Movie Review : মহাপুরুষ (১৯৬৫)

ধর্মের প্রতি মানুষের সরল বিশ্বাস আর অনুভূতিকে পুঁজি করে ধান্দাবাজী আর ব্যবসার ইতিহাস তো অনেক আগ থেকেই সমাজের নানাস্তরে নানাভাবে বিদ্যমান। এগুলোকে এক্সপোজ করার দায়িত্ব কার, আর কিভাবেই বা সেটা করা যায়? আজকে ভারতে ওহ মাই গড বা পিকে মুভি আসবার পর অনেকটাই যেন নতুন জোয়ার এসেছে এই আন্দোলনে, তবে পঞ্চাশ বছর আগেকার একটা ছোট্ট সাদাকালো মুভি এই বিষোয়ে কথা বলে গেছে, হয়তো অনেকেই সেটা খেয়াল করি নি। বাংলা সাহিত্যে অসাধারণ বুদ্ধিদীপ্ত বাট রসালো ছোটগল্প লিখে জনপ্রিয় হয়েছিলেন রাজশেখর বসু, যাকে আমরা সবাই চিনি ‘পরশুরাম’ নামে। পরশুরামের এরকমই একটি গল্প ‘বিরিঞ্চি বাবা’র মুভি অ্যাডাপ্টেশন করেছিলেন আর কেউ নন, স্বয়ং সত্যজিৎ রায়।

১৯৬৫ সালে একই সাথে কাপুরুষ ও মহাপুরুষ নামের একটি জয়েন্ট মুভি নির্মাণ করেন সত্যজিৎ রায়। ‘কাপুরুষ’ গল্পের কাহিনী ছিল প্রেমেন্দ্র মিত্রের, ত্রিভূজ প্রেমের সেই সাইকোলজিক্যাল থ্রিলারে ছিলেন মাধবী মুখার্জি এবং সৌমিত্র, দুর্দান্ত অভিনয় আর টুইস্টেড গল্প। আর এরপরেই আসে ‘মহাপুরুষ’, যাতে ছিলেন সন্তোষ দত্ত, রবি ঘোষ, সোমেন বোস এবং চারুপ্রকাশ ঘোষের মত শক্তিমান অভিনেতারা।

Mohapurush 4

তবে আজকের কথা কেবল ‘মহাপুরুষ’কে নিয়েই…… খুব বেশি আলোচনা হতে দেখা যায় না মুভিটাকে নিয়ে, তবে আমার কাছে সহজ সরল ঋজু বক্তব্য এবং অসাধারণ মেকিং এর জন্য খুবই ভালো লেগেছে।

কাহিণীঃ কাশী থেকে ফেরবার পথে বুড়ো অ্যাডভোকেট গুরুপদ মিত্তিরের সাথে ট্রেনে পরিচয় ঘটে আধ্যাত্মিক ‘বিরিঞ্চি বাবা’র, যিনি কাশী পত্তনের সময় থেকে আজকে পর্যন্ত সগৌরবে বিরাজমান; কাজের ফাকে ফাকে প্রতি সকালে সূর্যকে ডেকে তোলা তার অন্যতম কাজ, তা নইলে যে দিন হবে না ! তার এইসব নানারকম ভেলকিবাজীতে মুগ্ধ হয়ে গুরুপদ তাকে বাসায় আমন্ত্রণ জানান শিষ্যত্ব গ্রহনের জন্য।

এইদিকে পাড়ার ছোকরা সত্যনারায়ণ ঘোরাঘুরি করছে গুরুপদের ছোটকন্যা বুঁচকি দেবীর মন পাবার আশায়। তাকে এই কাজে খুব স্মার্ট বলা চলে না যদিও, তবে সে নাছোড়বান্দাও বটে।

বুঁচকিঃ সাত লাইনের চিঠি, দু’লাইন শেলী দু’লাইন চন্ডীদাস আর দু’লাইন শেষের কবিতা। আর, কেমন আছো ভালো আছি। এই তোমার ভালোবাসা ?

যা হোক, সত্য উড়ে এসে জুড়ে বসা এই বিরিঞ্চি বাবার সব খবরাখবর পৌছে দেয় তার মেসে, যেখানে নিবারণ’দা আছেন, আছে বামপন্থী ইন্স্যুরেন্সের দালাল পরাগ যে কি না ইন্টেলেকচ্যুয়াল সাধণায় ব্যস্ত, আর আছেন নিত্য অর্থাভাব রোগে ভোগা নিতাই’দা। তারা খবরাখবর পান, বিরিঞ্চি বাবার বয়স কেউ বলতে পারে না তবে, প্লেটো, গৌতম বুদ্ধ আর যীশুর সাথেও নাকি তার একাধিকবার তর্ক হয়েছিলো, এবং চেকোস্লাভিয়াতে সাধণা করবার এক ফাঁকে E=mc2 সূত্রটা নাকি তিনিই আইনস্টাইনের মাথায় ঢুকিয়েছিলেন। যথারীতি বাড়তে থাকে তার ভক্ত সংখ্যা, লোকের আনাগোনা আর ফুলে ফেপে উঠতে থাকেন বাবা এবং তার প্রাচীণ ব্যবিলন থেকে কুড়িয়ে পাওয়া সহচর।  বুঁচকি সত্য’কে শর্ত দেয়- যদি সে এই বিরিঞ্চি বাবাকে বাসা থেকে তাড়ানোর কোন পথ বের করতে না পারে, তাহলে সেও প্রেম বিসর্জন দিয়ে বাবার শিষ্যত্ব গ্রহন করবে।

Mohapurush 3

এইবেলা ক্লাইম্যাক্স, সত্যনারায়ণের প্রেম এবং ঠকবাজের মুখোশ উন্মোচন, সব মিলে এগিয়ে আসেন নিবারন’দা এবং তার মেসনিবাসী গ্রুপ। কিভাবে তারা কাজটি করলেন, আদৌ কি বিদেয় হলেন বাবাজি ? মাত্র ৬৫ মিনিটের মুভিখানা ইউটিউবে দেখেই না হয় জেনে নিন !

তবে সন্দেহ নেই, আর সব ঠকবাজের মত বিরিঞ্চি বাবাও অতি ধুরন্ধর, পড়াশোনা জানা লোক, চমৎকার অভিনয় জানেন এবং ভালো কথা বলতে জানেন, তার কথায় কোয়ান্টাম থিওরীর আভাস পাওয়া যায় কি ? চারুপ্রকাশ ঘোষ এই বিরিঞ্চি বাবাকে কি জীবন্তভাবে উপস্থাপন করেছেন সেটা না দেখলে বোঝা যাবে না।

কাল অতি বিচিত্র বস্তু
কথায় বলে, ‘আজ আছি, কাল নাই’
আমি বলি, ‘কাল আছে,আজ নেই’
কাল অর্থাৎ সময় ,টাইম। কাল আছে , কিন্তু আজ…… অর্থাৎ বর্তমান, বর্তমান বলে কিছু নেই।
কি করে থাকবে ? এ্যা, কি করে থাকবে ?
যা ভবিষ্যত, যা ভবিতব্য, তা যখন ঘটলো, সে তো আর ঘটে এক জায়গায় থেমে রইলো না যে তাকে বর্তমানের লেবেল দিয়ে ,পায়ে শিকল এঁটে ধরে রেখে দেবে, আর ধরে দিয়ে বলবে, এই দেখো, এই হলো বর্তমান। কটা দিন ফুরিয়ে গেলো, অমনি তা হয়ে গেলো ঘটেছে, বা ঘটে গেছে, বা ঘটেছিলো।

অর্থাৎ অতীত, ভূত !

এই নিয়ে প্লেটোর সংগে আমার কতো কথা কাটাকাটি। প্লেটো বললে, ‘ইফ নিউম্যান লোগাস কগনোসিস’- তোমার কথা আমি বুঝতে পারছিনা। ‘ভিক্টস জারগন প্যারানয়ন’- তুমি আবোল তাবোল বকছো !

আমি বললাম,বেশতো…তুমি বুঝতে না পারো,আমার কথা যদি বুঝতে না পারো,তো আমি সংকেতে বুঝিয়ে দিচ্ছি।

প্লেটো বললো, ‘ওরে বাবা, কি সংকেত?’ বড় ভয় পেত আমাকে !

আমি বললুম, ভয় কি প্লেটো?খুব সহজ। এই দেখো, এই আমার ডান হাত,এই অনামিকা,এই ঘুরলো ডান দিকে, ক্লকওয়াইজ অর্থাৎ সময় যে দিকে যায় সেই দিকে। সময় কোন দিকে যায়? ভবিষ্যতের দিকে। আর এই বা হাত,এই ঘুরলো বা দিকে,এ্যান্টিক্লকওয়াইজ অর্থাৎ যা ঘটে গেছে তার দিকে। ভূত। আর এই ঘুরলো এক সাথে…………

ভক্ত দাস চরিত্রে রবি ঘোষ, ঘাস সিদ্ধ করে দেশের অন্নাভাব দূর করতে বদ্ধপরিকর তোতলা বৈজ্ঞানিক চরিত্রে সন্তোষ দত্ত কিংবা নিবারণ’দার ভূমিকায় সোমেন বোস, অভিনয় ছিল সবারই দুর্দান্ত; তবে সব কিছু ছাপিয়ে সত্যজিৎ রায়ের ক্যামেরার কাজ এবং ডায়ালগ, এর কোন তুলনা হয় না।

মামাঃ বাবাজি কাশীর পত্তনের সময়ে সরাসরি উপস্থিত ছিলেন।

সত্যঃ বাব্বাহ, তান্ত্রিক নাকি ?

মামাঃ তান্ত্রিক না হলেও ধনতান্ত্রিক তো বটেই ! তুমি তো আবার কম্যুনিস্ট হে, এইসব বুঝবে না !!

Mohapurush 1

আর তার চেয়েও ইন্টরেস্টিং, এইরকম ঠান্ডা মাথার মেস নিবাসী ‘ক্লাসি’ প্রবলেম সলভিং বাঞ্চ বাংলা সিনেমায় খুব একটা দেখা যায় না, খুবই ছোট পরিসরে হলেও সত্যজিৎ তুলে চরিত্রগুলোকে তুলে এনেছেন খুব দুর্দান্তভাবে।

Mohapurush 5

সব মিলিয়ে, খুব সিম্পল গল্প, সত্য-বুঁচকির প্রেম আর এক বাবাজির ধোকাবাজির মূলোৎপাটন, অথচ মুভিটা একটানে দেখে ফেললে ভালোলাগা রয়ে যাবে দীর্ঘক্ষণ !

যা হোক, ৬৫ মিনিটের পুরো মুভিটা ভালো প্রিন্টেই আছে ইউটিউবে, দেখে নিন –   

ইউটিউব লিঙ্ক- https://www.youtube.com/watch?v=NUj6OFW40sE

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

w

Connecting to %s