আমরা অনলাইনে কি খুঁজি ? কি ভাবি ? কি দেখি ? কি বলি ?

অনেকেই এই প্রশ্নের অবভিয়াস কিছু উত্তর দেয়ার চেষ্টা করেন, মোটাদাগে ‘চ’ বর্গের জিনিসপাতির দিকে চলে যান, এবং জাতি হিসেবে আমাদের ভবিষ্যত নিয়ে মাথা কুটে মরতে চান। গুগল সার্চে কোন একটা কি ওয়ার্ড লিখতে গিয়ে গা গুলিয়ে আসা সাজেশন আসতে থাকলেও আশার দিক হচ্ছে, আমাদের সবচেয়ে বেশি খোঁজা টার্মগুলোর মধ্যে এগুলোর স্থান নেই। ডাটা বলছে, আমরা বরঞ্চ খেলা নিয়েই মেতে থাকতে আগ্রহী বেশি। (অবশ্য অ্যালেক্সা র‍্যাংকিং এ বাংলাদেশ থেকে সবচেয়ে বেশি ভিজিট করা ওয়েবসাইটগুলোর মধ্যে ১৩ নম্বরে রয়েছে একটি পর্ণ সাইট)। অবশ্য আমরা হাটছি ডিজিটাল মহাসড়কে, দেশে চলছে অনলাইন স্টার্টআপের স্বর্ণযুগ, ফ্রিল্যান্সারদের স্বর্গ এই দেশ। আমাদের অনলাইন অ্যাকটিভিটির ভাবসাবই তো আলাদা হওয়া উচিত।

সত্তরের দশকে ফরাসী ভাষায় লিখা Propaganda: The Formation of Men’s Attitudes নামের একটা বইয়ের সন্ধান পেয়ে এই ডাটা বিশ্লেষণের আজাইরা কাজে নামলাম। এইখানে লেখক ক্যাটেগরীকালি দেখাতে চেয়েছেন, কিভাবে প্রোপাগান্ডা মানুষের ব্যক্তিক ও আর্থ-সামাজিক চিন্তা-চেতনাকে নিয়ন্ত্রণ করে, এবং প্রোপাগান্ডা পরিচালনাকারীর মূল উদ্দেশ্য পরিপূর্ণ করে।

সার্চ জায়ান্ট গুগলের একটা ইন্টরেস্টিং টুল হচ্ছে গুগল ট্রেন্ডস, এর মাধ্যমে পৃথিবীর কোন দেশের মানুষ কি জিনিস খুজছে তার একটা গ্রাফিকাল রিপ্রেজেন্টেশন সহজেই পাওয়া যায়। যেমন ধরেন, ২০১৫ সালে বাংলাদেশের মানুষজন গুগলে কি কি সার্চ করেছে সেটা নিচের দু’টো টপ চার্টে উঠে এসেছে।

আমাদের সাধারণ আমজনতার মধ্যে পরীক্ষার রেজাল্ট খোজার পাশাপাশি খেলা, বিশেষত ক্রিকেট নিয়ে আগ্রহের শেষ নেই দেখা যাচ্ছে। দু’টো হিন্দি সিনেমাও আছে। আর ব্যক্তিবর্গের মধ্যে চার জন খেলোয়াড়,  পাঁচ জন অভিনেতা-অভিনেত্রী এবং সবেধন নীলমণি হয়ে ভারতের সাবেক প্রেসিডেন্ট আব্দুল কালাম রয়েছেন।

মেটাডাটা বা তথ্য কত ইন্টরেস্টিং (?!) হতে পারে তার নজির দেখেন। দু’টো গ্রাফ দেখুন –

Porn
গুগল সার্চে ‘চ’বর্গীয় কিছু বাংলা শব্দ সার্চের পরিমাণ
Unemployed
বাংলাদেশে বেকারত্বের হার

স্রেফ মজা করবার জন্যঃ দেখতেই পাচ্ছেন, ২০০৯-১০ সালে বাংলাদেশের বেকারত্বের হার সবচেয়ে বেশি ছিল; ঠিক এই ২০০৯ সালেই বাংলাদেশের অনলাইনে পর্ণোগ্রাফিক কনটেন্ট সার্চের পরিমাণ হঠাত করেই লাফ দিয়েছিল। এইটা শিয়ার কো-ইন্সিডেন্স, কিন্তু চিন্তার বিষয় হচ্ছে ২০১৫ সালে এসেও এই গ্রাফ আকাশ্চুম্বী।

যা হোক, সোশ্যাল মিডিয়ায় কোন সেলিব্রেটির পাবলিক পোস্টে আমজনতার কমেন্ট, ফেসবুকের রেডিওমুন্না ধাঁচের পেজগুলোর লাইক-শেয়ার এবং বিভিন্ন মাত্রার সাইবার বুলিইং থেকেও আঁচ করা যায় আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের চিন্তাচেতনা কোন দিকে প্রবাহিত হচ্ছে। অ্যালেক্সা র‍্যাংকিং এ বাংলাদেশ থেকে সবচেয়ে বেশি ভিজিট করা ২৫টি সাইটের মধ্যে ৯টিই হচ্ছে অনলাইন নিউজপোর্টাল। জাতি হিসেবে আমরা অনেক বেশি সচেতন, পেটে ভাত না থাকলেও চায়ের কাপে রাজনীতির আলাপে ঝড় না তুললে হবে নাকি ?

ভারতের সাধারণ মানুষজন কি ভাবছে সেটাও আমরা দেখে নিতে পারি।

India Top Search
২০১৫ সালে ভারতের মানুষজনের গুগল সার্চের শীর্ষ দশ টপিক

একেবারে পরিস্কার – টপ টেনের মধ্যে ৭টিই হচ্ছে ব্যবসা বা ই-কমার্স সংক্রান্ত টার্ম। অ্যালেক্সা র‍্যাংকিং এও ভারত থেকে সবচেয়ে বেশি ভিজিট করা ২৫টি ওয়েবসাইটের মধ্যে ৯টি হচ্ছে ই-কমার্স সাইট।

তবে ভারতকে খুব বেশি উচ্চাসনে রাখবার সুযোগ নেই, কারণ তাদের টপ টেন সার্চ করা ব্যক্তিবর্গের একেবারে শীর্ষেই রয়েছেন রোমান্টিক-অ্যাকশন ঘরানার অভিনেত্রী সানি লিওনি, এবং আরও অনেক বলিউডি নায়িকা।

যা হোক, ‘প্রোপাগান্ডাঃ দ্য ফরমেশন অফ দ্য মেন’স অ্যাটিটিউড’ বইয়ে লেখক জ্যাক ইলাল দেখাতে চেয়েছেন, যে কোন প্রোপাগান্ডা সফল হতে হলে তাকে অবশ্যই সমাজে প্রচলিত পাঁচটি কালেক্টিভ মিথকে মাথায় রাখতে হবে, এবং সেই আলোকে প্রোপাগান্ডা চালাতে হবে। মিথ পাঁচটি হচ্ছে –

‘মিথ অফ ওয়ার্ক, মিথ অফ হ্যাপিনেস, মিথ অফ দ্য নেশন, মিথ অফ দ্য ইয়ুথ এবং মিথ অফ অ্যা হিরো’

আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে আমরা নিজেরাই নিজেদের জন্য প্রোপাগান্ডা চালাচ্ছি, অথবা আড়ালে বসে প্রোপাগান্ডার ধোয়া তুলে নিজেদের আখের গুছিয়ে নিচ্ছেন বুদ্ধিমানেরা। ইদানিং বেশ ক’বছর ধরেই মিথ অফ দ্য নেশন, মিথ অফ ইউথ এবং মিথ অফ দ্য হিরো, আপাতত সবকিছুতেই কেন্দ্রবিন্দু আমাদের ক্রিকেটারেরা। রাজনীতিবিদেরা আমাদের হতাশ করেছে/ করেনি, দেশের অর্থনীতি ভেঙ্গে পড়ছে/ এগুচ্ছে, দেশের আরথ-সামাজিক অবস্থা ঠিক নেই/ ঠিক আছে……… সবকিছু নিয়ে বিতর্ক চলতে পারে, একমাত্র ক্রিকেটই আমাদের খেয়া পারের তরণী, এক বন্ধনে বাঁধে পুরো দেশকে।

Cricket
মিরপুর নিবাসী হিসেবে এই ক্রিকেট উন্মাদদের প্রায়ই দেখি টিকেটের জন্য ঘন্টার পর ঘন্টা লাইন ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে, পুলিশের লাঠি-গুতোও জোটে মাঝে মধ্যে। আবেগের মূল্য কত ?

আমি নিজেই অতি উচ্চমাত্রায় ক্রিকেটপ্রেমী, খেলার শেষ ওভারে এসে হৃদঃস্পন্দন মিস করা আবেগী পাবলিকের অন্তর্ভুক্ত। আবেগ উন্মাদনা ভালোবাসায় এই খেলা নিয়ে কর্পোরেট জায়ান্টদের ব্যবসা, ফাইভ স্টার হোটেল থেকে পাড়ার ছ্যাঁচড়া জুয়াড়ীদের টাকার লেনদেন আর ক্ষেত্রবিশেষে উগ্র সাম্প্রদায়িকতার বহিঃপ্রকাশ, সবকিছুই হয়তো ওভারলুক করে যাই। মাথা ঠান্ডা হলে, এরপর আবার চিন্তা-ভাবনার অবকাশ আসে।

কোন রকমে মিডল ইনকাম কান্ট্রির থ্রেশহোল্ডে ঢুকে পড়েছি আমরা, সামগ্রিক অর্থনীতি এবং উন্নয়নের হিসাব কষবার সময় মনেই থাকে না, মাথাপিছু আয় এবং ঋণের পরিমাণ কোথায় কিভাবে যাচ্ছে ! উন্নয়নের ‘পিন্যাকল’ হিসেবে ২৮ হাজার কোটি টাকা বাজেটের পদ্মা সেতুকে আমরা চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়ে তা বাস্তবায়ন করছি, অথচ ২০১৩ সালে স্রেফ এক বছরে দেশ থেকে পাচার হয়েছে ৭৬ হাজার কোটি টাকা = ৩টি পদ্মা সেতুর খরচ।

‘প্রাণের শহর’ ঢাকার কথাই ধরা যাক। সড়ক বিভাগের প্রকাশিত রিভাইজড স্ট্র্যাটেজিক ট্রান্সপোর্টেশন প্ল্যান (RSTP) এর খসড়া অনুযায়ী, বর্তমানে ঢাকা ও আশপাশের এলাকাগুলোর জনসংখ্যা ১ কোটি ৭০ লাখ, ২০৩৫ সালে যা বেড়ে দাঁড়াবে ২ কোটি ৬৩ লাখে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি ২০ বছরে মানুষের ট্রিপের সংখ্যা ৩ কোটি থেকে বেড়ে দাঁড়াবে ৫ কোটি ২০ লাখে। এতে বাড়বে যানবাহনের চাপ। ফলে রাজধানীতে যানজটের প্রকোপ দ্বিগুণ আকার ধারণ করবে। যানবাহনের গতি নেমে আসবে অর্ধেকে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে ২ লক্ষ কোটী টাকা বিনিয়োগে পাঁচটি মেট্রোরেল ও দুটি বিআরটি নির্মাণের সুপারিশ করা হয়েছে এই পরিকল্পনায়।

তবে এই পরিকল্পনার প্রভাবে সড়কে গাড়ির চাপ কমবে না, উল্টো বাড়বে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মেট্রোরেল ও বিআরটি কখনই এ চাহিদা মেটাতে পারবে না। এছাড়া সব রুটে মেট্রোরেল ও বিআরটি চলাচল করবে না। তাই ২০৩৫ সালে ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার বাড়বে। এমনকি বাসের ব্যবহারও খুব বেশি কমবে না।’

তাহলে অচলাবস্থার দিকে ধাবমান এই শহরের সমাধান কি? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিকল্পিত বাস নেটওয়ার্কই সমাধান দিতে পারে, যা গড়ে তুলতে মাত্র ৫ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। এদিকে অবশ্য উন্নয়নের অগ্রযাত্রা অব্যহত রাখতে ২ লক্ষ কোটি টাকা ব্যয়ে মেট্রোরেল হচ্ছে, সত্যজিৎ রায়ের ‘ভুতো’ গল্পের ভাষায়, শহরে বসছে হাসপাতাল রেল, মুমূর্ষু শহরের গায়ে তাই ছুরি চলছে সমানে !

সবকিছু মিলিয়ে হয়তো আপনি কখনো কখনো আশা হারিয়ে ফেলবেন। যেনতেন প্রকারে বিদেশে যাবার এবং সেখানে সেটল করবার প্রবণতার পিছনের মূল কারণ তো এটিই। ইতিহাস ঐতিহ্য সংস্কৃতি গৌরব সবকিছু ছাপিয়ে বিবর্ণ বর্তমানই আমাদের চোখে ধূসর হয়ে ধরা দেয়। এর অবশ্যম্ভাবী ফলাফল হচ্ছে অস্থিরতা, অসহিষ্ণুতা এবং সংঘাত। আমাদের সামাজিক পরিবেশটা এতো ভায়োলেন্ট এবং দ্বন্দ্বমুখর হয়ে যাচ্ছে কেন, তার কারণ এবং প্রতিকার গবেষণা না করলে বিপদ অবশ্যম্ভাবী।

লাইট টোনেই ফিরে আসি আবারঃ খুব বেশি হতাশ হবার কোনও কারণ নেই যদিও, নিচের দেশটি একটা পরমাণু-শক্তিধর দেশ, তাদের ২০১৫ সালের সার্চ করা টার্মগুলোও দেখতে পারেন।

Pakistan Top Search

২০১৫ সালে পাকিস্তানের মানুষজনের গুগল সার্চের শীর্ষ দশ টপিক

এখন যেমন করছি, হয়তো আগামীতেও আমরা একইভাবে মুভি, রিয়েলিটি শো, খেলা এইসব নিয়ে মেতে থেকে হৃদয়ের সার্বক্ষণিক রক্তক্ষরণ ঢেকে রাখবো রঙ্গিন কাপড়ে। জাতি হিসেবে আমরা খুবই সহজ-সরল, আমাদের সহজেই শিশুর মত লোভ দেখিয়ে টোপ ঝুলিয়ে সবকিছু ভুলিয়ে রাখা যায়।

মন্দ কি ?

 

 

 

Advertisements