এই অনুবাদটি সর্বপ্রথম প্রকাশ হয়েছিল পাঠচক্র অনলাইন ম্যাগাজিনে

ইসলামী শরীয়াহ কিভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গণ-কারাবাসের অসুস্থতা দূর করতে পারে

লেখকঃ মোহাম্মদ এ আরাফা (আলেক্সান্দ্রিয়া ইউনিভার্সিটি, ফ্যাকাল্টি অফ ল, ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটি- রবার্ট এইচ ম্যাককিনি স্কুল অফ ল) এবং জোনাথন বার্নস (ডেন্টনস রিয়াদ)

আর্টিকেলটি ২৫ ইন্ডিয়ানা ইন্টারন্যাশনাল এন্ড কম্প্যারাটিভ ল রিভিউ ৩, ২০১৫ তে প্রকাশিত। খুবই চমকপ্রদ হওয়ায় এর সারসংক্ষেপ পাঠকদের জন্য তুলে দিচ্ছি।

২০১২ সালের শেষ নাগাদ এক বার্ষিক জরিপে দেখা যায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন কারাগারে পচে মরছেন প্রায় ২৩ লক্ষ মানুষ। বিষয়টার মাত্রা কেমন তা সহজে বুঝতে চাইলে কল্পনা করন, শিকাগো রাজ্যের প্রায় সব মানুষ, আয়ারল্যান্ডের সমগ্র জনসংখ্যার অর্ধেক কিংবা জ্যামাইকার পুরো দেশের সকল মানুষই কারাগারের চার দেয়ালের ভেতর আবদ্ধ।  আর এই সংখ্যাটি যত বিশালই মনে হোক না কেন, এটি কিন্তু শুধুমাত্র কারাগারে বন্দী থাকা প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর হিসাব; যেসকল শিশু-কিশোর বা বয়স্করা কারাগারের চার দেয়ালে আবদ্ধ নেই, কিন্তু অন্যান্য সংশোধন ব্যবস্থার আওতায় ‘বন্দী’ রয়েছে তাদের হিসাব এর বাইরে। সামগ্রিকভাবে এইধরণের বিচারাধীন বা সাজাপ্রাপ্ত অবস্থায় ‘বন্দী’ মানুষের সংখ্যা যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় সত্তর লক্ষের কাছাকাছি, অর্থাৎ সেখানে প্রতি ৩৫ জন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মধ্যে একজন বন্দী রয়েছেন, মোটাদাগে দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩% মানুষই কারা ব্যবস্থায় বন্দী হিসেবে দিন কাটাচ্ছেন। সুতরাং যখন আপনি জানতে পারবেন, যে নাগরিকদের গারদে ঢোকানোর দিক থেকে শীর্ষস্থানে আছে যুক্তরাষ্ট্র, প্রতি এক লক্ষ মানুষের মাঝে ৭১৬ জন বন্দী নাগরিক নিয়ে দেশটি কিউবা, চীন বা রাশিয়ার মত দেশগুলোকে পেছনে ফেলে দিচ্ছে, তখন অবাক হবার কোনই কারণ থাকতে পারে না।

একটু ভিন্ন আঙ্গিক থেকে যদি দেখা হয়, এই বিশাল কারাবাসী জনগোষ্ঠীর থাকা-খাওয়া, পরিধেয় বস্ত্র, দেখাশোনা চিকিৎসা এবং অন্যান্য ভরণপোষণের পেছনে যে ব্যয় হয়, সেটা নেহায়েত কম নয়।  ফেডারেল পর্যায়ে বার্ষিক কারা বাজেট ৬.৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে, এবং প্রত্যেক বন্দীর পেছনে বার্ষিক মাথাপিছু ব্যয়  কারাগার ও বন্দীর ভিন্নতা ভেদে  ২১,০০৬ ডলার থেকে ৩৩,৯৩০ ডলারের মধ্যে ওঠানামা করে।  স্টেট পর্যায়ে, এ সব বন্দীদের পেছনে বার্ষিক খরচাপাতির মোট পরিমাণ প্রায় ৫২ বিলিয়ন ডলার।  এই বিশাল অর্থের একটা বড় অংশ ব্যয় হয় বন্দীদের পেছনে, আর কিছু অংশ ব্যয় হয় ‘পুরো ব্যবস্থাটিকে আরও জটিল করে তোলবার পেছনে।’ অর্থাৎ, এই কারা সংশোধনী ব্যবস্থায় যারা একবার ঢোকে, তাদের নির্দিষ্ট মেয়াদের কারাজীবন শেষ করে আবার মুক্তিও পায়, তাদের পুনরায় এই কারাগারে ঢোকার সম্ভাবনা অনেকটাই নিশ্চিত, ঘূর্ণায়মান পয়সার এপিঠ-ওপিঠের মত।  যা হোক, আমাদের আলোচনার ফোকাস থাকবে পলিসি বা ব্যবস্থাপনার ওপর, প্র্যাকটিস না কার্যক্রমের ওপর নয়।  অর্থাৎ, বিচারিকভাবে শারীরিক শাস্তির ভালো-মন্দ (কর্পোরাল পানিশমেন্ট বা সোজা বাংলায় বেত্রাঘাত), কিভাবে যথাযথ তদন্ত –বিচার ছাড়াই এটি দেয়া হয় বা হচ্ছে সেটি আলোচনা আমাদের লক্ষ্য নয়, কিংবা পুরো বিচার ব্যবস্থাটিকে ঢেলে সাজানো বা অপরাধের শাস্তির বিভিন্ন প্রক্রিয়া নিয়ে একগাদা সুপারিশ পেশ করাও আমাদের জন্য খুব কঠিন।  বরং, এই নিবন্ধে শুধু আমরা সাধারণ মানুষ এবং নীতিনির্ধারকদের জন্য কিছু তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরে বিচারিকভাবে শারীরিক শাস্তি প্রদাণের মূল উদ্দেশ্যটুকু পরিস্কার করতে চাই, যা আদতে মার্কিন সমাজে বিদ্যমান কারাব্যবস্থার পেছনে ব্যয়িত আর্থ-সামাজিক খরচের বিশাল বোঝা কমিয়ে আনবার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

Incarceration_rates_worldwide

একইভাবে, এ গবেষণার দ্বিতীয় ভাগে আমরা কোন অপরাধের শাস্তি প্রদাণের পেছনে পাঁচটি সর্বজনীন উদ্দেশ্যের বিশ্লেষণ করবো, এবং বিচারিকভাবে শারীরিক শাস্তি প্রদাণের একটি যুতসই সংজ্ঞা দেবার চেষ্টা করবো। এ লক্ষ্যে বিদ্যমান মার্কিন আইন এবং ইসলামি আইন ব্যবস্থায় বিচারিকভাবে শারীরিক শাস্তি প্রদাণের বিধিগুলোর একটি তুলনামূলক পর্যালোচনা করা হবে। এই অংশে আমাদের অনুসিদ্ধান্ত হচ্ছে, যদিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থা থেকে কার্যত শারীরিক শাস্তি বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে, কিন্তু মার্কিন সংবিধানের অষ্টম সংশোধনী শারীরিক শাস্তি প্রদাণকে একেবারে নিষিদ্ধ করে দেয় নি। তৃতীয় ভাগে আমরা ইসলামী অপরাধ বিচার আইনে শারীরিক শাস্তি প্রদাণ ব্যবস্থার ‘প্রচলিত খারাপ দিক’গুলো পরীক্ষা করে দেখাতে চেষ্টা করেছি। আমাদের অনুসিদ্ধান্ত হচ্ছে, ইসলামী বিচার ব্যবস্থায় পরিচালিত শারীরিক শাস্তির বিধানগুলোর কার্যকারিতা বেশি, খরচ কম এবং তা প্রচলিত কারাগার সংশোধন ব্যবস্থার চেয়েও বেশি মানবিক।  সবশেষে, চতুর্থ ভাগে এসে আমরা এই নিবন্ধে যা কিছু অপ্রত্যাশিত এবং ‘বিতর্কিত’ বিষয় আলোচনা হয়েছে, তাকে একটি বাস্তবতামুখী দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচনা করবার চেষ্টা করেছি।  এটা ঠিক যে, সুস্থ চিন্তার কোন মানুষ অবশ্যই অন্য একজন মানুষের ওপর শারীরিক শাস্তি বা নির্যাতনের বিষয়টি অনুমোদন করতে পারেন না, এধরনের চিন্তাও হয়তো অ্যাপারেন্টলি অমানবিক, পশ্চাৎপদ এবং বর্বর বলে মনে হয়। তবে, বিদ্যমান কারা ব্যবস্থার জটিলতা এবং এর অবশ্যম্ভাবী ফসল হিসেবে পারিবারিক ভাঙ্গন, কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা হ্রাস এবং সাধারণ মানুষের ট্যাক্সের বোঝা বৃদ্ধির কথা যদি সামগ্রিকভাবে বিবেচনা করা হয়, তাহলে কারান্তরালে ধুঁকে সংশোধনের এই ব্যবস্থাটি পুরো মার্কিন সমাজের জন্য অনেক বেশি অমানবিক বলেই প্রতীয়মান হয়।

মূল প্রবন্ধটি পড়তে – http://papers.ssrn.com/sol3/papers.cfm?abstract_id=2722140

Advertisements