একজন পাগলের গল্প বলতে চাই, যে পাগল তার ভাঙ্গা ঘরে জোড়াতালি দিয়ে দাঁড়া করানো পুরনো কম্পিউটারে অস্বাভাবিক হাস্যকর কাহিনী, ধুন্ধুমার অ্যাকশন এবং অচিন্তনীয় সিজিআই ব্যবহার করে একা হাতে গড়ে তুলেছেন একটি শিল্প, গত দশ বছরে একাই মুক্তি দিয়েছেন চল্লিশের বেশি সিনেমা, এবং স্বপ্ন দেখাচ্ছেন পশ্চাৎপদ গরিব একটি দেশের তার চেয়েও গরিব, আমুদে এবং সরল মানুষদের। তার সিনেমার বিষয়বস্তুতে সবসময়ই থাকে অস্বাভাবিক ভায়োলেন্স, তাই বিবিসি, সিএনএন সহ অনেকেই তাকে বলছেন উগান্ডার কুয়েন্টিন টারান্টিনো !

তার নাম ইসাক নাবওয়ানা। ২০০৬ সালে তিনি তৈরি করেন র‍্যামন ফিল্ম প্রোডাকশন, যারা আজকের ‘ওয়াকালিউড’ এর জন্মদাতা।

Wakaliwood GUNS 2
দ্য এক্সপেন্ডেবলস এর উগান্ডান রিমেকঃ আর কিছু বলা লাগবে ?

উগান্ডার রাজধানী কাম্পালার শহরতলীতে যে এলাকাটিতে তিনি থাকেন, ইংরেজীতে তাকে বলা হচ্ছে slum, অর্থাৎ আমাদের বাংলায় বলতে গেলে বস্তি। জায়গাটির নাম ওয়াকালি, আর সেখান থেকেই ওয়াকালিউড।

স্বপ্নবাজ বিপ্লবী-শিল্পী ইসাক নাবওয়ানা ২০০৬ এর শুরুতে কাম্পালাতেই কম্পিউটার সংযোজন এবং কিছু বেসিক সফটওয়্যারের ওপর ছয়মাসের একটি প্রশিক্ষণ নেন। এরপর বিভিন্ন জায়গা থেকে পার্টস সংগ্রহ করে নিজের জন্য জোড়া দেন একটি কম্পিউটার, সফটওয়্যার হিসেবে অ্যাডোব প্রিমিয়ার আর আফটার ইফেক্ট। আশেপাশের ভাঙ্গারী দোকান থেকে সংগ্রহ করেন বিভিন্ন হাল-হাতিয়ার, গাড়ীর ভাঙ্গাচোরা অংশ, মাল টানার ট্রলি এইসব দিয়ে তৈরি হয় বিভিন্ন ক্যামেরার ফ্রেম, জিব আর অন্যান্য ইকুইপমেন্ট। সর্বশেষ, একজন প্রতিবেশীর থেকে ধার নেন একটি ক্যামেরা, আর এভাবেই জন্ম নেয় ওয়াকালিউড !

Wakaliwood PC
বামে ইসাকের কম্পিউটার, এখানেই জন্ম নেয় ওয়াকালিউডের মুভিগুলো। আর ডানে, বিক্রির জন্য সেই মুভির ডিভিডি প্যাক করছেন তার স্ত্রী-সন্তানেরা

মুভিগুলোর ফাইটিং সিন এতো হাস্যকর, এবং সিজিআই এতো অস্বাভাবিক পাগলামী ধরণের, মুভি দেখবার সময় এগুলোর মানের কথা কারো মনেই থাকে না। হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খেলে আবার মুভির কোয়ালিটি নিয়ে চিন্তার সময় কই? এবং ইউটিউবের কল্যাণে ওয়াকালিউড হিট হয়ে যায় সারা পৃথিবীতেই, তৈরি হয় একটি কাল্ট ফলোয়িং। ওয়াকালিউডের সবচেয়ে জনপ্রিয় মুভি Who Killed Captain Alex এর ট্রেইলারের ভিউ আড়াই মিলিয়ন ছাড়িয়েছে।

Wakaliwood Guns
জি, এগুলোই র‍্যাম্বোর সেই এম৬০ মেশিনগান !
Wakaliwwood
বেশ কিছু ওয়াকালিউড মুভিতে এই বিধ্বংসী কাঠের বন্দুকটি ব্যবহার করা হয়েছে

গল্পটা হয়তো এখানেই শেষ হতে পারতো, গরিব দেশের কিছু পাগলের পাগলামী আর এর চেয়ে বেশি কি অ্যাটেনশন পাবে। কিন্তু তা হয়নি, ট্যুইস্ট তো আরও বাকি।

নিউ ইয়র্কের এক পাবে বন্ধুর আইফোনে উগান্ডার প্রথম অ্যাকশন মুভি Who Killed Captain Alex এর ট্রেইলার দেখছিলেন মার্কিন তরুণ অ্যালেন হফম্যান। এরপরের ঘটনা ইতিহাস। সদ্যই বান্ধবীর সাথে ব্রেকাপ হয়েছে, মেজাজমর্জি ভালো নেই। কাউকে কিছু না জানিয়ে, এমনকি উগান্ডাতেও কাউকে কিছু না বলে ওয়ানওয়ে টিকেট কেটে এসে নামলেন কাম্পালায়। পৌছলেন ওয়াকালিতে, ইসাকের বাসায়। ঘন্টাপাচেক আলোচনা হলো তাদের মধ্যে।

Wakaliwwod Hero
দ্য ডিরেক্টর অ্যান্ড দ্য অ্যাকটর

এরপরের গল্পও মজার। নিউইয়র্কের যা সহায়সম্পদ ছিল সব বিক্রি করে প্রায় ষোল হাজার ডলার নিয়ে তিনি একেবারেই চলে এসেছেন কাম্পালায়। Nkima গোষ্ঠী তাকে দত্তক হিসেবে গ্রহণ করেছে, নামে একটি আফ্রিকান পদবী যোগ করেছেন তিনি, স্যালি।

অ্যালেন স্যালি হফম্যান এখন ওয়াকালিউড তথা উগান্ডার একজন বিখ্যাত অ্যাকশন হিরো !

অ্যালেন এবং ইসাক এখন একসাথে কাজ করছেন ওয়াকালিউডকে আরও বিখ্যাত এবং উন্নত করে তোলবার ব্যাপারে। একটি সাক্ষাৎকারে ইসাক জানিয়েছিলেন এক একটি মুভি বানাতে তার খরচ পড়ে গড়ে দেড়শো – দু’শো ডলারের মত। র‍্যামন ফিল্ম প্রোডাকশনের জম্পেশ মারমার কাটকাট অ্যাকশন ফিল্ম Tebaatusasula: EBOLA বানাবার জন্য ক্রাউডফান্ডীং প্ল্যাটফর্ম কিকস্টার্টারে বিশ্বের প্রতি আবেদন করেছিলেন তারা। তাদের ফান্ডরেইজিং এর লক্ষ্যমাত্রা ছিল মাত্র ১৬০ ডলার।

বিশ্ব তাদের হতাশ করেনি। এই কিকস্টার্টার ক্যাম্পেইনে তারা সর্বমোট পেয়েছিলেন প্রায় ১৩ হাজার ডলার।

যা হোক, উগান্ডার মুভি কালচারটা একটু অন্যরকম। এখানে একজন ভি জে থাকেন, যিনি মুভি দেখে ইচ্ছামত ধারাভাষ্য দেন, অনেক সময় তার স্ট্যান্ডআপ কমেডী টাইপ ধারাভাষ্যের কারণেই মুভিটা আরও বেশি মাথানষ্ট করা হাস্যকর হয়ে যায়। আমাদের ওয়াকালিউডের মুভিগুলোর ভি জে হচ্ছেন ভি জে এমি ! সুপা ডুপা হিট ভিজে এমি !!

Who Killed Captain Alex এর যাবতীয় অ্যাকশন সিন। হাসতে হাসতে কেউ মারা গেলে দায়ী কে জানি না।

অনেক ধরণের সমস্যা তাদেরকে প্রতিনিয়তই মোকাবেলা করতে হচ্ছে, তার মধ্যে সবচেয়ে বড় হচ্ছে মার্কেটিং। উগান্ডার মানুষজন বিশ্বাসই করতে চান না, যে তাদের দেশেও সিনেমা বানানো হয়। যে কম্পিউটারে মুভিরগুলোর জন্ম, সেখানেই ব্ল্যাংক ডিভিডিতে বার্ন করে সেগুলো প্যাকেট করেন ইসাকের স্ত্রী-ছেলেমেয়েরা। আর অভিনেতারা নিজেরাই ডিভিডি বিক্রি করেন, ঘাড়ে ঝুলিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে ঘুরে। আজকাল অবশ্য দোকানেও পাওয়া যাচ্ছে তার মুভির ডিভিডিগুলো, এবং এগুলো এক সপ্তাহের মধ্যেই আবার পাইরেটেডও হচ্ছে !

Uganda Movie Theatre
উগান্ডার একটি সাধারণ ‘মুভি থিয়েটার’

তারপরও ইসাক স্বপ্ন দেখেন – টু ডেস্ট্রয় দ্য হোল ওয়ার্ল্ড ইন মুভি ! আশির দশকের চাক নরিস, স্ট্যালন আর আর্নল্ড শোয়ারজেনেগার ছিলেন তার হিরো, আর প্রিয় মুভির তালিকায় আছে কমান্ডোজ থেকে শুরু করে হালের এক্সপেন্ডেবলস। তাই তার মুভিগুলোতে ধুন্ধুমার অ্যাকশন ছাড়া আপাতত কিছু থাকছে না।

শত হাস্যকর কাহিনী, বাড়ীর রান্নাঘরের মত সেট আর স্কুলের বাচ্চাদের মত ফাইটিং এবং অবিশ্বাস্য সব সিজিআই, সব কিছু ছাপিয়ে ইসাক নাবওয়ানা আর আর ওয়াকালিউড আপনাকে দেখাবে সত্যিকারের শিল্পীর প্যাশনের জায়গাটুকু। শত সীমাবদ্ধতা, কাহিনীর অবাস্তবতা আর চটুল হাস্যরস ছাপিয়ে অভিনেতা-অভিনেত্রীদের সরলতাই চোখে ভেসে উঠবে বার বার।

সম্ভবত এখানেই শিল্প এবং তার শিল্পীদের সার্থকতা।

গল্প শেষ। নিঃশ্বাস আটকে এবার দেখে নিন দ্য এক্সপেন্ডেবলস এর ওয়াকালিউড রিমেক – অপারেশন কাকনগোলিরো’র ট্রেইলার !

আর যে মাথানষ্ট ট্রেইলার দিয়ে বিশ্বের বুকে জন্ম নিয়েছিল ওয়াকালিউড, সেই ক্যাপ্টেন অ্যালেক্স এর ট্রেইলার !

Advertisements