এই ব্লগটি শুধুমাত্র আগ্রহী আইন শিক্ষার্থীদের জন্য রিলেভেন্ট।

বাংলাদেশের আইন শিক্ষা ব্যবস্থায় ব্যবহারিক জ্ঞানের সুযোগ বলতে যা বোঝায়, তার কিছু ফ্লেভার সম্ভবত এই একটা মাধ্যমেই পাওয়া যায়। মুটের জগতে বলার মত তেমন কোন অ্যাচিভমেন্ট আমার নেই, তবুও নিজের দেখে আর ঠেকে শেখার গল্পগুলো বললে হয়তো অনেকেই কিছুটা উৎসাহ পেতে পারে, কারো মধ্যে কোন হতাশা থাকলে তা কাটিয়ে উঠতে পারে এবং নিজের সুপ্ত আগুনটাকে জ্বালিয়ে তুলতে পারে।

‘ওকে রেডী? এখনই কিন্তু শুরু হচ্ছে, আর তোমরাই ফার্স্ট।’

ছিপছিপে মানুষটা ঝড়ের বেগে আসলেন, কথাগুলো বলে আবার চলেও গেলেন। এদিকে আমরা স্রেফ বজ্রাহত হয়ে বসে রইলাম।

একপাশে দরজা, আরেকপাশে বেঞ্চ, যেখানে বসে আছেন আমাদের প্রথম ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’, শুনেছি তিনি নাকি জাঁদরেল মুটার। খোলা দরজা দিয়ে পালায়ে যাবো কি না ভাবতে ভাবতেই দেখি সদলবলে প্রবেশ করছেন স্মার্ট কিছু মানুষ। তারা নাকি জাজ। হঠাৎ পেয়াদার মত কে হাক দিয়ে উঠলো, দ্য প্রসিকিউশন মে প্রসীড উইথ দেয়ার সাবমিশন…………… খাও মুড়ী এবার !!!

মুট জিনিসটা কি ঠিকমতো জানতামও না, কখনও দেখার সুযোগও পাইনি, ভাবলাম অন্যদেরটা দেখে টেখে চালিয়ে দেয়ার চেষ্টা করবো, কিন্তু ভাগ্য সামনে ঠেলে দিলো আমাদেরকেই। দাঁড়ালাম, গলা দিয়ে স্বর আর বেরোয় না। জাজ বললেন, লাউডার প্লিজ ! হাতে একটা হিবিজিবি কাগজ ছিলো, ঘাড় গুঁজে স্রেফ রিডিং পড়া শুরু করলাম। জাজ আবার বললেন, ওনাদের দিকে তাকিয়ে বলতে। প্যানেলে দুর্দান্ত সুন্দরী একজন আপু বসা আছেন। বয়েজ স্কুল বয়েজ কলেজে পড়া এই আমার পোড়া কপালে মেয়েদের দিকে তাকিয়ে কথা বলা শেখা হয়নি। মাথা আরও খারাপ হয়ে গেল। তবে এটুকু জানা ছিলো, একজন স্পিকার গড়ে পাঁচ মিনিট সময় পায়।

পাঁচ মিনিটে আর কতটুকু অপমানই বা হবো :/

অতঃপর অগ্নিপরীক্ষা শেষ হইলো, এবং আমিও প্রতিজ্ঞা করিলাম – এই শেষ, আর না ! আর কখনও না !!

পাঁচ বছর আগের সেই দিনটা এখনও স্পষ্টভাবে মনে পড়ে, যেখানে মাবরুক ভাই ছিলেন আমার অপোনেন্ট (!!!), সায়েম ভাই আর তাসলিমা ম্যাডাম ছিলেন জাজ, আর রোকেয়া আপু সদাসতর্ক অভিভাবক হয়ে নজর রেখে চলছেন, সেখানে প্রথম বর্ষের সদ্য পাখা গজানো ছাত্র হয়ে ইন্টারন্যাশনাল হিউম্যানিট্যারিয়ান ল এর উপরে কথা বলার ধৃষ্টতা আমরা দেখিয়েছিলাম। মানে দেখাতে বাধ্য করা হয়েছিলো আর কি 😉

সম্ভবত ঐ বোকামীটুকু না করলে আজকে আমার জীবনটা হয়তো স্রেফ আলুনিই হয়ে থাকতো, আইন বিভাগের সবচেয়ে মশলাদার অংশটা চেনবার সুযোগ কখনও পেতাম না।

Young Mooters(২০১১ সাল, আইন বিভাগ ৩৭ ব্যাচের মুটার সম্প্রদায়)

২০১০ সালে আইন বিভাগে ভর্তি হবার প্রথম দিকের দিনগুলোর কথা। কারণ ছাড়াই এদিক সেদিক ঘুরি, রাস্তাঘাটে হালকা পাতলা ভাব (?!) নিয়ে চলার চেষ্টা করি…… ল ডিপার্টমেন্টের ছাত্র বলে কথা ! এইদিকে আবার ক্লাসের অবস্থা তথৈবচ, টিচারেরা কি কি বলেন কিছুই বুঝতে পারি না, কঠিন ইংরেজীতে লিখা বই পড়ে শান্তি পাই না। সিনিয়রদের দিকে দূর থেকে ভীরু ভীরু চোখে তাকাই, কত্ত জ্ঞানী মানুষ তারা !!! প্

রথম প্রথম স্পিরিট ছিলো দুর্দান্ত, ফার্স্ট বেঞ্চে বসার জন্য জায়গা নিয়ে হাতাহাতি পর্যন্ত হয়ে যেত :p আহা…… ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, শহীদ মিনার, আইন বিভাগ, এই স্যার সেই ম্যাডাম এই ভাই ঐ আপু আরও কত কি, যে দিকে তাকাই সেদিকেই চমক !!! কলেজ জীবনের কথা মনে পড়ে যেত মাঝে-মধ্যেই। নটরডেম কলেজের মোহময় প্রভাব এখনও মনকে আবিষ্ট করে রেখেছে, অথচ আইন বিভাগে মোহভঙ্গ হতে সময় লাগলো মাস খানেক। দিনে দিনে স্পিরিট কমতে লাগলো, আর ক্লাসে আমার বসার সিটও পেছাতে লাগলো। এক পর্যায়ে লাস্ট বেঞ্চে গিয়ে থিতু হলাম। এরপর থেকে বিগত পাঁচ বছর ধরে সেখানেই আছি :3 অবশ্য পেছনে বসে সবাইকে দেখা যেত, স্টাডি করা যেত। অদ্ভূত সব স্বপ্নবিলাসী মন আর অনেক সম্ভাবনাগুলো অঙ্কুরে নষ্ট হয়ে যেতে দেখেছি বারেবার।

এরই মধ্যে একদিন ক্লাসে কিছু মানুষ আসলেন, তাদের দেখে ডিপার্টমেন্টের আর দশটা ছাত্র-ছাত্রীর চেয়ে কিছুটা আলাদা মনে হলো। আমাদের একটা পত্রিকা দিলেন (নিউজলেটার)। আর বললেন একটা অদ্ভুত জিনিসের কথা, মুট। কি জিনিস কেমন জিনিস কিচ্ছু জানি না, সব নাকি জানানো হবে একটা ওয়ার্কশপে। তোমরা সবাই এসো কিন্তু, ঠিক আছে ? গেলাম, শুনলাম, জাদুমন্ত্রে মোহিত হয়ে বসে রইলাম; চমক লাগানো কিছু মানুষ আসলেন, তাদের কথা আর তাদের স্ট্রাগলগুলোও জানলাম। মুগ্ধতা যত বাড়ছে, ততই বুকের ভেতর দীর্ঘশ্বাস গাঢ় হচ্ছে। সব হাতিয়ার তো আর সবার হাতে বাগ মানে না, সবাইকে দিয়ে আর কি সব হয় ?

এরপরের ঘটনা অবশ্য আপনি অলরেডী জেনে গিয়েছেন। মাথায় কি ভূত চাপলো জানি না, হিউম্যানিটারিয়ান ল কি তাও কিচ্ছু জানি না, গুগল ঘেটেঘুটে মাথা নষ্ট করে দিনরাত পাগলের মত খেটে কিছু জিনিস দাঁড়া করালাম। এইদিকে মা ভীষণ খুশী, ছেলে পড়াশোনায় মনোযোগী হয়েছে এবার ! তিনি যখন জানলেন যে এইটা হলো তথাকথিত ‘এক্সট্রা কারিকুলার’ অর্থাৎ সিলেবাসের বাইরের জিনিস, তার দূঃখের আর সীমা রইলো না :p

তবে হ্যা, ঐ মুটিং এর ভূতটা যেমন আমার ঘাড়ে চেপেছিলো, আমাদের ব্যাচের আরও অনেকের ঘাড়েও চেপেছিলো, জুনিয়রদের ঘাড়েও চেপেছে, এবং অনাগত আরও অনেকেই এর শিকার হবে বলে আমি আশাবাদী। এই পাগলা ভূতের আক্রমণ যত শক্ত হবে, আখেরে দেশ ও জাতির ততই মঙ্গল !!! dumcsঐ প্রথম মুটিং ডিজাস্টারের বছরখানেক পরের কথা, আমরা তখন কিছুটা ম্যাচিওরড। ইতোমধ্যে দুই একটা ইন্টার ডিপার্টমেন্ট মুটও হয়ে গেছে, তার চেয়েও বড় কথা, জিনিসটা কি সেটা অন্তত আমি জানি। আমার গলার স্বর এমনিতেই খুব লো, তারপরও ডায়াসে কথা বললে এখন জাজ শুনতে পান (আর কেউ পান না যদিও); আর সিগনিফিক্যান্ট ডেভেলপমেন্ট হলো, আমি জাজের চোখে চোখ রেখে কথা বলতে শিখে গিয়েছি :p জাজেরা প্রশ্ন করেন, ইংরেজীতে দুর্বল থাকার কারণে তখনই প্যাচে পড়ে যাই। যে সময়টাতে আমি বেকুবের মত জাজের দিয়ে তাকিয়ে আছি, সেই সময়ে মাথায় উত্তরটা সাজানো হচ্ছে, সেটা ট্র্যান্সলেট করে গ্রামার ঠিক করে প্রোনান্সিয়েশন স্টাইল করে টরে উত্তর বলতে শুরু করলাম, দুই কথা বলার পর জাজ আবারও আটকে দিলেন। যাত্তোর……… আবার সেই প্রসেস শুরু। মান ইজ্জতের প্রশ্ন :/

এইবার শুরু করলাম উলটা কাজ। নিজের স্পিচের স্ট্রাকচার দাঁড়া করায়ে এইবার আমিই জাজ হই। প্রতিটা পদে পদে প্রশ্ন করার চেষ্টা করি, আর সম্ভাব্য সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর রেডী করার চেষ্টা করি। যদি বাই চান্স একটা দুইটা প্রশ্নও কমন পড়ে যায়, ছক্কা পিটিয়ে দেব। আর নেহায়েত কমন না পড়লে ‘ইয়ে…না… মানে… ইয়েস… স্যরি… আই ডোন্ট নো :/’ বলে চালিয়ে দেয়ার অপশন তো রয়েই যাচ্ছে।

তবে চালবাজী করে কি খুব বেশিদিন সাসটেইন করা যায়? একটা পর্যায়ে এসে (২০১১ – সেকেন্ড ইয়ারে সাংবিধানিক আইনের উপর মুট) মেধা ম্যাটার হয়ে দাঁড়ালোই। ততদিনে আমাদের মহাগুরু ইমরানও সগৌরবে মুট জগতে পা রাখলো, ওদিকে বন্ধু ফেরদৌস তার জ্ঞানের বহর নিয়ে জাজদের মুগ্ধ করে দিতে লাগলো! একটা বেঞ্চে জাজ খুব সিম্পল একটা প্রশ্ন করলেন, আমাদের দেশের মামলায় বিদেশী আদালতের দেয়া রায়গুলো কেন আমরা প্রিসিডেন্ট হিসেবে গ্রহণ করতে পারি? আমি বহু ভেবেও এর সমাধান বের করতে পারলাম না। ঐদিকে মহাজ্ঞানী ফেরদৌস ডিএলআর এর রেফারেন্স সহ জানিয়ে দিলো, লেজেহুমু এরশাদের কোন মামলায় এই ধরণের বিষয়ে আদালতের স্পষ্ট সিদ্ধান্ত দেয়া আছে। জাজ বিমুগ্ধ, আমিও বিমুগ্ধ, আর মাথার মধ্যে আবার সেই আওয়াজ, ‘অনেক তো হলো, এই বেলা ক্ষ্যান্ত দে বাবা, আর কত !!!’

হতাশা আর কনফিডেন্স, মুট এর জগতে এই দু’টো জিনিস স্রেফ পাতলা কাগজের মত দোলে, একবার এইপিঠ তো আরেকবার অন্ধকার পিঠ। ঠেকে শিক্ষা পেলাম, পড়াশোনা করিতে হইবেক, প্রচুর পড়াশোনা। আর রেফারেন্স ছাড়া একটি শব্দও উচ্চারণ না করা যাইবেক, তবেই মুটীং এ কনফিডেন্স পাইবেক !!!

তবে হ্যা, কনফিডেন্স পেতে যে শুধু পড়াশোনা লাগে, তা নয়। আরেকটা মৌলিক জিনিসের প্রকট অভাব ছিলো আমার, যার কারণ ভুগতে হয়েছে অনেকবারই…………… .

(আগামি পর্বে প্রথম আন্তর্জাতিক মুটিং এর গল্প)

Advertisements