এই লিখাটি সর্বপ্রথম প্রকাশ হয়েছিল পাঠচক্র অনলাইন ম্যাগাজিনে………

উনবিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে ইউরোপের একদল সমাজবিজ্ঞানী ‘অপরাধ নৃবিজ্ঞান’ নামে এক নতুন ধারার গবেষণা শুরু করেন, যার মূল লক্ষ্য ছিল অপরাধী মানুষ ও জনসমষ্টির মনস্তাত্ত্বিক দিকগুলো অনুধাবন করা। খ্রিষ্টান মূল্যবোধের ওপর স্থাপিত ইউরোপীয় সমাজ মানুষের জৈবিক প্রয়োজন ও বৈশিষ্ট্যগুলোকে অগ্রাহ্য করে শুধুমাত্র নৈতিকতার বন্ধনে সমাজকে নিরাপদ করতে চেয়েছে, এই ছিল তাদের দৃষ্টিভঙ্গি। এই গবেষকদলের দিকপাল ইতালিয়ান অপরাধবিজ্ঞানী সিজার লমব্রসো ‘বর্ণ ক্রিমিন্যাল’ নামে একটি তত্ত্ব উপস্থাপন করেন, যেখানে কিছু মানুষকে তাদের শারীরিক, মানসিক এবং সামাজিক বৈশিষ্টের আলোকে জন্মগত অপরাধী হিসেবে অভিহিত করা হয়। পরবর্তীতে লমব্রসোর এই তত্ত্বের ব্যাপক সমালোচনা হলেও এই গবেষণাই সর্বপ্রথম অপরাধের গণ-মানসিকতা বা ‘ক্রাউড সাইকোলজী’ নিয়ে কাজ শুরু করে। এই তত্ত্বের একটা প্রধাণ দিক হলো, একজন সাধারণ মানুষও ভিড়ের মধ্যে পড়ে সেই মানসিকতা ধারণ করে কিভাবে অপরাধী হয়ে ওঠে তার কারণ ও প্রকৃতি নির্ণয় করা।

মাসখানেক আগে গা শিউরে ওঠা আঠাশ মিনিটের একটি ভিডিওচিত্র সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে যাবার পর বিভিন্ন মাধ্যমে সাধারণ মানুষ এবং বিশেষজ্ঞরা আমাদের মনুষ্যত্ব এবং অপরাধবোধের মাত্রা নিয়ে সীমাহীন উদ্বেগ প্রকাশ করতে শুরু করেন। রাজন নামের ছেলেটিকে একদল অপরাধী নৃশংসভাবে হত্যা করার বিষয়টি মন থেকে মুছে যেতে না যেতেই আরেকটি বীভৎসতার খবর আমাদের শুনতে হয়, যেখানে প্রেম এবং পারিবারিক কলহের জের ধরে এক যুবককে হাত-পা-চোখ তুলে হত্যা করে একদল লোক। এর ক’মাস আগে গত এপ্রিল মাসে পহেলা বৈশাখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে একদল দুষ্কৃতিকারী ব্যাপকহারে নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটায়। আর বিভিন্ন স্থানে গণধোলাইয়ে সন্দেহভাজন অপরাধী এমনকি সাধারণ মানুষ হত্যার খবর প্রতিনিয়ত আমাদের সামনে আসছে। মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’ এর পরিসংখ্যান অনুসারে গত ২০১৪ সালে বাংলাদেশে ১১৬ জন মানুষ গণপিটুনিতে নিহত হয়েছে, ২০১৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা ৪২। এমনকি এই লিখাটা যখন লিখছিলাম, ঠিক তখনও পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে এক বৃদ্ধাকে ডাইনী সাজিয়ে প্রকাশ্যে শিরচ্ছেদ করা হয়েছে।

ক্রাউড সাইকোলজী বা মব সাইকোলজীকে দুইটি অংশে ভাগ করা যায়; প্রথমটি হল –গণবিচার বা Mob Justice, আর দ্বিতীয়টি স্রেফ দলবদ্ধ অপরাধ বা সন্ত্রাস, বিভিন্ন মাত্রায় এটি দেখা গেলেও যার সবচেয়ে বড় অভিব্যাক্তি হচ্ছে দাঙ্গা। এই ক্রাউড সাইকোলজী বা মব সাইকোলজীর স্বরূপ অনুসন্ধান করতে গিয়ে দেখা যায়, আইনের শাসনের অভাব কিংবা বিচার ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থাই এই ধরণের কাজের মূল চালিকাশক্তি। এর সঙ্গে যখন অপরাধ করে পার পাবার প্রবণতা যুক্ত হয়ে যায়, তখন সেটা সম্পূর্ণ এক ভিন্ন মাত্রায় রূপ নেয়।

Lynch

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সেটা কঠোরভাবে দমন করবার মাধ্যমে আমরা বিচারবিহীন হত্যাকান্ড এবং সহিংসতার বীভৎস এক নতুন অধ্যায়ের সাক্ষী হয়েছি। এর পাশাপাশি, সাধারণ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিতে দেশের যে কোন বিচার প্রক্রিয়াই আকণ্ঠ দুর্নীতিতে নিমজ্জিত, তাই আইনের ওপর ভরসা রাখবার কোন শক্ত কারণ তারা খুঁজে পেতে চায় না। যার ফলশ্রুতিতে কোন অপরাধী বা সন্দেহভাজনকে হাতেনাতে ধরতে পারলে আইনে সোপর্দ না করে বরং নিজেদের হাতে শাস্তি দিতেই তারা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে বেশি। সিলেটের রাজন হত্যা মামলাতেই প্রায় ছয় লক্ষ টাকা লেনদেনের উড়ো গল্প ছড়িয়ে পড়ছে সবখানে; সত্য হোক বা মিথ্যা হোক, সাধারণ মানুষ এগুলো বিশ্বাস করে, এইরকম ঘটনাকে তাদের নিয়তি মনে করে থেমে যায়। এই ক্রমাগত অবিচার এবং নিপীড়নের শিকার হওয়া মানুষের মনের ফুঁসতে থাকা বিষবাষ্প যখনই কোন সুযোগ পায়, তখনই তার ‘ঝাল’ মিটিয়ে নেয় রাস্তায় কোন ছিঁচকে পকেটমার কিংবা জুতা চোরের ওপর। নির্বিকারচিত্তে নৃশংসতার এই কারণে মব জাস্টিসকে অনেক সময়ে জাঙ্গল জাস্টিসও বলা হয়; যদিও বিশ্ববিখ্যাত শিকারী জিম করবেট বলতেন, ‘বনের পশুরাও একটা নির্দিষ্ট আইন মেনে চলে, প্রয়োজন ছাড়া কেউ কাউকে হত্যা করে না যেটা মানুষ করে থাকে।’

তবে সবচেয়ে ভয়াবহ যে বিষয় সেটি হচ্ছে অপরাধ করেও পার পেয়ে যাওয়ার মত দুঃসাহস এবং প্রশ্রয়, যার ফলে সংঘটিত হচ্ছে একের পর এক ঘৃণ্য দলগত অপরাধ। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই আশ্রয়-প্রশ্রয় আসে রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম থেকে, তবে অনেক ক্ষেত্রে স্রেফ প্রশাসনিক দুর্নীতির ফলেও অপরাধীরা সটকে পড়বার সুযোগ পায়। আমরা ২০০৬ সালের আঠাশে অক্টোবরে পল্টনে হত্যাকান্ড, ২০১০ সালে রাজশাহীতে বিএনপিপন্থী উপজেলা চেয়ারম্যান সানাউল্লাহ বাবুর হত্যাকান্ড. ২০১১ সালে ফটিকছড়ির ভূজপুরে আওয়ামী লীগ কর্মীদের ওপর নৃশংস হামলার বীভৎস ভিডিও প্রত্যক্ষ করেছি। কিন্তু আসামীদের কোন ধরণের বিচার হয়নি, বরং অনেক ক্ষেত্রেই তাদের সামাজিক-রাজনৈতিক ভাবে পুরস্কৃত করা হয়েছে। সাময়িক রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি আমাদের আইনি-সামাজিক পরিবেশকে পঙ্গু করে দিচ্ছে। একই ধরণের ঘটনা আমরা দেখেছি এই বছর পহেলা বৈশাখের যৌন নির্যাতনের ঘটনায়, এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আরও অনেক জায়গায়। সামগ্রিকভাবে এই ঘটনাগুলো দেশের মানুষের মধ্যে প্রচলিত আইন-শৃঙ্খলা ও বিচারব্যবস্থার ওপর আস্থা হারানোর জন্য প্রধাণ উপকরণ হিসেবে কাজ করে, ক্ষেত্রবিশেষে মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড় করিয়ে দেয়। দেশের বিভিন্ন স্থানে আসামী ধরতে যাওয়া পুলিশের বিপক্ষে গ্রামবাসীর সম্মিলিত প্রতিরোধ এবং সহিংসতার অনেক চিত্র গত কয়েক বছরে সংঘটিত হয়েছে।

একইভাবে, প্রশাসনিক পর্যায়েও ‘মব জাস্টিসের’ কাছে নতজানু হবার অবিশ্বাস্য উদাহরণটি আমরা প্রত্যক্ষ করি ২০১৩ সালে, যখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবীতে ঢাকার শাহবাগে সমবেত হওয়া একদল মানুষের দাবীর মুখে আইন পরিবর্তন করে ভূতাপেক্ষভাবে (Retrospective Effect) যাবজ্জীবন কারাদন্ড পাওয়া একজন আসামীকে ফাঁসি দেওয়া হয়। এই ধরণের উদাহরণ বিশ্বের আর কোথাও এখনও দেখা যায়নি।

আমাদের সমাজের ঘুণে ধরা কাঠামোর রন্ধ্রে রন্ধ্রে এই ধরণের গণঅপরাধ এবং ‘গণ’বিচার বা মব জাস্টিসের মানসিকতা বেঁড়ে উঠছে খুব চুপিসারে; বিভিন্ন সময়ে এর কুৎসিত বহিঃপ্রকাশ হতবাক করে দেয় আমাদেরকে। যত সময়ে যেতে থাকবে, এই রোগ ক্যান্সারের মত বাড়তেই থাকবে এবং এক পর্যায়ে তা আফ্রিক্যান দেশগুলোর মত সর্বগ্রাসী রূপ নিয়ে আমাদের আক্রমণ করবে, যার প্রতিরোধের ক্ষমতা আমাদের কারো থাকবে না। অবধারিতভাবেই ভেঙ্গে পড়বে সমাজ কাঠামো এবং দেশ পরিণত হবে একটি অক্ষম রাষ্ট্রে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি, রাজনৈতিক প্রশ্রয় এবং সীমাহীন দুর্নীতি আফ্রিকা মহাদেশের ঘানা, ক্যামেরুন, উগান্ডা সহ আরও অনেক দেশেই বড় আকারের দলবদ্ধ অপরাধ ও তার প্রতিক্রিয়ায় মব জাস্টিসের নৃশংসতাগুলোকে নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত করেছে, যার ফলে দেশগুলো আবর্তিত হচ্ছে অন্ধকার থেকে অন্ধকারে। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতেও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমরা এর বহিঃপ্রকাশ দেখে আসছি।

পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের নাগাল্যান্ড রাজ্যের ডিমাপুরে মাসকয়েক আগে কারাগার ভেঙ্গে মিথ্যা অভিযোগে এক যুবককে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনা আমাদের স্মরণ থাকবার কথা। ধর্ষণের মিথ্যা অভিযোগে আটক ও বিচারাধীন মুসলমান যুবকটিকে মূলত হত্যা করা হয় জাতিগত সহিংসতার জের ধরে।

Rajonবিখ্যাত লেখক হারপার লি তার মাস্টারপিস ‘টু কিল এ মকিংবার্ড’ উপন্যাসটিতে ঠিক এই ধরণের একটি চিত্রকল্প এঁকেছিলেন পঞ্চাশের দশকে, যা পরবর্তীতে একই নামের চলচ্চিত্রে অনবদ্যভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল। ধর্ষণের অভিযোগে বিচারাধীন কারাবন্দী এক কৃষ্ণাঙ্গ যুবক টিম রবিনসনকে নিজেদের হাতে শাস্তি দিতে কারাগারে হামলা চালাতে যায় এলাকাবাসীরা, যারা প্রত্যেকেই ছিল শ্বেতাঙ্গ। বিচার ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা থেকে নয়, বরং নিজেদের প্রতিহিংসার তীব্র আগুনকে প্রশমিত করতেই এই ‘মব’ বা গণমানুষ আইন তাদের নিজের হাতে তুলে নিতে চেয়েছিল।

তবে এই দলেরই একজন ব্যক্তি ওয়াল্টার ক্যানিংহাম, তিনি তার বিবেকের তাড়নায় উঠে দাড়ান এবং বলেন, আমরা মানুষ এবং যাকে হত্যা করতে এসেছি, সেও একজন মানুষ। সুতরাং আমি আর তোমাদের এই ‘Gang of Wild Animals’ এর অংশ থাকতে পারছি না। এবং চেতনা ফিরে আসে প্রতিটি মানুষের মধ্যেই; তারাও প্রত্যেকে ফিরে যায় তাদের নিজের ঘরে।

ক্ষুদ্র রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করে দেওয়া, ব্যক্তিগত পর্যায়ে দুর্নীতি বা স্রেফ পারিবারিক ঝগড়াবিবাদের জের কিংবা যৌন লালসা বা অন্যান্য অপরাধের মনোবৃত্তি লালন করার মাধ্যমে আমরা দেশের আইন-শৃঙ্খলা এবং বিচারব্যবস্থাকে শেষ করে দেয়া পাগল এক জনগোষ্ঠীর সদস্য হয়ে গিয়েছি। সিজার লমব্রসোর ভাষায় আমরা জন্মগত অপরাধী যদি নাও হয়ে থাকি, অস্থির এই সময় এবং নিষ্পেষিত এই সমাজ কি আমাদেরকে এক হিংস্র জনগোষ্ঠী হিসেবে তৈরি করছে? সোশ্যাল মিডিয়ার বদৌলতে খুব ছোট ছোট বিষয়গুলোও আজকে আমাদের চোখে উঠে আসছে, ভারতের সেলিব্রেটি ক্রিকেটদর্শক সুধীর গৌতমের ওপর হামলার অভিযোগ বা মাদকের টাকার জন্য দলবদ্ধ অপরাধ বা অন্য কোন নৃশংসতার খবর; প্রতিবারেই আমরা লজ্জা পাচ্ছি, অভিশাপ দিচ্ছি, ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছি, কিন্তু অপরাধগুলো থামছে কি?

কৃষ্ণাঙ্গ যুবক রবিনসন অনেক সৌভাগ্যবান ছিল, কারণ হামলাকারী শ্বেতাঙ্গরা তাদের বিবেকের কথা শুনতে পেয়েছিল। সামাজিক, রাষ্ট্রীয়, পারিবারিক এবং ব্যক্তিগত পর্যায়ে আমাদের চেতনা ফিরবে কার কথায় ?

কত দেরী হবে তার ?

Advertisements