গ্লোবট্রটার রামনাথ বিশ্বাসঃ দু’চাকায় সারা পৃথিবী ঘোরা দুঃসাহসী বাঙ্গালী

বাঙ্গালী সন্তান রামনাথ বিশ্বাস ছিলেন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম ভূ-পর্যটক বা গ্লোব ট্রটার, যিনি বাইসাইকেলে বিশ্বভ্রমণ করে সারাবিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন। তার সম্পর্কে খুব বেশি জানার সুযোগ আমি এখনও পাইনি, আপাতত নেট ঘেটে কেটে ছেটে যা পাওয়া গেল তাই তুলে দিচ্ছি।
সত্যজিৎ রায়ের লোম খাঁড়া করা ‘টিনটোরেটোর যীশু’ উপন্যাসে ফেলুদার একটা ডায়ালগ প্রায় সময়ই মনে ভাসে……… কত যে ইন্টরেস্টিং বাঙ্গালী ক্যারেক্টার আছেন, তাদের নামও জানি না !
.
আজকে জানলাম গ্লোবট্রটার রামনাথ বিশ্বাস সম্পর্কে। বাঙ্গালী মানেই পোষা মানা শান্তিতে শয়ান প্রাণ নয়,  যাযাবর রক্ত আমাদের মাঝেও থাকতে পারে বা জেগে উঠতে পারে, ইনিই তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ।
.
জন্ম ও পরিচয়
রামনাথ বিশ্বাস ১৮৯৪ সালের ১৩ জানুয়ারী হবিগঞ্জের বানিয়াচং গ্রামের (এটি পৃথিবীর বৃহত্তম গ্রাম) বিদ্যাভুষন পাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। বাবা বিনজনাথ বিশ্বাস, মা গুনময়ী দেবী। স্থানীয় হরিচন্দ্র এলআরআই স্কুলে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করার পর পিতার মৃত্যুর কারণে হবিগঞ্জ জাতীয় ভান্ডার সমিতির ম্যানেজার পদে চাকুরীতে যোগ দেন। জাতীয় ভান্ডারের মোটর কারখানা থাকার সুবাদে ম্যানেজার হিসাবে মোটর ড্রাইভ ও সাইকেল চালানোর অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পান তিনি। সেখান থেকে মোটর ও বাইসাইকেল চালনায় বিশেষ পারদর্শী হয়ে উঠায় বাইসাইকেলে বিশ্ব ভ্রমণে আগ্রহী হয়ে হয়ে উঠেন রামনাথ।
Ramnath 2
রামনাথ বিশ্বাস
একসময় ভারতে চলে গিয়ে অন্য একটি চাকুরী নেন রামনাথ। সে সময়টা ছিল বঙ্গভঙ্গ রদের পরবর্তী ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের উত্তাল সময়। রামনাথ বিশ্বাস গোপনে যুক্ত হয়ে গেলেন সশস্ত্র বিপ্লবী দল অনুশীলন সংঘের সাথে। এই সংশ্লিষ্টতা প্রকাশ হয়ে গেলে তাকে চাকুরিচ্যুত করা হয়। ইতিমধ্যে আবার প্রথম বিশ্বযুদ্ধ আরম্ভ হলে তিনি যুদ্ধে যোগ দেন। বাঙালি পল্টনের সঙ্গে তিনি মেসোপটেমিয়ায় যান, ১৯২৪ সালে তিনি মালয়শিয়াতে বৃটিশ নৌবাহিনীর একটি চাকরিতেও যোগ দেন।
.
ক’বছর পরেই ঝাড়াঝাপটা হয়ে ত্রিশের দশকের শুরু থেকেই শুরু হল তাঁর বিশ্ব ভ্রমণের আকাঙ্খা মেটানোর পালা।
.
বিশ্বভ্রমণঃ প্রথম ধাপ (১৯৩১-৩৩)
একটি বাইসাইকেল, এক জোড়া চটি জুতা আর দু’টি চাদর নিয়ে প্রথমে সিঙ্গাপুরের দিকে রওয়ানা হলেন রামনাথ বিশ্বাস। সাইকেলের ক্যারিয়ারে একটি বাক্সে সাইকেল মেরামতির সরঞ্জাম। সাইকেলের গায়ে লেখা ‘রাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড, হিন্দু ট্রাভেলার’ !!
Cycle.
রামনাথ বিশ্বাস
৭ জুলাই ১৯৩১…সিঙ্গাপুরের কুইন স্ট্রীট থেকে বিশ্বযাত্রা শুরু করলেন রামনাথ বিশ্বাস। সিঙ্গাপুরে চাকুরীরত প্রবাসী ভারতীয়রা রামনাথকে সেদিন শুভেচ্ছা জানাতে এসেছিলেন। এই সাইকেলে চড়ে তিনি মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, চীন, কোরিয়া এবং জাপান হয়ে কানাডায় পৌঁছান। কানাডাতে এক মাস জেল পর্যন্ত খাটতে হয়েছিল। কিন্তু কোন বাধাই তাকে বিরত করতে পারেনি।
.
বছর দুই পরে এই যাত্রা শেষ করে তিনি গ্রামে ফিরলে বানিয়াচঙ্গের ঐতিহাসিক এড়ালিয়া মাঠে এক বিশাল সংবর্ধনা সভার আয়োজন করেন গ্রামবাসীরা। উক্ত সভায় রামনাথ তার বিশ্বভ্রমণের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে ‘বানিয়াচঙ্গকে বিশ্বের বৃহত্তম গ্রাম’ বলে উল্লেখ করেন।
.
বিশ্বভ্রমণঃ দ্বিতীয় ধাপ (১৯৩৪-৩৬)
মাঝে খানিকটা বিরতির পর প্রায় ১৯৩৪ সালের দিকে আবার সিংঙ্গাপুর হয়ে রেঙ্গুন, মান্দালয়, শিলং, পেশোয়ার, কাবুল, বাগদাদ, হিরাত, মাঠাদ, তেহরান, দামেস্ক, আংকারা, বেলগ্রেড, ভিয়েনা, বার্লিন, প্যারিস, লন্ডন পৌছেন তিনি। এরপর জাহাজে পোর্ট সাইদ হয়ে বোম্বে পৌছান। বহু বাঁধা-বিপত্তি ও শারীরিক দুর্বলতার মধ্যদিয়ে এই বিরাট যাত্রাপথ অতিক্রম করতে হয়েছিল তাকে।
.
দ্বিতীয়বার তিনি পারস্য ভ্রমণ করে তাঁর অভিজ্ঞতা সম্পর্কে বলেন, “একদিন এক চায়ের দোকানে চা পানের জন্য বসি তখন চা ওয়ালা ফুটন্ত জলের কেতলি চা, দুধ, চিনি টেবিলে রাখে৷ সেই দেশে নিয়মও এই রকম৷ আমি নিজ হাতে চা তৈরি শুরু করি৷ চায়ের পেয়ালাতে ফুটন্ত জল ঢেলে এক চামচ চিনি দেওয়ার পর আরেক চামচ দিতেই চা ওয়ালা বলে উঠল ‘আওর নেহী সাহেব, এক ছিপ কা যেয়াদা লেগা হামারা সুলতান কা মানা হ্যায়।‘ (আর নিয়েন না, এক চামচের বেশি চিনি নেয়া সুলতানের নিষেধ)
.
আমি তার কথা রক্ষা করে ভাবতে লাগলাম, প্রথমবার ভ্রমণে দেখলাম একটা নোংরা দেশ, বাড়ি ঘর নোংরা৷ এবার দেখলাম এর বিপরীত৷ সেই স্থান প্রাসাদে পরিপূর্ণ, আচার আচরণ ভিন্ন৷ ইহার কারণ রাষ্ট্রের মিতব্যয়িতা৷”
.
বিশ্ব ভ্রমনকালে রামনাথ বিশ্বাস বহু দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামী জনগণের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের সংগ্রামের সাথে সংহতি জ্ঞাপন করেছেন। এসব কারণে এই ধাপে বুলগেরিয়া ভ্রমনের সময় সেখানকার একটি সংবাদপত্রের সম্পাদক তাকে একটি শুভেচ্ছা বাণী দেয়ার অনুরোধ করেছিলেন। তার অনুরোধে রামনাথ রবিঠাকুরের ভাষায় একটি শুভেচ্ছা বাণী উপহার দেন-‘হে আমার বুলগার ভাইবোনেরা, তোমারা সকল রকমে স্বাধীন হয়ে পৃথিবীর নির্যাতিত লোককে সাহায্য করতে এগিয়ে আসবে…… এই আশা রেখেই তোমাদের দেশ হইতে বিদায় নিচ্ছি।’
.
এই যাত্রায় তার শরীর ভেঙে গিয়েছিল। ১৯৩৬ সালে তিনি লন্ডন থেকে জাহাজে পোর্ট সৈয়দ হয়ে মুম্বাই প্রত্যাবর্তন করেন। সুস্থ হয়ে তিনি শান্তিনিকেতনে কবিগুরুর কাছে যান।
.
বিশ্বভ্রমণঃ তৃতীয় ধাপ
রামনাথ তৃতীয়বার বিশ্বযাত্রা করেন ১৯৩৮ সালে। সেবার তিনি আফ্রিকা মহাদেশে পাড়ি দেন। মুম্বাই থেকে  জাহাজে মোম্বাসায় পৌঁছে সেখান থেকে সাইকেল যাত্রা শুরু করে তিনি। একে একে কেনিয়া, উগান্ডা, নায়াসাল্যান্ড, রোডেসিয়া হয়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় পৌঁছান। এখান থেকে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও যান; কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার ভালো লাগেনি। তিনি ১৯৪০ সালে দেশে ফিরে আসেন।
Ramnath
তৃতীয় বিশ্বযাত্রার রুট

তিনটি ধাপের এই বিশাল যাত্রাপথের খরচও তিনি সর্বদাই মিটিয়েছেন মানুষের কাছ থেকে চাঁদা তুলে। খরচের অতিরিক্তি টাকা বিলিয়ে দিয়েছেন গরীবদের মধ্যে। তিনি মনে করতেন পর্যটকদের কাছে প্রয়োজনের অতিরিক্ত অর্থ রাখা কঠিন বিড়ম্বনা।

.
বই লিখা এবং প্রকাশনা
দেশে ফিরে থিতু হয়ে তিনি গোছাতে থাকেন তার বিশ্বভ্রমণের স্মৃতিগুলো। এইসব ভ্রমণকাহিনী নিয়ে বই প্রকাশ করতে চাইলে কোন প্রকাশকই এগিয়ে আসেনি। অগত্যা তিনি নিজেই ‘পর্যটক প্রকাশনা ভবন‘ নামে একটি প্রকাশনা সংস্থা খুলে নিজের বই প্রকাশ করতে শুরু করেন। তার লেখা প্রায় ৪০টি বই রয়েছে। রামনাথ বিশ্বাস কলকাতায় বসবাসকালে এসব গ্রন্থের লেখা আনন্দবাজার পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল। তার কিছু বই দেখুন –
  • অন্ধকারের আফ্রিকা
  • আজকের আমেরিকা
  • জুজুৎসু জাপান
  • তরুণ তুর্কী
  • দুরন্ত দক্ষিণ আফ্রিকা
  • নিগ্রো জাতির নতুন জীবন
  • প্রশান্ত মহাসাগরে অশান্তি
  • বেদুইনের দেশে
  • ভবঘুরের বিশ্বভ্রমণ
  • ভিয়েতনামের বিদ্রোহী বীর
  • মরণবিজয়ী চীন
  • মাও মাওয়ের দেশে
  • মালয়েশিয়া ভ্রমণ
  • লাল চীন
  • বিদ্রোহী বলকান
  • সর্বস্বাধীন শ্যাম
  • হলিউডের আত্মকথা
  • ট্যুর রাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড উইদাউট মানি (Tour Round The World Without Money)
.
খোঁজাখুঁজি করছি তার বইগুলো কোথায় পাওয়া যেতে পারে, আপাতত আজকের আমেরিকা  অথবা আফগানিস্তান ভ্রমণ বইটা নামিয়ে পড়তে শুরু করে দিন।
.
শেষ জীবন
১৯৪৭ সালের দেশভাগে ভারত-পাকিস্তান আলাদা হলেও রামনাথ বানিয়াচঙ্গেই থেকে যান। তবে ১৯৫০ এর দিকে একবার কলকাতায় গেলে ফেরার সময় জানতে পারেন বানিয়াচং এ ম্যালেরিয়া মহামারীর কথা। তাই তিনি থেকে যান কলকাতায় এবং সেখানেই ১৯৫৫ সালের পহেলা নভেম্বর মারা যান।
.
চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির,
জ্ঞান যেথা মুক্ত, যেথা গৃহের প্রাচীর
আপন প্রাঙ্গণতলে দিবসশর্বরী
বসুধারে রাখে নাই খণ্ড ক্ষুদ্র করি,
যেথা বাক্য হৃদয়ের উত্‍‌সমুখ হতে
উচ্ছ্বসিয়া উঠে, যেথা নির্বারিত স্রোতে
দেশে দেশে দিশে দিশে কর্মধারা ধায়
অজস্র সহস্রবিধ চরিতার্থতায়………
Advertisements

2 comments

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

w

Connecting to %s