(এই লিখাটা ফেসবুকের Travelers of Bangladesh গ্রুপে ‘ভ্রমণে বিপদ’ নিয়ে স্মৃতি আলোচনার অংশ হিসেবে লিখা, অনেকটা ডিজাস্টার ট্র্যাভেলগ বলা যাইতে পারে)

ক’দিন আগে নেত্রকোণার সুসং-দুর্গাপুরের রানীক্ষং ক্রিশ্চিয়ান মিশনে গিয়ে আমরা ভালো বিপদে পড়েছিলাম। দলের একজন ফটো বা সেলফি তোলবার সময় টান দিয়ে বসলো গির্জার ঘন্টায়, আর যায় কোথায় ?

আশপাশ থেকে একেবারে লাঠিসোঁটা হকিস্টিক নিয়ে মুহূর্তের মধ্যে শ’খানেক মানুষ হাজির। ঘটনার আকস্মিকতায় আমরা বিমূঢ়…… ক্যাম্নে কি ! ওদিকে পাশ থেকে নিরীহদর্শন এক দিদিও সমানে গালাগাল দিয়ে যাচ্ছেন। অপরাধবোধ আর লজ্জায় মাথা প্রায় আলাদা। কে যেন আবার গেটও আটকে দিল। এইদিকে আমরা আবার লোক ছিলাম জনাচল্লিশেক, মাথাগরম কেউ কেউ আবার ঢাকা ভার্সিটির স্বভাবসুলভ ‘হলে ফোন দে’ টাইপ গা গরম করা কথা বার্তা বলতেও শুরু করেছেন। যা হোক, সিনিয়রেরা ক্ষমা-টমা চেয়ে কোনভাবে পার পেয়ে বেরিয়ে আসলাম।

Ranikhong১৯১২ সালে প্রতিষ্ঠিত এই সাধু যোসেফের ধর্মপল্লী রানীক্ষং গ্রামের তথা পুরো নেত্রকোণারই অনেক পুরনো এবং বিখ্যাত একটি জায়গা। যা হোক,ধর্মীয় স্থানগুলোতে শ্রদ্ধাবোধের নতুন লেসন হল। অনেক জায়গায় এগুলো আমরা ভুলে যাই, অনেক ক্ষেত্রেই উপাসনাস্থলগুলোকে ট্যুরিস্ট স্পট হিসেবেই আমরা ট্রিট করতে পছন্দ করি।

অসচেতনতা (কিংবা সেলফি খিঁচার মানসিকতা) কোন পর্যায়ের বিপদ ডেকে আনতে পারে সেটার একট প্রিভিউ নিয়ে এবার ফিরলাম।

বছরখানেক আগে অনেকটা এইরকম আরেকটা ঝামেলায় পড়েছিলাম। খাগড়াছড়ি শহরে ঢোকার আগে হর্টিকালচার পার্ক একটা জায়গা আছে, কৃত্রিম জিনিস, ভিতরে রাঙ্গামাটির ঝুলন্ত ব্রিজের স্টাইলে একটা ব্রিজ। সেই ব্রিজেই ঘটলো বিপত্তি। বাঙ্গালী এক ছেলে এক পাহাড়ী ছেলেকে ধরে বসলো, অভিযোগঃ তারা নাকি কিছু মেয়ে ব্রিজ পার হবার সময় টিজ করছিল। ঝগড়া গড়ালো হাতাহাতিতে, আর যায় কোথায় !

পাহাড় টিলা পার্ক ব্রিজের কোনাকাঞ্চি থেকে গোটা পঞ্চাশেক পাহাড়ী ছেলে লাঠিসোঁটা হকিস্টিক নিয়ে চলে আসলো। আমাদের সাথে স্থানীয় যে ভাই ছিলেন, তিনি বুঝদার লোক – কোনভাবে ঐ বাঙ্গালী ছেলেটাকে বাঁচিয়ে পার করে দিলেন, মারধোরের মাঝে পড়ে তার জামায় আহত ছেলেটার কিছুটা রক্তও লেগে গেল।

KCএই সেই ব্রিজ !!!

আমরা ফিরতে যাচ্ছি, এইবার দেখলাম ভিন্ন অ্যাকশন। ত্রিশ চল্লিশ জন বাঙ্গালী ছেলে একইভাবে লাঠিসোঁটা নিয়ে দৌড়ে যাচ্ছে ‘প্রতিশোধ’ নিতে। খাগড়াছড়ি এমনিতেই গরম জায়গা, এইধরণের জিনিস দেখলে একেবারেই ভালো লাগে না। পুলিশের গাড়ি দেখে কিছুটা স্বস্তি আসলো।

পিকচার তখনো বাকি ছিল। পুলিশপ্রবরেরা আমাদেরকে বাইক থেকে নামিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করতে লাগলো, ভাবটা এমন যে আমরাই সব মারামারি করে এসেছি। হঠাত মনে পড়লো, ভাইয়ের টি-শার্টে রক্তে ভেজা। যাইহোক, আধাঘন্টা জিজ্ঞাসাবাদ খোজখবর ‘বড়স্যারের সাথে দেখা করে ব্যাখ্যা দেওয়া’ সব কিছু শেষে বেরিয়ে আসলাম সন্ধ্যানাগাদ। আমি বেকুবের মত বসে বসে আরো দু’জন পুলিশের সাথে আমাদের বাইক পাহারা দিচ্ছিলাম। কেন যেন বারবার পাহাড়ের ওপর দেখা খাগড়াছড়ি কারাগারের কথা মনে পড়ছিল :/

ঐদিন দুপুর বেলাতেই পাঙ্খাইয়া পাড়ার সিস্টেম রেস্ট্যুরেন্টে খাবার সময় কিঞ্চিৎ ভাব করেছিলাম এক মারমা ওয়েটারের সাথে (ছেলেটার নাম ভুলে গেছি)। বিল দিয়ে ওঠার সময় সে হঠাত করেই ট্রে’তে কাচা আমের ঠান্ডা শরবত এনে হাজির করলো।

‘এতা আমার থেকে গিফত, তাকা লাগবে না’ !

মনের ভেতর জমে থাকা ঘৃণার ঝাঁজের চেয়ে কাচা আমের শরবতের ঝালটাই সারা জীবন মনে গেথে থাকবে…………

Advertisements