বিশ্বব্যাপী LGBT আন্দোলনঃ আইনি-সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের অবস্থান

মার্কিন সুপ্রীম কোর্টে সমকামি বিয়ের মামলার রায় আসার পর থেকে বিশ্বব্যাপী LGBT আন্দোলনের মানুষজনের মধ্যে যেন বাঁধভাঙ্গা জোয়ার নেমেছে। সাংবিধানিক সমানাধিকার এবং বৈষম্যহীনতা (Equality & Non-Discrimination) এর ধূসর একটি জায়গায় দাঁড়িয়ে এই অধিকারের পক্ষে কথা বলাটাই এখন ট্রেন্ড, না বললে আপনি বর্বর, হোমোফোবিক এবং ভদ্রসমাজে অচ্ছুৎ।

অবশ্য এই রায় যে সবাই মেনে নিয়েছে বিষয়টা এমন নয়; মার্কিন আদালতে রায় এসেছে ৫-৪ ব্যবধানে। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, ৯ জন ‘অনির্বাচিত‘ ব্যক্তি এই ধরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং স্পর্শকাতর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবার এখতিয়ার রাখে কি না ? এর ঠিক ক’দিন পরেই মার্কিন ম্যারিজ রেজিস্ট্রার কিম ডেভিসের সমকামি বিয়ে রেজিস্ট্রেশনে অস্বীকৃতি জানাবার ঘটনা এবং সেই পরিপ্রেক্ষিতে তার বিরুদ্ধে আনীত আইনী কার্যক্রমও সারা বিশ্ব দেখেছে। মামলার রায় কিম ডেভিসের বিপক্ষে গেলেও (আইনি প্রক্রিয়া এখনও চলমান) মার্কিন সমাজের ধর্মভীরু এবং রক্ষণশীল অংশ তাকে মাথায় তুলে রেখেছে। পোপ ফ্রান্সিসের সাথে কিম ডেভিসের সাক্ষাৎ (সেটা অনুপ্রেরণা নাকি ঝাড়ি ছিল এই নিয়েও বিতর্ক আছে) এবং বিশ্বব্যাপী আলোচনা-সমালোচনার ঝড় মোটাদাগে আমাদের সামাজিক-ধর্মীয় বিশ্বাসের সাথে ব্যক্তিস্বাধীনতার পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গির বিভাজনটিকেই স্পষ্ট করে তোলে।

পশ্চিম আর পূবের আদর্শগত বা সামাজিক-ধর্মীয় দৃষ্টিকোণে বড় পার্থক্য থাকলেও সমকামিতা বিষয়ে ব্যবধানটা ক্রমশই যেন কমে আসছে। তবে মুসলিমপ্রধাণ দেশগুলো সবাই এবং শ্রীলংকা, ভারত, মায়ানমারসহ আরও কিছু দেশ এর বিরুদ্ধে এখনও শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছে। যদিও রাষ্ট্রীয় ভাবে চীনে ১৯৯৭ সাল থেকে সমকামিতা বৈধ, তবে ২০১৩ সালের Pew Research Center এর এক জরিপে দেখা গেছে, চীনের ৫৭% মানুষ সমকামিতার সামাজিক স্বীকৃতির বিপক্ষে। আরও মজার ব্যাপার হল, আইনগত বৈধতা এবং ধর্মহীন রাষ্ট্র হবার পরেও রাশিয়ার ৭৪% মানুষ সমকামিতার বিপক্ষে মত দিয়েছেন।

এইদিক দিয়ে আমাদের প্রতিবেশী ভারতের অবস্থান বেশ ইন্টরেস্টিং। ভারতীয় দন্ডবিধির ৩৭৭ ধারায় প্রকৃতির নিয়ম বিরুদ্ধ যৌনাচরণকে (স্বাভাবিক যৌনাচরণের বাইরে যে কোন কিছু) অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়ে থাকে। ১৮৬০ সালের ব্রিটিশ ভারতে জারি হওয়া সেই একই আইন বাংলাদেশেও রয়েছে, এবং সমকামী আন্দোলনের কর্মীরা এই আইনের প্রবিধানগুলোকে ‘ঔপনিবেশিক’ ‘অমানবিক’ ইত্যাদি অভিধায় আখ্যা দিয়ে যাচ্ছেন। উপমহাদেশের আইন জগতে আলোড়ন তোলা ২০০৯ সালের সেই নাজ ফাউন্ডেশনের মামলায় ভারতীয় আদালত সমকামিতাকে এক প্রকার আইনী ‘নৈতিক’ বৈধতাই দিয়ে দিয়েছে বলা চলে। ভারতীয় আদালত স্বীকার করে নিয়েছে যে, ৩৭৭ ধারায় Criminalizing Homosexuality সংবিধানের সমানাধিকার ও বৈষম্যহীনতা নীতির সাথে সাংঘরষিক। তবে আদালত আইন সংশোধন/ বাতিলের কাজটা পার্লামেন্ট তথা রাজনীতিবিদদের হাতে ছেড়ে দিয়েছে। (এইখানে টেকনিক্যালি ভারতের আদালত মার্কিন আদালতের চেয়ে বেশি দূরদৃষ্টির পরিচয় দিয়েছে বলেই আমার বিশ্বাস।)

এখন, মানুষের একান্ত ব্যক্তিগত বিষয় যখন সারা পৃথিবীতেই আইন-আদালতের মাধ্যমে নির্ধারিত হচ্ছে; বাংলাদেশের কি অবস্থা ?

আইনী দিক দিয়ে চিন্তা করলে বাংলাদেশ দন্ডবিধির ৩৭৭ ধারা ভারতের মতই অস্বাভাবিক যৌনাচরণকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করে। আর আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় এখনো পর্যন্ত এটিকে চূড়ান্ত ঘৃণ্য বিষয় বলেই গণ্য করা হয়, তবে মানতেই হবে প্রাচীন কাল থেকেই এই প্র্যাকটিস নানাভাবে দেশে প্রচলিত ছিল। বিশেষত কঠোর সামাজিক কাঠামোর রক্ষণশীল দেশ হবার কারণে সুযোগের অভাবেই হোক কিংবা অবদমিত যৌনতাই হোক, ছাত্রাবাস বা মাদ্রাসায় বা অন্যান্য বিভিন্ন জায়গায় গোপনে সমকামিতা প্রচলিত ছিল। (এইটা ছিল মূলত শিশু নির্যাতনের ফর্মে, যেটা আমাদের পপ-কালচারে ঘেটুপুত্র কমলা’র মাধ্যমে উঠিয়ে এনেছিলেন হুমায়ূন আহমেদ)।

যা হোক, বাংলাদেশে LGBT মুভমেন্টের একটা বড়সড় অ্যাচিভমেন্ট হলো ক’দিন আগে, গত ৬ই সেপ্টেম্বর। বয়েজ অফ বাংলাদেশ নামক ফেসবুক গ্রুপ যা বাংলাদেশে এলজিবিটি আন্দোলনের দৃশ্যমান একটি গ্রুপ, তারা সমকামিতা নিয়ে প্রথম একটা কমিক স্ট্রিপ বের করেছেন, যার নাম দেয়া হয়েছে ‘ধী’। ব্রিটিশ কাউন্সিলে একটা লিমিটেড অডিয়েন্স প্রকাশনা উৎসবের মাধ্যমে এই কমিকসটি বের করা হলো। বিশ্বের প্রভাবশালী নিউজ মিডিয়ায় খবরও এসেছে। প্রাপ্তিস্থান? সমকামী আন্দোলনের বিভিন্ন প্রোগ্রামে। বইয়ের দোকানে কিনতে পাওয়ার আশা কইরেন না কেউ এখনি, তবে এইটা ওপেন মার্কেটে বের হলে হটকেকের মত বিক্রি হবে নিশ্চিত।

কারণ কি জানেন ?

কারণ কমিকের বিষয়বস্তু ‘নারী সমকামী’ যাদের লেসবিয়ান বললেই আমরা ভালো চিনতে পারি। পুরুষ সমকামিতা আমরা যতটা ঘৃণ্য বা অচিন্তনীয় বিষয় হিসেবে গ্রহণ করি, লেসবিয়ান শুনলে কামাতুর বাঙ্গাল পুরুষ সমাজের মনের গহীনে লালসা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। আমার কাছে ইন্টরেস্টিং যেটা মনে হচ্ছে, আমাদের সমাজে আপাত গ্রহণোযোগ্যতা পাওয়ার জন্যে তেনারা এই রাস্তাটাই বেছে নিয়েছেন। আপনার কাছে লজিকটা হাস্যকর লাগতে পারে, কিন্তু জেনে অবাক হবেন যে, সাবেক সোভিয়েত উপনিবেশ উজবেকিস্তান এবং তুর্কমেনিস্তানের আইনে পুরুষ সমকামিতা নিষিদ্ধ, নারী সমকামিতা নয়; এই বিধান রাশিয়াতেও ছিল, এবং ২০০৭ সাল থেকে সিঙ্গাপুরে নারী সমকামিতাকে বৈধতা দেওয়া হয়েছে, যদিও এখানে পুরুষ সমকামিতা এখনও নিষিদ্ধ। (এই বিষয়ে বিস্তারিত গবেষণা আছে এখানে)

যা হোক, গত বছরই রূপবান ম্যাগাজিন নামে একটি প্রকাশনা বের হয়েছে। কবে যেন পড়েছিলাম, লেসবিয়ান ভালোবাসার বিষয়বস্তু নিয়ে একটা টেলিফিল্ম তৈরি হবার কথা। আজকে আসলো কার্টুন। আগামী বইমেলায় বই-টই বেরিয়ে গেলেও অবাক হবার কিছু থাকবে না। বিদেশী অ্যাকটিভিস্টীরা যেমন হোমোফোবিয়া নামের একটা শব্দ আবিস্কার করে সমকামী বিরোধীদের লেবেল করছেন, আমাদের বাঙ্গাল অ্যাকটিভিস্টরাও দেখছি ভাষাগত যুদ্ধ শুরু করেছেন – সমকামিতা এবং বিষমকামিতা (?!), যেন প্রথমটাই স্বাভাবিক, পরেরটাই ডেভিয়েশন !

ডিসেনসিটাইজেশন প্রসেস চলমান থাকুক, সবই আমাদের গা সহা হয়ে যাবে। ভালোবাসা বলে কথা !!

Rupbagঢাকার শাহবাগে নববর্ষে গে প্রাইড প্যারেড (সমকামীদের মিছিল)

এখন কথা হচ্ছে, উদার ‘মানবিকতা’র এই যুগে আমাদের দেশের রক্ষণশীল সমাজ এই আন্দোলনকে, মোটাদাগে সামগ্রিক এই ধ্বংস আন্দোলন (ইনক্লুডিং মুক্ত অবাধ স্বাধীনতা থেকে শুরু করে লিভ টুগেদার পর্যন্ত) মোকাবেলা করবার কথা ভাবছেন কিছু? এককথায় ‘হারাম… ধ্বংস হয়ে যাক……’ বলে তো খুব একটা লাভ হল না এখনো। অবশ্য গ্লোবাল ডাইমেনশনে এখন ফ্রি নিপল মুভমেন্ট চলছে, প্রস্টিটিউশন লিগালাইজ করার আন্দোলন চলছে, পর্ণ কে মেইনস্ট্রিমিং করবার কাজও চলছে। সেই তুলনায় আমাদের মুক্তমনারা বেশ পিছিয়েই আছেন।

তৃতীয় বিশ্বের নির্যাতিত অশিক্ষিত নাগরিক হবার এই এক সুবিধা।

অবশ্য তেল-গ্যাস-বিদ্যুতের দামে ত্রাহী ত্রাহী অবস্থা, আমাদের ছেলে মেয়ে গোল্লায় যাক তাতে কি বা এসে যায়। মাঠপর্যায়ের ‘মধ্যযুগীয়’ মানবাধিকার কর্মী হিসেবে আমরা ইনফরমেশনটুকু তুলে দিলাম, স্ট্র্যাটেজি পলিসি কর্মপরিকল্পনা বুদ্ধিজীবিরা গ্রহণ করুন।

আমরা বরং মাঠেই ফিরে যাই। রণহুংকারে সানি লিওনিকে ঠেকিয়ে দিয়েছি, ওলামা লীগের কোন এক সময়ে ঘোষিত কর্মসূচী মোতাবেক আন্দোলন করে পাওলি দামের (এইটা কে ?) আগমনও ঠেকাবো। এই দেশ, লাখো সুফী-সাধকের এই পবিত্রভূমিতে এদের আগমন যেকোন মূল্যে ঠেকাতে হবে।

তবে সুফী সাধকের দেশের মধ্যেই এইরকম কেউ তৈরি হয়ে গেলে কি করবো সেইটা অবশ্য জানি না…………

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

w

Connecting to %s