ভাবুন একবার, লোকাল বাসে বৃষ্টির মধ্যে ঝুলতে ঝুলতে আপনি কল্পনা করছেন নিজেকে নিয়ে, যে কল্পনার রাজ্যে আপনিই সম্রাট এবং একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী। তবে একটু পরেই হয়তো কর্কশ বাস্তবতা, হেল্পারের ডাক কিংবা বস-টিচার বা বৌয়ের রিংটোনের আঘাতে কল্পনা কেটে যায়, দিবাস্বপ্ন ছেড়ে আপনি ফিরে আসেন দেবার স্বপ্নে, এ পৃথিবীর সবাই আপনার কাছ থেকে আরও চায়, আরও চায় এবং আরও চায়।

W Mitty 4

এইরকম কল্পনা আমাদের অনেকেরই থাকে, আর ইন্ট্রোভার্ট বা চুপচাপ অন্তর্মুখী ধরনের মানুষ হলে তো কথাই নেই।

আর তাই, বাস্তব জীবনে ভীতু আর ম্যাড়ম্যাড়ে জীবনযাপন করা কল্পনাপ্রবণ অন্তর্মুখী ‘বোকা’ মানুষটা যখন কল্পনার অতিমানব থেকে বাস্তবের সাহসী অভিযাত্রীতে পরিণত হয়, তখন মনের মধ্যে বিশ্বাস খাঁটি হয়, আমিও হয়তো পারবো। দ্য সিক্রেট লাইফ অফ ওয়াল্টার মিটি, ঠিক এরকমই একটা গল্প। একজন ছাপোষা মানুষের জীবনকে খুঁজে পাবার গল্প, নিজেকে চেনার গল্প আর বিশ্বকে চ্যালেঞ্জ জানাবার গল্প।

ওয়াল্টার মিটি বিশ্বখ্যাত “লাইফ” ম্যাগাজিনের একজন নেগেটিভ এসেটস (ফটোগ্রাফের নেগেটিভ) ম্যানেজার, এককথায় ছাপোষা কেরানী। খুবই সাধারণ তাঁর জীবন, তবে আর সব অন্তর্মুখী মানুষের মত সে মনে মনে সবসময়ই নিজেকে একটা অ্যাডভেঞ্চারাস জীবনের হিরো হিসেবে  কল্পনা করে। কাজের মাঝেই ভালো লাগে একজন মানুষকে, মেয়েটাকে অনলাইনে একটা উইঙ্ক মানে ‘চোখটিপ্পনি’ পাঠাতেই তার নাভিশ্বাস উঠে যায়। এরমধ্যে তার আটপৌরে জীবনে নেমে আসে বিপত্তি, লাইফ ম্যাগাজিনের পরিচালনা বোর্ড পুরো ম্যাগাজিনটিকে অনলাইনে নেবার সিদ্ধান্ত নেয়, এবং এর শেষ ‘প্রিন্ট এডিশন’ এর  প্রচ্ছদের জন্য বিখ্যাত ফটোগ্রাফার শন ও’কনেল এর তোলা একটা ফটো খুঁজতে গিয়েই দেখা যায় বিপত্তি। ওয়াল্টার এর কাছে শন নিজেই পাঠিয়েছিলেন ছবিটা, কিন্তু কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়না। ওয়াল্টার কি পারবে সেই ছবি উদ্ধার করতে? নাকি লাইফ ম্যাগাজিনের দীর্ঘ কর্মজীবন শেষ হবে ব্যর্থতা নিয়ে? এই এক  ফটোগ্রাফ এর নেগেটিভই তার জন্যে অনেক বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়ায়।

এবং এরপরেই শুরু হয় মুভির মূল ‘দৌড়’। এই নেগেটিভ খুঁজতে শন এর শিডিউলের পেছন পেছন ওয়াল্টার মিটি বেরিয়ে পড়ে আইসল্যান্ড, গ্রীণল্যান্ড, নর্থ সি,  জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরি, কিন্তু প্রতিবারেই একটুর জন্য সে মিস করে যায় শনকে। শেষ পর্যন্ত আফগানিস্তানের দুর্গম নোশাক পর্বতমালার সর্বোচ্চ চূড়ো পেরিয়ে অতিবিরল হিমালয়ান নেকড়ের ছবি তোলার জন্য ধ্যানমগ্ন শনের দেখা পায় সে।

তারপর কি হলো ? যার জন্য সারা পৃথিবী দাবড়ে শনের কাছে এলো ওয়াল্টার মিটি, সে আসলে কোথায় ছিল ?

এইদিকে একদম নিরামিষ ঘরানার ওয়াল্টার মিটির সোশ্যাল মিডিয়ার সাদামাটা প্রোফাইলে তেমন কোন সাড়াশব্দ পড়তো না। আর এই অ্যাডভেঞ্চারগুলো প্রকাশ হতে থাকার পর তার প্রোফাইলটিই হতে উঠলো সেই সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানীর অন্যতম অ্যাসেট। তবে, আগে যে মানুষটা অন্যের কাছ থেকে অ্যাপ্রিসিয়েশন পাবার জন্যে হন্যে হয়ে থাকতো, এই বড় অর্জনের ফলেও তার কোন বিকার দেখা যাচ্ছে না।

কারণ, জীবনের সত্যিকারের অর্থ সে খুঁজে পেয়েছে।

W Mitty 2

আবার, যে একটি মাহেন্দ্রক্ষণের জন্য শন ও’কনেল দিনের পর দিন হাজার মিটার উঁচু বরফ চূড়োয় ক্যামেরা চোখে লাগিয়ে বসে ছিল, সেই সময়ও এলো। ক্ষণিকের জন্য দেখা দিল স্নো-লেপার্ড, কিন্তু শন আর শাটার চাপেনি ক্যামেরার। যে ছবি চোখে আর মনে আঁকা হয়ে যায়, তার পরিতৃপ্তি কোন ক্যামেরা দিতে পারে না।

Walter Mitty: When are you going to take it?

Sean O’Connell: Sometimes I don’t. If I like a moment, for me, personally, I don’t like to have the distraction of the camera. I just want to stay in it.

Walter Mitty: Stay in it?

Sean O’Connell: Yeah. Right there. Right here.

অসাধারণ কিছু লাইফ-মেসেজ দেবার পাশাপাশি এই সিক্রেট লাইফ অফ ওয়াল্টার মিটি’র সবচেয়ে বড় বিষয়টি সম্ভবত এর সিনেমাটোগ্রাফি। সিনেমাটোগ্রাফার স্টুয়ার্ট ড্রাইবার্গের তত্ত্বাবধানে ওয়াল্টার মিটির অভিযানগুলো হয়ে উঠেছে শ্বাসরুদ্ধকর, যার কিছু ছিল তার দিবাস্বপ্ন, আর কিছু ছিল সেই স্বপ্ন তাড়া করবার দৌড়। লিড রোলে বেন স্টিলার এবং ফটোগ্রাফার শন ও’কনেল এর চরিত্রে শন পেনের দুর্দান্ত অভিনয় ছাড়াও যেটা ভালো লেগেছে, তা হচ্ছে “পরিচালক” হিসেবে বেন স্টিলারের কাজ, শট টেকিং এবং প্যানারোমিক লোকেশনের চিত্রায়নগুলো সত্যিই অসাধারণ। আর এর সবকিছুকে পূর্ণতা দিতে রয়েছে অসাধারন কিছু সাউন্ডট্র্যাক।

W Mitty 3

১৯৩৯ সালে লিখা জেমস থারবারের একই নামের এই ছোট গল্পের মুভি অ্যাডাপ্টেশন হিসেবে দ্য সিক্রেট লাইফ অফ ওয়াল্টার মিটি নিঃসন্দেহে বেন স্টিলারের সেরা কাজগুলোর একটা, রেটিং দেখলে অবশ্য সেটা বিশ্বাস হবে না। (আইএমডিবি’তে সাড়ে সাত, রটেন টম্যাটোজে ৫০% ফ্রেশ; তবে এই মুভির কাল্ট জনপ্রিয়তার কথা স্বীকার করা হয়েছে) এর চেয়ে বরং নিজেই দেখে যাচাই করে নিন ! শত শত মুভির মধ্যে কিছু মুভি আমাদের কাঁদায়, কিছু মুভি হাসায়, আর কিছু মুভি ভাবতে শেখায়। তবে এমন কিছু মুভি আছে যা শুধু মনে দাগ কেটে যায়। সিন বাই সিন নায়কের জায়গায় আপনি কল্পনা করতে পারেন অতি-সাধারণ, আটপৌরে জীবনের এই আপনাকেও।

তবে হ্যা, ‘সাধারণ’ মানুষ অসাধারণ কাজ করলেও তার যে কাজটা তাকে সতিই অসাধারণ করে তোলে, সেটা হচ্ছে বিনয়, বা হিউমিলিটি। অনেকটা সত্যজিৎ রায় বোম্বাইয়ের বোম্বেটে’তে ভিক্টর পেরুমলের ব্যাপারে যেভাবে বলেছিলেন – এতোবড় কাজ করেও তার মধ্যে কোন তাপ-উত্তাপ নেই,  ওয়ান-টু-থ্রি বলে আবার শুরু করে দিয়েছে প্র্যাকটিস……

এখানেও ওয়াল্টার মিটিও ফিরে আসে তার মা, বোন এবং ভালোবাসার মানুষের কাছে। সিনেমার নায়কদের সাথে বাস্তবের নায়কদের এটিই পার্থক্য। আর এখানেই ওয়াল্টার মিটি হয়ে ওঠে আমার-আপনার মতই একজন…… সাধারণ মানুষ !

ডাউনলোড করে নিন এখান থেকে – The Secret Life of Walter Mitty (2013)

আর ট্রেইলার দেখতে চাইলে – https://www.youtube.com/watch?v=HddkucqSzSM

“To see the world, things dangerous to come to, to see behind walls, draw closer, to find each other and to feel. That is the purpose of life.”

The Secret Life of Walter Mitty (2013)

মুভিটির থিম কি ? স্বপ্ন ‘দেখা’ বাদ দিয়ে স্বপ্নে বাচুন !

The-Secret-Life-of-Walter-Mitty1

 

 

 

Advertisements