয়া হয়, নিরীহ মানুষ মারা যায়। আদর করে খাইয়ে দাইয়ে গায়ে হাত বুলিয়ে যে সকল অর্ধশিক্ষিত জোম্বি আমরা গড়ে তুলছি, তারা যখন কোথাও জায়গা পাবেনা, মূল্যায়ন পাবে না, কাজ পাবে না, তখন প্লাস্টিক এক্সপ্লোসিভ আর আরও উচুদরের মারণযজ্ঞ নিয়েই বেরিয়ে আসবে। মরবে, এবং মারবে। আমাদের সবাইকে। যেই ব্যবস্থা, যেই দেশ কিংবা যেই শিক্ষা তাদেরকে তিলে তিলে ধ্বংস করে দিয়েছে, তার বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিলে আপনি তাকে দোষী করতে পারবেন ?

সম্ভবত না :/

——————————————————————————————————————–

পুনশ্চঃ মাদ্রাসাটার শিক্ষাব্যবস্থা আসলে এইরকম ছিলো না। ওখান থেকে হাফেজী পড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টপ সাবজেক্টে পড়াশোনা করে ইয়োরোপে পিএইচডি করতে গেছেন, এমন ছাত্রকে আমি জানি। আর মাদ্রাসার ছাত্ররা স্বভাবতই ইংরেজিতে দুর্বল হয়, সম্ভবত সে কারণেই উস্তাদ লিখে দিচ্ছিলেন বোর্ডে। ঐ মাদ্রাসার ছাত্র হয়েই IELTS এ 8.5 পাওয়া ছাত্রকেও জানি।

উস্তাদের প্রতি আর কোন রাগ নাই :p :p

Advertisements