আমরা যারা ‘নাইনটিজ’ বা এর আগের প্রজন্ম, যাদের বেশিরভাগের বাবা-মায়েরাই শিক্ষকদের বলে আসতেন, ‘মাইর দিয়ে শুধু হাড্ডিগুলো আমাদের জন্য রেখে দিয়েন’, তাদের সবারই কবি কাজী কাদের নেওয়াজের ‘শিক্ষকের মর্যাদা’ কবিতাটা পড়া থাকার কথা, এবং সাথে নিচের ছবিটাও মনে থাকবার কথা। ভদ্রলোক ছিলেন ষাটের দশকে দিনাজপুর জেলা স্কুলের হেডমাস্টার।

এখন অবশ্য হিউম্যান রাইটস, শিশু অধিকার, কর্পোরাল পানিশমেন্ট ব্যানিং, সৃজনশীল শিক্ষা আর প্রশ্নফাসের যুগ – আমাদের মিলেনিয়ালস ছাত্র-ছাত্রী, তাদের অভিভাবক এবং শিক্ষকদের দেখবার সৌভাগ্য তার হয়নি, তাহলে সম্ভবত এই কবিতাটা আমরা পেতাম কখনোই দেখতে না।

শিক্ষকেরা সম্ভবত এখন আর মানুষের জাতে পড়েন না।

KKK
সৌভাগ্য এই যে, এই ধরণের মৌলবাদী চিন্তাচেতনা আমরা এখন আর ধারণ করি না

গণহারে প্রশ্নফাস, শিক্ষার মান এবং আমাদের শিক্ষক-ছাত্রদের নৈতিকভাবে কালেক্টিভ অবনতি এইসব কিছু বিবেচনায় অনেক প্রশ্ন মাথায় আসে সবারই, অনেক কন্সপিরেসী থিওরি’র কথাও অনেকে বলতে চান, অনেকে দেশের ভবিষ্যৎ অন্ধকার দেখতে পান। নিওলিবারেলিজমের জোয়ারে সব কিছুর মাপকাঠি যখন টাকায়, তখন যাদের হাতে ধরে আগামী প্রজন্ম উঠে আসছে, এই শিক্ষকেরা আসলে কি করছেন, ভাবছেন ?

আমার দাদা ছিলেন প্রাইমারী স্কুল শিক্ষক, আর মা হাইস্কুলের ‘মাস্টর’। আত্নীয়-স্বজন এমনকি বন্ধুবান্ধবও অনেকেই এখন সরকারী বেসরকারী কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে কাজ করছেন, দেশে এবং বিদেশে।

একসময় ‘টিচারের ছেলে’ (?!) হিসেবে আশেপাশের লোকজন কিঞ্চিৎ ভালো চোখে দেখতো। ঘোর কলিকাল নেমে আসার বছর দশেক আগেই আম্মা শিক্ষকতাকে সালাম জানিয়ে চলে আসেন। তখন দেখতাম, স্কুল লেভেলের শিক্ষকদের কত কাজ ! এলাকার গাছ গোনা, ভোটার আইডি করা, আদমশুমারী, ইলেকশনে পোলিং অফিসারগিরি থেকে শুরু করে আরও কত কাজ – বেচারার ছাত্রছাত্রীদের পড়ানোর সময় কোথায়? তাই যখন শুনি উপর মহলের নির্দেশ মোতাবেক তারা দুই রঙের কলম নিয়ে খাতা দেখতে বসছেন, ছেলেপেলে ভুল লিখলে কালো কলম দিয়ে শুদ্ধ লিখে দিয়ে এরপর লাল কলম দিয়ে মার্কিং করবার জন্য, তখন তাদের দোষ দিতে খুব বেশি ইচ্ছা করেনি।

ঢাবি’র শিক্ষাজীবনে গত পাঁচ-ছয় বছরে শহীদ মিনারে আন্দোলন করা স্কুল-কলেজ লেভেলের শিক্ষকদের দেখে এসেছি। অনশন করেছেন, পিপার স্প্রে খেয়েছেন, মারা গেছেন, আশা-নিরাশার মূলা দেখে আবার গন্ডগ্রামে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে ফিরে গেছেন, খুব বেশি উচ্চবাচ্য হয়নি তখনো। প্রাইমারী হাইস্কুল আর কলেজের ঐসব স্টুপিড লোকদের দাবীদাওয়া নিয়ে এতো চিন্তার কি আছে? প্রাইভেট পড়ায়েই তো কূল পায় না, দেশকে কি দিয়েছে তারা ? আজকে তাই সকল কনসেন্ট্রেশন দেশের সেরা ‘ইন্টেলেকচুয়ালদের’ ওপর, তিনারা সচিবদের সাথে ‘বেতন আর সম্মান’ নিয়ে পাল্লাপাল্লি করছেন, আমরা বলছি দেশ গেল, জাত গেল, সবই গেল।

এইরকম অনশন-মানব বন্ধন আন্দোলনে পিপার স্প্রেতে অসুস্থ হওয়া একজন শিক্ষক রাতের বেলা ফার্মেসীতে ঔষধের খোঁজে গেছেন, চোখে জ্বলছে, কালো চশমা লাগিয়ে রেখেছেন। এক পুরনো ছাত্রের সাথে দেখা হবার পর, ছাত্র যখন বলল স্যার রাতে সানগ্লাস কেন?

তখন সেই শিক্ষক কি বলেছিলেন, জানেন ?

আমার ছাত্ররা এতো ব্রাইট, যে আমাকে রাতেও চোখে চশমা দিয়ে রাখতে হয়।

প্রত্যক্ষদর্শীদের মুখে শোনা ঘটনাটাকে বাস্তবতার সাথে রিলেট করতে খুব বেশি বেগ পেতে হয় না। এই দরিদ্র-দুর্বল শিক্ষকদের সবচেয়ে ব্রাইট ছাত্রগুলোই প্রশাসনে বসে থেকে দাবড়ে বেড়াচ্ছে তার শিক্ষকদের, নানা পর্যায়ে, নানা ভাবে। অনুগত ভৃত্যের মত ব্যবহার করে, শিক্ষকদের সবচেয়ে বেশি অপমান করেও যে একটা দেশ ‘উন্নয়নের মহাসড়কে’ চলবার দাবী করতে পারে, এই দৃষ্টান্ত সম্ভবত বাংলাদেশ ছাড়া আর কোথাও নেই। তাই ২০১৩ সালে যারা বিশ্বে শিক্ষকদের মর্যাদা নিয়ে জরিপ করেছিলেন, তারা বাংলাদেশ আসবার সাহসই করেননি।

mymensingh
ময়মনসিংহে এইভাবে শিক্ষকদের উপযুক্ত শিক্ষা দেয়া হচ্ছে। একজন শিক্ষক এই শিক্ষার ভারে অলরেডি মৃত্যুবরণও করেছেন।  

অন্তর থেকে সম্মানের কথা যদি বলতে বলেন, একজন কুলাঙ্গার ছাত্র হিসেবে আমার স্কুল-কলেজের শিক্ষকদেরকেই মনে পড়ে বেশি, টেনে-টুনে এমএ পাস লোকটা হয়তো কোথাও ‘ভালো কাজ’ না পেয়েই না হয় স্কুলে শিক্ষকতা করতে এসেছে, কিন্তু একটা শিশুকে নতুন পৃথিবীর স্বপ্ন এই লোকটাই দেখিয়েছে, সেই পৃথিবীকে চ্যালেঞ্জ করতে শিখিয়েছে, মাটিকে পুড়িয়ে হীরায় রূপান্তর করে দিয়েছে। দেশসেরা ইন্টেলেকচুয়ালেরা সেই হীরাগুলোকে শুধু পলিশ করে দেবার সুযোগ পেয়েছেন, এর বেশি কিছু না।

এবার আরেকটা ছোট গল্প, অনলাইন মিডিয়া বা ফেসবুকে ভাইরাল হয়ে যাওয়ায় আপনারা অনেকেই দেখেছেন হয়তো বা।

BARI BHUIYAN

গত ২৬ বছর যাবৎ টাঙ্গইলের এক স্কুলে সহকারী শিক্ষক হিসেবে শিক্ষকতা করছেন ভদ্রলোক। কোন একদিন কাক ডাকা ভোরে ঢাকায় শিক্ষাবোর্ড অফিসে জেএসসি (জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট) পরীক্ষার খাতা সংগ্রহের জন্য এসেছেন। কয়েকঘণ্টা অপেক্ষার পর খাতা বুঝে পেয়েছেন। খাতা বুঝে নেয়ার পর গেট থেকে বের হওয়া পর্যন্ত বোর্ড অফিসের পিয়নদের কয়েকজনের প্রতিজনকে ৫০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত বকশিসও দিতে হয়েছে।

বোর্ড অফিসের গেটের বাইরে এসে দেখেন রিকশা নেই। মিনিট দশেক রিকশাওয়ালাকে ডাকাডাকি করলেন কিন্তু ভাড়া বেশি চাওয়ায় রিকশায় উঠলেন না। এক পর্যায়ে তাই নিরুপায় হয়ে নিজেই কুলি হয়ে একটি বস্তা মাথায় ও আরেকটি বস্তা হাতে নিয়ে হাঁটতে থাকেন তিনি।

৪শ’ শিক্ষার্থীর পরীক্ষার খাতা পেয়েছেন এই কুলি শিক্ষক, দশ দিনের মধ্যে দেখে শেষ করতে হবে। খাতা পিছু ১২ টাকা পাবেন শিক্ষা বোর্ড থেকে। তাও কবে বিল পাস হবে কে জানে ?

সৈয়দ মুজতবা আলী তো বলেছিলেনই, লাটসায়েবের কুকুরের কয় পায়ের সমান একজন পণ্ডিত? সম্ভবত এক পায়ের সমানও না। এইচএসসি পাস কম্পিউটার অপারেটর যে শিক্ষকের চেয়ে বেশি সম্মান পায় এই পৃথিবীতে ! (যদি দেখতে চানঃ গার্ডিয়ান পত্রিকায় সারা বিশ্বে শিক্ষকদের বেতন-ভাতার অবস্থা কি, এই নিয়ে একটা তুলনামূলক রিপোর্ট ছাপা হয়েছিল বছর দুই আগে)

Teacher
বিশ্বাস না করতে চাইলে এই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির অফিসিয়াল লিংকে যান

যা হোক, এই প্রাইমারী-হাইস্কুলের শিক্ষকদের যখন অপমান করা হয়েছে, আমাদের জাতির বিবেকরা বেশিরভাগই তখন নিশ্চুপ ছিলেন। এখন বেতন-সম্মান নিয়ে নিজেদের ওপর খাঁড়া আসায় তারা, এবং তাদের তাদের সাথে অতি অবশ্যই আমরা সোচ্চার হয়েছি। শিক্ষকদের প্রতি শ্রদ্ধাটুকু যদি জাতি হিসেবে আমরা হারিয়েই থাকি, সেটা উদ্ধারের জন্য গোড়ায় হাত দেওয়া দরকার ছিল, সেই সুযোগও ছিল, আমরা সম্ভবত সেটাও হারিয়েছি।

সুতরাং ঐ দুর্বল লোকগুলোর যে পরিণতি হয়েছিল, জাতির বিবেকদের এর চেয়ে খুব ভালো কিছু হবে কি না জানি না। সকল শিক্ষককেই এক মাত্রায় এনে যদি আমরা সম্মান দিতে না পারি/ বা না চাই, তাহলে কালেক্টিভলি তাদের সকলকেই অসম্মানিত হতে হবে। তবে হ্যা, সাধারণ বাঙ্গাল হিসেবে সম্মান-অসম্মানের এই লড়াইয়ে আমাদের কিছুই হবে না, এই যা বাঁচোয়া।

যার মেরুদন্ডই নেই, তার কাছে সম্মান-অসম্মান দুইই সমান !

———

………হঠাৎ কি ভাবি উঠি
কহিলেন, আমি ভয় করি না’ক, যায় যাবে শির টুটি,
শিক্ষক আমি শ্রেষ্ঠ সবার
দিল্লীর পতি সে তো কোন্ ছার,
ভয় করি না’ক, ধারি না’ক ধার, মনে আছে মোর বল,
বাদশাহ্ শুধালে শাস্ত্রের কথা শুনাব অনর্গল।

যায় যাবে প্রাণ তাহে,
প্রাণের চেয়েও মান বড়, আমি বোঝাব শাহানশাহে।

Advertisements