ছোট দেশ পানামা’তে বসেই তারা সুরক্ষা দিতেন বিশ্বের যাবতীয় হোমড়া-চোমড়াদের, দ্য রুলিং এলিট, দ্য সৌভাগ্যবান ১% অফ দ্য ওয়ার্ল্ড এবং তাদের যাবতীয় ধন সম্পদের। অফশোর ব্যাংকিং এবং ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস প্রদাণের মাধ্যমে পানামার ল ফার্ম মোসাক ফনসেকা যে সকল মানুষদের এবং কোম্পানীকে ট্যাক্স এবং অন্যান্য সকল ধরণের শ্যেনদৃষ্টি  থেকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন, তাদের নাম-ধাম সহ বিশাল এক তথ্যভান্ডার (প্রায় ১১ মিলিয়ন ডকুমেন্ট, যার সাইজ প্রায় আড়াই টেরাবাইট) ফাস হয়েছে গতকাল, যাকে বলা হচ্ছে ২০১০ এর উইকিলিকস এর তথ্যফাঁস (দেড় গিগাবাইট)  কিংবা ২০১৩ সালের এড স্নোডেনের ফাঁস করা তথ্যের (২৬০ গিগাবাইট) চেয়েও অনেক অনেক বড় – এযাবৎ কালের মধ্যে সবচেয়ে বড় তথ্যফাঁসের ঘটনা।

১৯৭৭ সালে পানামার রাজধানী পানামা সিটিতে ইউরগেন মোসাক এবং র‍্যামন ফনসেকা নামের দু’জন আইনিজীবি এই ল ফার্মটি প্রতিষ্ঠা করেন, যারা মূলত কমার্শিয়াল ল এবং এই সংক্রান্ত কাজকর্ম করে থাকে, সাথে ইন্টেলেকচুয়াল প্রোপার্টি এবং মেরিটাইম আইনের বিষয়েও তাদের কাজ আছে। তবে এটি একটি মুখোশ মাত্র, তাদের মূল কাজ হচ্ছে কর্পোরেট জগত নিয়ন্ত্রণ করা, এবং পানামার অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং কর্পোরেশনকে তারা ‘বেঁড়ে উঠতে’ সাহায্য করেছেন এবং এখনও করছেন। মোসাক ফনসেকা ল ফার্মটি গার্ডিয়ান পত্রিকার মতে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অফশোর ল ফার্ম, যাদের আমেরিকা, ইউরোপ এবং এশিয়া মিলিয়ে বিশ্বের ৪০টি দেশে অফিস রয়েছে। বলা হয়, সারা বিশ্বের প্রায় ৩ লক্ষাধিক কোম্পানি এবং ব্যক্তির ট্যাক্স সুরক্ষা ও অন্যান্য বিষয়ে তারা সার্ভিস প্রদাণ করেছেন।

প্রশ্নঃ অফশোর ব্যাংকিং কি?

উত্তরঃ সহজ বাংলায়, নিজের দেশের বাইরে অন্য দেশের ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে টাকা জমা রাখাই অফশোর ব্যাংক, আমরা যেটাকে চলতি ভাষায় সুইস ব্যাংকে টাকা রাখা বলে থাকি। এইধরণের অফশোর ব্যাংকিং ও অন্যান্য কর্পোরেট সার্ভিস দেবার মত প্রতিষ্ঠান বিশ্বে অনেকগুলো আছে। সুপার-রিচ বা বিশ্বের প্রভাবশালী ও সম্পদশালী মানুষেরা মূলত দু’টি কারণে এইধরণে অফশোর অ্যাকাউন্টে তাদের বিলিয়ন ডলারের সম্পদ রেখে থাকেন – অচিন্তনীয় গোপনীয়তা এবং সুরক্ষা, পাশাপাশি ট্যাক্স ফাঁকি দেয়া। অফশোর আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের ক্লায়েন্টদের নাম-পরিচয় সম্পদের বিবরণী সম্পূর্ণ গোপন রাখে, যেটার সূত্রপাত হয়েছিল ১৯৩৪ সালের সুইস ব্যাংকিং আইনের মাধ্যমে।

যেভাবে ফাঁস হলো এই বিশাল তথ্যভাণ্ডার

এক বেনামী সূত্র এই বিশাল তথ্যভান্ডারের ফাইলগুলো (আড়াই টেরাবাইট) জার্মানির পত্রিকা স্যুডোয়েচ শাইতুং এবং ওয়াশিংটনভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল কনসোর্টিয়াম অফ ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্ট এর হাতে তুলে দেয়। এছাড়াও, বিশ্বের ৮০টি দেশের ৪০০ জন সাংবাদিক এবং ১০৭টি নিউজ এজেন্সীর মাধ্যমেও এই বিশাল তথ্যভাণ্ডার বিশ্লেষণ এবং যাচাই-বাছাই করা হয়, এবং এই সংক্রান্ত প্রথম রিপোর্টটি প্রকাশ হয় গতকাল, ৩রা এপ্রিল ২০১৬ তারিখে। তবে, এই বিশাল তথ্য বিশ্লেষণ এবং যাচাই বাছাই শেষে মে মাষের প্রথম সপ্তাহে আরও বিস্তারিত রিপোর্ট প্রকাশ হবার কথা রয়েছে, যেখানে এই ধরণের কাজের সাথে সম্পৃক্ত সকল মানুষ এবং প্রতিষ্ঠানের নাম-তালিকা প্রকাশ করা হতে পারে।

এখন পর্যন্ত কাদের নাম উঠে এসেছে এই তথ্যফাঁসে?

যে তথ্য ফাঁস করা হয়েছে, তা ১৯৭৭ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত, তাতে অনেক নাম আসলেও খুব বেশি অবাক হবার মত না বিষয়গুলো। আমাদের যারা শাসক, রুলিং এলিট এবং শাসকদের সৌভাগ্যবান পরিবার-পরিজন বন্ধুবান্ধব, তাদের অনেকেরই নাম চলে এসেছে (মোট ১৪০ জন) এই সুরক্ষিত গোপনীয় আর্থিক ব্যবস্থাপনার বেড়াজালে। এদের মধ্যে ভ্লাদিমির পুতিন আছেন, পাকিস্তানের নওয়াজ শরীফ আছেন, সৌদি বাদশাহ সালমান আছেন, মধ্যপ্রাচ্য এবং দক্ষিণ আমেরিকার শাসকেরা আছেন। আরও আছেন ফিফার সাম্প্রতিক অর্থ কেলেংকারীতে ফেঁসে যাওয়া শীর্ষ ফুটবল কর্মকর্তারা, আরও নাম আছে ফুটবল সুপারস্টার লিওনেল মেসির। সর্বমোট ফাঁস হওয়া এই সাড়ে ১১ মিলিয়ন অর্থাৎ প্রায় কোটিখানেক ডকুমেন্টের মধ্যে ভারত এবং ভারতীয় নাগরিকদের নিয়ে ফাইল আছে প্রায় ৩৭,০০০। তবে বাংলাদশের কে কে আছেন বা আদৌ কেউ আছেন কি না এ নিয়ে এখনও বিস্তারিত জানা যায় নি।

আপডেটঃ সাংবাদিক ডেভিড বারগম্যানের এই রিপোর্টে উঠে এসেছে বাংলাদেশ রুলিং এলিট সার্কেলের কে কে এই ধরণের অফশোর অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করতেন।

যে যে দেশের নাম এসেছে –

PP 3

যে সকল মানুষের (রাজনীতিবিদ/ শাসক) নাম এসেছে –

PP 1

PP 2

এই ধরনের অফশোর ব্যাংকিং এবং অর্থ সুরক্ষা ব্যবস্থার আইনি যৌক্তিকতা কি?

তবে একটা বিষয় মাথায় রাখা প্রয়োজন, অফশোর ব্যাংকিং বা এই ধরনের গোপনীয় অর্থ সুরক্ষা কিন্তু অবৈধ নয় (আইনী সুরক্ষার বিষয়টা অবশ্য দেশ থেকে দেশে ভ্যারি করে। যে সব দেশে ট্যাক্স ব্র্যাকেট বেশি, অন্যান্য সুযোগ সুবিধা পাওয়া যায় সেইসব অনুন্নত ছোট দেশেই সাধারণত এই ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ করে)। রাশিয়া বা পূর্ব ইউরোপ সহ বিশ্বের অনেক দেশের বড় বড় ব্যবসায়ীরাই এই ধরনের সার্ভিস গ্রহণ করে থাকে, ট্যাক্স সুবিধা পাওয়া ছাড়াও এতে তাদের অর্থ মাফিয়া বা অন্য যে কোন শত্রুর হাত থেকে নিরাপদও থাকে। সমস্যা বাঁধে তখনই, যখন এখানে অর্থ জমা করা মানুষগুলোর কোন দৃশ্যমান সোর্স অফ ইনকাম দেখা যায় না, যেমন রাজনীতিবিদগণ, বা তাদের পরিবার পরিজন।

অতঃপর দীর্ঘশ্বাস……

উপরে যা যা কথাবার্তা আলোচনা করা হলো, এর সবই একদম অ্যাকুরেট তথ্য দিয়ে না হলেও, মোটামুটি আমাদের সবারই জানা। বাংলাদেশের মানুষ হিসেবে গত কয়েক বছরে অর্থ কেলেংকারী এবং সাম্প্রতিক বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘটনার পর এই ধরণের অতি সফিস্টিকেটেড অর্থনৈতিক কারচুপির বিষয়গুলো আমাদের কাছে ভোঁতা লাগবে, কারণ আমরা ডিসেনসেটাইজড – দেশের মানুষের হাজার কোটি টাকা চলে গেলেও তাতে কিছু আসে যায় না। হাওয়ার উপরে বিশ্বের ১% সৌভাগ্যমান মানুষ কি করছেন না করছেন তাতে ৯৯% ‘আদারস’ জনগোষ্ঠীর মাথা না ঘামালেও চলবে।

শুধু আমাদের চোখটুকু খুললেই হয়, যেখানে অনেকেই অন্ধবিশ্বাস রাখেন তার শাসকদের ওপর, তাদের ‘দুর্নীতিবিরোধী অভিযান’ এর বয়ানের ওপর। মাঝেমধ্যে এইধরণের টুকটাক ঘটনা দুর্ভাগ্যক্রমে সামনে এসেই পড়লে  আসলে সেগুলো কন্সপিরেসী থিওরী বলে উড়ীয়ে না দিয়ে, একটু চিন্তাভাবনা করা প্রয়োজন।

আপাতত সেটুকুতেই চলবে।

পুরো তথ্য এবং এর যাবতীয় আপডেট পেতে – দ্য পানামা পেপারস

 

Advertisements