হাজ্জের ইতিহাসে সবচেয়ে মর্মান্তিক বছর ২০১৫…… প্রথমত ক্রেন দুর্ঘটনায় ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনার পর মিনায় জামরাতে (শয়তানকে পাথর মারার স্তম্ভ) ভয়াবহ দুর্ঘটনায় প্রায় সহস্রাধিক হাজি ইন্তেকাল করেছেন। ১৯৯০ সালে মিনার সুড়ঙ্গে ভয়াবহ দুর্ঘটনার পর এটিই হাজ্জের সবচেয়ে গুরুতর দুর্ঘটনা। তবে ঘটনার পর সাম্প্রতিক বিশ্বপরিস্থিতির আলোকে যে রাজনৈতিক কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি চলছে, সেটার কোন তুলনা হয় ন!

Hajj 2সারা বিশ্বের অনেকেই, বিশেষ করে ইরান ও ইরানপন্থী ব্লকগুলো হাজ্জকেন্দ্রিক দুর্ঘটনা নিয়ে সৌদি রাজপরিবার তথা সরকারকে ধুয়ে দিচ্ছেন, তাদের ম্যানেজমেন্ট কোয়ালিটি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। সৌদি ক্রাউন প্রিন্সের গাড়িবহর (?!) অথবা নিরাপত্তা বাহিনীর বহরকে জায়গা দিতে গিয়েই এই ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটেছে, ইরানী প্রশাসন ও মিডিয়া থেকে এই অভিযোগ তোলা হয়েছে। আবার সৌদি দরকার বলছে, ইরানি কিছু হাজি গ্রুপ নিয়ম অমান্য করে বিপরীত দিকে চলার চেষ্টার কারণেই এই বিপর্যয়। পারস্পরিক এই দোষারোপের মধ্যে মূল বিষয়টা থেকে যাচ্ছে পর্দার আড়ালেই।

সবচেয়ে দুঃখের এবং ভয়ের বিষয়, আমাদের বাংলাদেশের কিছু ‘দেশপ্রেমিক তৌহিদি জনতা’ হাজ্জের ব্যবস্থাপনার সাথে আমাদের তুরাগ পাড়ের ইজতেমার ম্যানেজমেন্টের (!!) সাথে তুলনাও করে ফেলেছেন, এবং যথারীতি তুরাগতীরের ব্যবস্থাপনাকেই যোগ্যতর স্থানে রেখেছেন !!! (আস্তাগফিরুল্লাহ)

Hundreds of thousands of Muslim pilgrims make their way to cast stones at a pillar symbolizing the stoning of Satan, in a ritual called "Jamarat," the last rite of the annual hajj, on the first day of Eid al-Adha, in Mina near the holy city of Mecca, Saudi Arabia, Thursday, Sept. 24, 2015. (AP Photo/Mosa'ab Elshamy)
Hundreds of thousands of Muslim pilgrims make their way to cast stones at a pillar symbolizing the stoning of Satan, in a ritual called “Jamarat,” the last rite of the annual hajj, on the first day of Eid al-Adha, in Mina near the holy city of Mecca, Saudi Arabia, Thursday, Sept. 24, 2015. (AP Photo/Mosa’ab Elshamy)

তাদের সকলের উদ্দেশ্যে কিছু সামান্য কথা –

হাজ্জ হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে কমপ্লেক্স ম্যানেজমেন্ট প্রসেস, একসাথে কতগুলা কাজ কতভাবে হচ্ছে এইটা চিন্তায়ও আনা যায় না। মিনা-মুজদালিফা-আরাফায় মুভমেন্ট, কুরবাণী, হাজীদের একোমোডেশন থেকে শুরু করে সবকিছু এক আল্লাহ নিজ রহমতে কন্ট্রোল করান বলেই ঠিকমত সম্ভব হয়। তাদের হাজ্জ বিষয়ক মন্ত্রীর একটা বক্তব্য ইউটিউবে একবার শুনেছিলাম, এক একটি হাজ্জ এর ম্যানেজমেন্ট একসাথে পাঁচটা ওয়ার্ল্ডকাপ আয়োজনের চেয়েও কঠিন।

কয়েকবছর ধরেই হজ্জ্বের সময় ডিসকভারি চ্যানেলে The Hajj revealed নামের একটা ডকুমেন্টারি প্রোগ্রাম দেখায়। হাজ্জের প্রতিটা পর্যায়ে ঠিক কোন লেভেলের একটা কর্মযজ্ঞ চলে, এই ভিডিওটা না দেখলে বোঝা সম্ভব না। ২০০৬ এর দুর্ঘটনার পর সৌদি সরকার ঠিক কীভাবে ব্যাপারগুলা আধুনিক করেছে- এখানে খুব স্পষ্ট দেখানো হইসে। (ভাষা অবশ্য হিন্দি/ অনেক খুজেও ইংরেজিটা পেলাম না)

অনেকে বলছেন তারা হাজীদের থেকে লাখ লাখ টাকা নেয় – তবে এয়ারফেয়ার অ্যাকোমডেশন কুরবাণি মোয়াল্লেম ফি বাদ দিয়ে থাকে কতটুকু টাকাই বা থাকে, সে প্রশ্ন বাদ দিয়েও আর তারা যে টাকাটা নেয় সেটা ঠিক বাতাসে উড়ায় দেয় না। প্রতি বছর ট্রিমেনডাস লেভেলে ডেভেলপমেন্টের কাজ চলছে, মসজিদের সম্প্রসারণ হচ্ছে, আন্ডারগ্রাউন্ড এবং বহুতল তাওয়াফ এবং পাথর ছোড়ার ব্যবস্থা চলছে। মরুর বুকে আরামদায়ক পরিবেশ তৈরির জন্য লেটেস্ট টেকনোলজীর যত প্রকার ব্যবহার করা যায়, সব করা হচ্ছে। মক্কা-মদীনা এবং মক্কা-মিনা শাটল ট্রেন কমিউনিকেশন চালু হচ্ছে, সেই ট্রেনেও আবার দেশভিত্তিক কোটা আছে।

KABAচলমান সংস্কার কাজের মডেল – কি চেহারা নিতে যাচ্ছে মসজিদুল হারাম

KABA 2ভবিষ্যৎ মসজিদুল হারাম ও মক্কা নগরীর সংশ্লিষ্ট অংশ – স্থপতির দৃষ্টিকোণে

হাজ্জের জন্য প্রতি বছর নির্ধারিত কোটা থাকে, প্রত্যেক দেশের মুসলিম জনসংখ্যার অনুপাতে কোটা দেওয়া হয় যেন তারা ভিড় কন্ট্রোল করতে পারে। এমনকি বর্তমানে যে ম্যাসিভ ডেভেলপমেন্টের কাজ চলছে, সেটাকে ঠিকভাবে সামাল দিতে উমরাহ ভিসা কয়েকবছরের জন্য একেবারে সীমিত করে দেয়ার পরিকল্পনাও ছিল, কিন্তু ধর্মীয় আবেগ এবং ইবাদতের কথা চিন্তা করে এই থেকে তারা পিছিয়ে এসেছে।

এখন মূল কথা হচ্ছে, দোষ কার? এককভাবে সৌদি রাজপরিবারের, নাকি হাজীদের অসচেতনতার, নাকি স্রেফ একটি দুর্ঘটনা ? উত্তর খুঁজে পাওয়াটা বেশ কঠিন। বিজ্ঞানীরা অবশ্য ফিজিক্সের দৃষ্টিকোণ থেকে হাজ্জের এই দুর্ঘটনার একটা ব্যাখ্যা দাঁড়া করিয়েছেন, সেখানে এটিকে ফ্লুইড ডিনামিক্স এবং হিউম্যান সাইকোলজীর জায়গা থেকে একটা ইন্টরেস্টীং ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। আর্টিকেলটা পড়তে পারেন, নতুন ইনসাইট পাবেন।

আমি নিজে বর্তমান সৌদি বাদশাহী রেজিমের একজন কঠোরতম সমালোচক, এরা যতটা না মুসলমান তার চেয়ে বেশি জায়োনিস্ট। আমি মনে করি, ইয়েমেনের নিরীহ নারী-শিশু ও নাগরিকদের উপর সরাসরি হামলা আর মিশর, সিরিয়া মধ্যপ্রাচ্যের অন্যাদেশগুলোতে পরোক্ষভাবে ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর জন্য এই রেজিম এবং তল্পিবাহী সৌদিয়ানদের আরও অনেক অনেক বেশি জিল্লতির শিকার হতে হবে। তবে এটুকু স্বীকার করতেই হবে, রাজনৈতিক মতাদর্শ বা ধর্মীয় আইডীওলজি বা বিভেদ, যাই কিছ থাকুক না কেন, তারা হাজীদেরকে ইন জেনারেল নিজের জীবনের চেয়েও বেশি সম্মান দেয়।

নিজের চোখে দেখা এই বিষয়ে আমার কোনই সন্দেহ নাই।

(তবে এও সত্য, ইয়েমেনি নাগরিকদের জন্য হাজ্জ-উমরাহর অনুমতি বন্ধ রেখেছে সৌদি বাদশাহী প্রশাসন)

Advertisements