১.

মাসখানেক আগের কথা। দেশের দক্ষিণতম প্রান্তে টেকনাফ শহরের ছোট্ট একটা ইউনিয়ন, নাম হ্নীলা। সম্প্রতি ইয়াবা এবং মানবপাচারের একটা হটস্পট হিসেবে বেশ ক’বার হেডলাইন হয়েছে। সেখানকার এক ছোটখাটো খাবার হোটেলে দুপুরবেলা ঢুকলাম। যথারীতি যেগুলো আইটেম থাকে তাই আছে, আমি অবশ্য সবজি টাইপ কিছু খুজতেসিলাম। ওয়েটার বললো, স্টাফদের জন্য ‘শুটকি তরকারি’ রান্না হচ্ছে, আমি চাইলে সেই জিনিস দিতে পারে।

এইটা আমার অনেকদিনের একটা আগ্রহ; এইধরণের শহরতলী বা গ্রাম্য হোটেলের বয় বাবুর্চিরা আসলে কি খায়? ঢাকায় কিংবা বিভিন্ন জেলা শহরে দেখেছি বয়-বাবুর্চিরা ভর্তা-ভাজি বা এইসব দিয়েই চালিয়ে নেয়। লঞ্চ-ফেরী কিংবা এই ধরণের অপেক্ষাকৃত গরীব এলাকায় তাদের খাবারের মান দেখবার সুযোগ খুব একটা পাই নি।

যা হোক, সেই ‘তরকারী’ আসলো। একটা বাটিতে লম্বা লম্বা করে আলু কাটা, কড়া লাল ঝোল আর এক কণা শুটকি, বহুকষ্টে তাতে শুটকি তরকারির ফ্লেভারটা আসছে। ২৪ ঘন্টা মানুষের সামনে মাছ-গরু-মুরগী তুলে ধরলেও মহাজন তার কর্মীদের জন্য আলুসেদ্ধর বাইরে আসতে পারেননি।

২.

বছরখানেক আগের কথা, এবার দেশের দক্ষিণ -পশ্চিমাঞ্চল। চিংড়ি ঘেরের সুবাদে সে অঞ্চলকে নাকি দেশের ‘কুয়েত’ বলা হয়। কাজ করছিলাম এক ব্রিটিশ ফুড সিকিউরিটি এক্সপার্টের সাথে রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে, মানুষের খাবার পুষ্টি দৈহিক বর্ধন এইসব নিয়েই তার গবেষণা। আমরা বিলাসী গবেষকদের দল গিয়েছি দেশোদ্ধার করতে, থাকি খুলনার তৎকালীন সবচেয়ে পশ হোটেল ক্যাসল সালামে, ইফতারে পাই কমপ্লিমেন্টারী প্ল্যাটার (তখনও রমযান মাসই ছিল) আর বিলাসবহুল গাড়িতে করে বাগেরহাট গিয়ে গিয়ে গরীব-দুঃখী মানুষের কথা শুনি।

যা হোক, আজন্ম শহরে থাকা এই আমার দারিদ্র্যের এইরকম প্রকট রূপ দেখার সুযোগ হয়নি আগে। চিংড়ি ঘেরে সোনা ফললেও তার আশেপাশে বাস করা ছিন্নমূল মানুষের জীবনে তার বিন্দুমাত্র আভাস নেই। এরা কি খেয়ে থাকে? ঘেরের ক্ষেতের পোকায় কাটা লেফট-ওভার সবজি, বন-বাদাড়ের কচু টাইপ জিনিস আর ক্ষুদ। এই খেয়ে দিনের পর দিন বেঁচে থাকছে আদম সন্তানেরা, এবং এরপরও তারা হাসে, চুল বাঁধে, লেখাপড়াও করে এবং জীবন নিয়ে স্বপ্ন দেখে।

৩.

ঢাকা শহরেই, সবচেয়ে অবহেলিত ‘শিক্ষিত’ জনগোষ্ঠীর নাম লিল্লাহ বোর্ডিং এ থাকা মাদ্রাসা ছাত্ররা। এদের খাদ্যাভ্যাস নিয়েও অনেক আগ্রহ ছিল, কারণ এর আগে ঢাকার বাইরে বিভিন্ন মাদ্রাসায় স্রেফ আলু দিয়ে ভাত খাওয়ার ঘটনা দেখেছি/ শুনেছি।আমি নিজে একটা হাফেজী মাদ্রাসায় মাস কয়েক আশা-যাওয়া করেছিলাম, তাদের জীবনযাত্রা জানার আগ্রহ সেটার অন্যতম একটা কারণ। আমার কাছে ঢাকার মধ্যে অন্যতম সেরা মাদ্রাসা মনে হয়েছে সেটিকে, অন্তত ছাত্রদেরকে খাওয়ানোর দিক থেকে। খরচও অবশ্য মাশাআল্লাহ খারাপ ছিলো না, শুধু মাত্র পয়সাওয়ালা বাবা-মা’ই সেখানে ছেলে পড়ানো অ্যাফোর্ড করতে পারবেন।

কোন একবার তপ্ত দুপুরে জোহরের পর মিরপুরের এক মাদ্রাসায় ছাত্রদের খাবারের দৃশ্য দেখবার সুযোগ হলো। ভাত, পাতলা ডাল আর ফুলকপির তরকারি। তরকারী মানে শুধু টুকরো করে কাটা ফুলকপি, আর কিছু না। আলু থেকে ফুলকপি…… উন্নয়ন নেহায়েত খারাপ না। মাদ্রাসার উস্তাদদের হিসাব অবশ্য আলাদা, তাদের খাবারও ছিল আলাদা, টিফিন ক্যারিয়ারে আনা।

সম্ভবত বেহেশতে বেশি খাবারের স্বপ্ন দেখিয়েই এই ছেলেগুলোকে ফুলকপির টুকরোতে আপাতত নিরস্ত রাখা গেছে।

Platter 1

৪.

বিভূতিভূষণের আরণ্যক যারা পড়েছেন, তারা জানেন কিভাবে দশ-বারো মাইল পাহাড়-জঙ্গল হেটে লোকজন বিনা দাওয়াতে চলে আসতো স্রেফ একটু ‘ভাত’ খেতে পাবার আশায়। সারা মাস চীনা ঘাসের দানা সিদ্ধ করে লবণ দিয়ে খায় তারা, সাথে একটু গুড় পেলে তাদের মহাভোজ হয়, একমুঠো সত্যিকারের ‘ভাত’ তো সেখানে আরাধ্য ! জিম করবেটও লিখেছিলেন, কিভাবে একটা ছোট প্রাণী শিকার করলে নৈনিতালের পাহাড়ী সেইসব গ্রামে উৎসবের রোল পড়ে যেত, কারণ তারা একটু মাংস খেতে পাবে ! তিনি লিখেছিলেন, ”মাসে একটিবার মাংস খেতে পেলেই এরা বর্তে যায় !”

আমি বাগেরহাটের যে জনপদের কথা লিখেছি, সেখানকার অতিদরিদ্র মানুষেরা কুরবাণী ছাড়া আর কখনো মাংস খাবার কথা চিন্তাও করতে পারে না। তাও ওখানকার ৬০% লোক কুরবাণী করার সামর্থ্য রাখে না। ফারদার কোন কথা জিজ্ঞেস করবার সাহস আর হয়নি।

ভাবতাম, আমাদের দেশে ক্ষুধা আর দারিদ্রের এইরকম প্রকট রূপ হয়তো এখন আর নাই, কৃষকের ফসল নাকি অতিফলনের কারণে মাঠেই নষ্ট হয়। উত্তরবঙ্গের অবস্থা সম্পর্কে স্টাডি করবার সুযোগ এখনো মিলেনি, তবে যতটুকু দেখেছি, নিজের খাওয়া বন্ধ হয়ে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট।

৫.

এতো ত্যানা প্যাচালাম শুধু একটু আত্নোপলদ্ধি থেকে। আমাদের শহুরে স্মার্টনেসের নবতর সংযোজন প্ল্যাটার কালচার। সেহরি হোক বা ইফতার, রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ীরা খুব ইন্টেরেস্টেংলি আমাদের পকেট হাতড়ে নিচ্ছেন, আমরা সান্ত্বনা খুজছি সেলফি আর ফুডপর্ণের মাধ্যমে। পয়সা যখন আছেই, তখন একটু খরচ করলে ক্ষতি কি ?

ক্ষতি নাই কোন অবশ্য; মান্থ অফ রামাদান, খাবারই তো মাস। আমি নিজেই তো খেয়ে কূল-কিনারা পাচ্ছি না। তবে দু-চারজন মানুষকে সাথে নিয়ে খাওয়া যায় কি না, সেটাও একটা বিবেচ্য বিষয়। শহরের কোন জায়গায় ৩০০-৫০০ টাকার নিচে ‘ইফতার প্ল্যাটার’ আমি দেখিনি। রামাদানকে সম্পূর্ণভাবে ইউটিলাইজ করতে চাওয়া কিছু মানুষের অনেকগুলো উদ্যোগেই দেখেছি, স্রেফ একদিনের মাঝার গোছের ইফতার প্ল্যাটারের খরচেই একজন রোজাদারকে পুরো মাস ইফতার করানো সম্ভব। আপনি নিজেই একটা ইনিশিয়েটিভ নিয়ে দেখেন না, কি দাঁড়ায় অবস্থা?

বিশ্বাস হচ্ছে না? ৫০ জন রোজাদারের ইফতারের হিসেবটা দেখুন। শুধু খেজুর, ছোলা-মুড়ির হিসাব। যাদের আপনি খাওয়াবেন তারা আপনার কাছে মাটন হালিম কিংবা চিকেন সাসলিক আশাও করে না, তবে আল্লাহ আপনাকে সুযোগ দিলে আপনি বটম লাইনে পড়ে থাকবেন, এটাও নিশ্চয়ই ঠিক না !!

এক মাসের খরচের হিসাব (৫০ জনের জন্য)

১৩ কেজি খেজুর (১৩x২০০) = ২৬০০টাকা, ৫০ কেজি ছোলা (৫০x৮০) = ৪০০০ টাকা, ৫০ কেজি মুড়ি (৫০x৬০) = ৩০০০ টাকা, অন্যান্য= ৪০০ টাকা

—————————————-
মোট = (২৬০০ + ৪০০০ + ৩০০০ + ৪০০) = ১০,০০০ টাকা

৫০ জনের মধ্যে এই ১০,০০০ টাকা ভাগ করে দিলে, পারহেড ২০০ টাকা করেই পড়ে।

সচেতনভাবে একটু চিন্তা করে হিসাব করলে দেখা যায়, একজন মানুষকে একবেলা খাওয়াতে কিংবা একটা মাসই ভালোভাবে খাওয়াতে খুব বেশি খরচ আসলে হয় না, হাতে যে গ্যাজেটটা আছে বা ঈদের জন্য যে শপিং করছেন, তার দশ ভাগের একভাগ হলেই হয়ে যাবে।

আসল কথা হচ্ছে, শুরু করাটাই জরুরী। বাকিটা আল্লাহ সহজ করে দিবেন !!

Madrasa

Advertisements