যারা আমার মত সর্বদা খাওয়ার আগে এবং মাইরের পিছে থাকেন, তাদের জন্য ভারতের রাজধানী দিল্লী হলো তীর্থের মত! এমনিতেই শহরটাকে গ্যাস্ট্রোনমিক প্যারাডাইজ বলা হয়, মুঘল সুলতানী হিন্দুয়ানী ইংরেজী নানা রকম কুইজিনের এরকম মশলাদার মিশেল অন্য কোথাও পাওয়া সম্ভব কি না জানি না। আর দুর্ভাগ্যক্রমে একবার পুরনো দিল্লীর অলিগলিয়ে গিয়ে পড়তে পারলেই হয়েছে, পেট বাচিয়ে ফেরত আসা খুবই ডিফিকাল্ট।

দিল্লী এসেই আমাদের সেন্টার হয় জামে মসজিদ। বেশ কটা বিকেল ওখানে স্রেফ বসে বসেই কাটিয়ে দিতাম আমরা, আর দক্ষিণ পাশের গেট দিয়ে বেরিয়ে গিয়ে খাওয়া দাওয়া করে আসতাম। খাবারের জায়গা বা দোকান খোজার কোন প্রয়োজন নেই, শুধু রাস্তা দিয়ে হাটলেই হবে। আশেপাশের দৃশ্যপটই আপনাকে টেনে নিয়ে যাবে তার জায়গায়।

Dekhiজামে মসজিদের দক্ষিণ পাশের মিনারের মাথায় দাঁড়িয়ে দেখা

মাঝে একবার আমরা খুজে খুজে গেলাম করিম’স এ। দিল্লীর সম্ভবত সবচেয়ে বিখ্যাত নন স্টার রেস্টোর‍্যান্ট। আব্দুল আজিজ নামে এক ভদ্রলোক ছিলেন মুঘল সম্রাটের বাবুর্চি, যিনি ১৮৫৭ সালে বাহাদুর শাহ জাফরের পতনের পর দিল্লী ছেড়ে চলে যান। ১৯১১ সালে যখন সম্রাট পঞ্চম জর্জ এর অভিষেক উপলক্ষে দিল্লীর দরবার বসে, তখন আব্দুল আজিজের ছেলে করিমুদ্দিন একটা ছোট্ট ধাবা দিয়ে ব্যবসা শুরু করেন, যা আজকের করিম’স রেস্টোর‍্যান্টে এসে দাঁড়িয়েছে। এই এক জায়গা, যেখানে সিট পেতে বাইরে বিশাল লাইন ধরে অপেক্ষা করতে হয়! অবশেষে আমরা ঢুকতে পারলাম, ভিড়ের মাঝে বসিয়ে দিয়ে অর্ডার নেয়া হলো। শাহী কাচ্চি, চিকেন জাহাঙ্গীরি আর শিক কাবাব। কেন যেন বাংলাদেশের বাইরে বিরিয়ানী আমার কখনোই ভালো লাগে না, শুকনো শুকনো বাসমতী চাল, আর স্বাদেও কিছুটা নোনতা ভাব বেশি। যাই হোক, খেয়ে দেয়ে তিনজনে ১৩০০ রুপি দিয়ে চলে আসলাম :p

Del 9করিম’স রেস্টোর‍্যান্ট, প্রবেশদ্বার

Del 10

করিম’স রেস্টোর‍্যান্ট, ইন্টেরিয়র

আমাদের সাথে তরুণ পান্ডে নামে পুরনো দিল্লীর লোকাল এক ছেলের পরিচয় হয়, সে বেসিকালী পাহাড়গঞ্জের এক মেডিক্যাল স্টোরে কাজ করে। খুবই মিশুক এবং ফ্রেন্ডলি একটা মানুষ। তার ভরসাতেই আমরা পা বাড়ালাম চাঁদনী চকের গোলকধাঁধায়। পুরনো ঢাকার সাথে বিন্দুমাত্র পার্থক্য নেই। এই গলি সেই চিপা পার হয়ে অবশেষে আমরা হাজির হলাম সরু একটা দোকানে, আমাদের পাড়ার পুরি-সিঙ্গারা ভাজার দোকান টাইপের একটা ব্যাপার। উপরে সাইন বোর্ডও আছে, – Kale Baba Kabab Wale ‘কালে বাবা কাবাব ওয়ালে’ (??!!) বসার সুযোগ নেই, টেক এওয়ে ফুড। এইটা নাকি অত্র এলাকার সবচেয়ে ফেমাস কাবাবের দোকান! স্টলটার সামনে লোকের ভিড় দেখে মনে হলো, কথাটা নেহায়েত মিথ্যে নাও হতে পারে।

Del 1

ফ্রম ঢাকা টু চাঁদনী চক – পথের শুরু এখানেই

Del 4

ইনিই সেই ”কালে বাবা কাবাব ওয়ালে” !

Del 2

কাবাবস ওয়েটিং ফর অ্যাকশন

Del 3

পেয়াজ এবং পাকা লেবু (?!) সহযোগে শালপাতায় দেয়া হলো শিক কাবাব। তবে বাংলাদেশী শিক কাবাবের কাছে কিছুই না।

এই ধাপ শেষ করে আমরা আসলাম আরও ভেতরে, এইবার একটা বড় রেস্টোর‍্যান্ট টাইপের ব্যাপার, মানে অন্তত চেয়ার টেবিলে বসে খাওয়া যাবে। ঢোকার মুখটা সরু, বিশাল হাড়ীপাতিল নিয়ে বসে আছে লোকজন। খাওয়া কিন্তু সিম্পলই, নেহারী আর পরোটা।

Del 5নেহারীর রকমফের, প্রিপারেশন এবং সবকিছু ! দেখতে যেমনই হোক, স্বাদ মনে থাকবে সারাজীবন

একবেলার জন্য বেশিই খাওয়া হয়ে গেলো, এরপর আমরা আরেকটু ঘুরে এক সিড়ির নিচে ঠান্ডাইয়ের দোকানের সন্ধান পেলাম, ঘটি সাইজের গ্লাসে বরফশীতল লাচ্ছি, কলার টেস্টও পাওয়া যাচ্ছে। বলা হলো, এইটা ‘দহি লস্যি’। আরে বেটা, লাচ্ছি তো দই দিয়েই হয়, আলাদাভাবে নাম দেয়ার কি দরকার?

যা হোক, আমাদের যুদ্ধের পালা সাঙ্গ হলো। আগামীকাল আমরা ফিরবো কলকাতায়, সেখান থেকে ঢাকা। তরুণ বিদায় নিয়ে গেল আমাদের কাছ থেকে।

Del 6চাট জাতীয় কোন একটা খাবার, নামটা মনে নাই :/

Del 7চিকেন রোস্ট – এ আকর্ষণ এড়ানো অসম্ভব !!

Del 12

ডেসার্ট হিসেবে থাকবে মিঠাই !

Del 13

শরবত, লাচ্ছি বা জুসের অপশন তো থেকেই যাচ্ছে

Del 15v

বামে তরুণ পান্ডে, আমাদের আচমকা সুহৃদ, ডানে লোকমান ভাই।

দিল্লী আসার আগে অনেক পড়াশোনা ঘাটাঘাটি করেছি, সব জায়গাতেই একই ওয়ার্নিং, খাবার দাবারের ব্যাপারে খুবই কেয়ারফুল থাকতে হবে। তা না হলে বিখ্যাত ‘Delhi Belly’ (?!) বা মধ্যপ্রাচ্যে নিম্নচাপ তৈরি হবার সম্ভাবনা প্রকট। ভোজন যুদ্ধে নামার আগে তরুণ নিজেও আমাদের সাবধান করে দিয়েছিলো এটা সম্পর্কে। আমি অবশ্য কনফিডেন্ট ছিলাম, চাষাড়ে বাঙ্গালের পেট, কি আর হবে !!!

আমরা ঘুরলাম, খেলাম, পরের দিন ট্রেনে ২০০০ কিঃমিঃ জার্নি করে কোলকাতা নামলাম, ঢাকায় চলে আসলাম আল্লাহর রহমতে কিছু হলো না। ফেরবার পথে তরুণ একটা টেক্সট করলো – Sorry Yaar, got loose motion and become very sick……….

আহারে বেচারা !!!

এই ট্রিপটা আমরা করেছিলাম ২০১২ সালের মাঝামাঝি নাগাদ। এরপর ২০১৩ সালে আবার গিয়ে একই ধারায় ভোজন যুদ্ধ চালিয়েছিলাম, যদিও তরুণকে আর খুজে পাইনি।

Advertisements