ভ্রমণ ইন্দোনেশিয়া – ঢাকা টু জাকার্তা সাতকাহন…..

ডিসক্লেইমারঃ এটা সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে…… আমি কোন এক্সপার্ট নই। এখানে যা যা বলা হয়েছে আপনার সাথেও তা তা হবে সেটা নাও হতে পারে।

প্রসঙ্গ এক – ভিসা বৃত্তান্ত

ইন্দোনেশিয়ায় আমাদের জন্য ৩০ দিনের নন-এক্সটেন্ডেবল ভিসা সম্পূর্ণ অন-অ্যারাইভাল। ঢাকায় ইন্দোনেশিয়ার এমব্যাসিতে আপনি কাগজ জমা দিতে চাইলেও সেটা তারা নিবে না। আমাদের এয়ারপোর্টেও কোন ঝামেলা নাই যদি আপনি ইতোপূর্বে কোথাও গিয়ে থাকেন। ফ্রেশ পাসপোর্টে অন অ্যারাইভালের উদ্দেশ্যে ইন্দোনেশিয়াতে যেতে – প্রথমত, এয়ারলাইন্স বোর্ডিং পাস ইস্যু নাও করতে চাইতে পারে (কারণ কোন কারণে আপনাকে ডিপোর্ট করা হলে তাদেরকেই আবার আপনাকে ফিরিয়ে আনতে হবে), এবং দ্বিতীয়ত, ইমিগ্রেশন পুলিশও গাঁইগুই করতে পারে। তবে খুব বেশি সমস্যা হবার কথা না এইখানে, সহজেই ইমিগ্রেশন পুলিশের প্রাণকাড়া সেই ‘খটাং’ সিল মারার শব্দটা আপনার জানে পানি নিয়ে আসবে।

Jakarta 03

জাকার্তায় সুকর্ণ-হাত্তা এয়ারপোর্টে আমি নামার পর লাইনে দাঁড়ালাম, ধুমধাম একে একে সিল নিয়ে নানা জাতের মানুষেরা সবাই ঢুকে যাচ্ছেন। কিন্তু কবি বলেছেন, তুমি যাও বঙ্গে, কপাল যায় সঙ্গে…… অতএব ‘বাংলা’ (তিনারা বাংলাদেশি বলে না দেখলাম, বলে বাংলা) পাসপোর্ট হবার কারণে হাসিখুশী ইমিগ্রেশন অফিসারের ‘ফলো মি প্লিজ’ মোতাবেক এগিয়ে গেলাম। রুমে বসায়ে জিজ্ঞাস করলো কি করি কেন আসছি কয়দিন থাকবো, এরপর আবার সেই প্রাণকাড়া ‘খটাং’ – ৩০ দিনের অন অ্যারাইভাল ভিসা। পয়সাপাতির কোন প্রশ্ন নাই।

এই দুই মিনিটের নাটকটুকু কি শুধু আমার সাথেই করলো, না সবার সাথে করে-করবে সেটা জানি না।

অনুসিদ্ধান্তঃ একেবারে ফ্রেশ পাসপোর্টে না ট্রাই করাই উত্তম, এবং আসা এবং যাওয়ার সেম এয়ারলাইন্সে করাই উত্তম, মানে রিটার্ন টিকেট আর কি।

প্রসঙ্গ দুই – এয়ার টিকেট

আমি অতি-দরিদ্র ট্রাভেলার, তাই লো-কস্ট ক্যারিয়ার হিসেবে মালিন্দো বা এয়ার-এশিয়ার কথা বলতে পারি। রিটার্ন টিকেট সিজন এবং সময়ভেদে ৩০-৩৫ হাজারের মত পড়বে। এয়ার এশিয়া সবচেয়ে চিপ, বছরের কিছু কিছু সময়ে খোঁজ-খবর রাখতে থাকলে এমনকি ২৫ হাজারেও টিকেট পাওয়া সম্ভব। এয়ার-এশিয়ার ফ্লাইট কিন্তু সস্তা মানে তস্য সস্তা…… কুয়ালালামপুরে ১৪-১৫ ঘন্টার ট্রানজিটে আপনাকে ফেলে রাখবে, পকেটে রিঙ্গিত বা রুপি না থাকলে ফ্লাইটে কিছু খেতেও পারবেন না। দু’টো কাজ করতে পারেন, মালয়েশিয়ার ভিসাটা নিয়ে রাখলে এক ঠিলে দুই পাখি দেখা সম্ভব, নচেৎ ‘দ্য টার্মিনাল’ মুভিটা দেখে নিজেকে টম হ্যাংকস ভাবতে পারেন। ১৪-১৫ ঘন্টা শুনতে যতটা কঠিন শোনায়, আসলে অতটা কঠিন না।

পিস অফ অ্যাডভাইসঃ মনে জোর রাখবেন, এয়ারএশিয়ার ফ্লাইটে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আপনার সহযাত্রী হবেন সাউথ-ইস্ট এশিয়ায় কর্মরত আমাদের বাঙ্গালী ভাইয়েরা, তাই মাঝ-আকাশে প্লেনের ভিতরে হাটাহাটি, হ্যাচ খুলে ব্যাগ বোঁচকা নামানো কিংবা এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে কিরে দুস্ত ক্যামন আসশ ধরনের হাঁকডাকে বিচলিত হবেন না।

প্রসঙ্গ তিন – জাকার্তা শহর

জাকার্তা সুন্দর শহর, তবে জঘন্য ট্র্যাফিক জ্যাম। দেশটার মানুষজন বেশ ভালো। পাবলিক চলাচলের জন্য ডামরি বাস সার্ভিস আছে, অনেকটা মেট্রো-রেল টাইপের, তবে জ্যাম এড়ানো সম্ভব হবে না। ৪০,০০০ রুপিতে (আড়াইশ টাকা) একটা কার্ড করে নিলে দুই-তিন দিন ঘোরাঘুরি সহজে হয়ে যাবে। থাকার জন্য হোস্টেল বেটার অপশন, সেখানে সারা দুনিয়ার ব্যাকপ্যাকারসদের সন্ধান পেয়ে যাবেন – খরচ হয়তো দিনে ছয়শো-আটশো। পনেরোশ-আঠারোশ টাকায় প্রাইম লোকেশনে (সেন্ট্রাল জাকার্তা) সিঙ্গেল রুম। স্ট্রিট-ফুডের উপর নির্ভর করতে পারলে ডেইলি খাবার খরচ তিনশো টাকার কমেও সারা সম্ভব।

প্রসঙ্গ চার – ঘোরাঘুরি

জাকার্তা শহর চার ভাগে বিভক্ত, উত্তর দক্ষিণ পূর্ব পশ্চিম। দেখার মূল জিনিসগুলো মূলত সেন্ট্রাল (জাকার্তা পুসাত) আর পশ্চিম (ওল্ড টাউন) – এরমধ্যে ন্যাশনাল মনুমেন্ট, ইস্তিকলাল মসজিদ (সাউথ-ইস্ট এশিয়ার সবচেয়ে বড় মসজিদ), গেরেজা ক্যাথেড্রাল, পাসার বারু (নিউ মার্কেট টাইপ) আর পুরনো অংশে ফাতাহিল্লাহ মিউজিয়াম, ক্যাফে বাটাভিয়া, হারবার সহ আরও অনেক কিছু।

Jakarta 04
ন্যাশনাল মনুমেন্ট, যা মোনাস নামেই ওখানে পরিচিত

একটু কষ্ট স্বীকার করলে সেন্ট্রাল জাকার্তা আর ওল্ড টাউন, দুটোর সব অ্যাট্রাকশনই হেটে ঘুরে দেখা সম্ভব। জাকার্তা শহরের একটু বাইরে বগর (৫৮ কিঃমিঃ) শহরে সাউথ-ইস্ট এশিয়ার সবচেয়ে বড় বোটানিক্যাল গার্ডেন আছে, আরেকটু এগিয়ে গেলে পুনচাক – মাথানষ্ট অ্যাডভেঞ্চার (হান্টিং, হর্স রাইডিং সাফারি, অফরোড ড্রাইভিং, প্যারাগ্লাইডীং এবং সাড়ে তিন হাজার মিটার হাইটের ইজিলি ট্রেকেবল মাউন্ট রিনজানি)। পুনচাক এর কাছেই তামান সাফারি পার্ক, যেখানে আদিম পলিনেশিয়ান বিভিন্ন মোটিফের মধ্য দিয়ে মাথানষ্ট একটা সাফারি অভিজ্ঞতার পাশাপাশি কমোডো ড্রাগন আছে, ডলফিনের সাথে খেলার সুযোগ আছে। তামান সাফারিতে এন্ট্রি ফি ১৮০০ টাকার মত, আসা যাওয়া সব মিলিয়ে হয়তো হাজার পাঁচেক খরচ হবে।

Jakarta 05
ইস্তিকলাল মসজিদের বিশালাকার গম্বুজ
1A
তামান সাফারি, বগর, ইন্দোনেশিয়া

আর ইন্দোনেশিয়ার সবেধন নীলমণি বালি বা অন্যান্য ওশান অ্যাকটিভিটি তো থাকছেই, সেগুলোর অভিজ্ঞতা এবার নেবার সুযোগ হয়নি।

এয়ারপোর্টে নেমে ডলার ভাঙ্গায়ে নিতে পারেন – ১০০ ডলারে অ্যারাউন্ড ১৩ লক্ষ হয়……  অর্থাৎ ১৩টা এক লক্ষ রুপির নোট আপনাকে দিয়ে দিয়ে দিবে। সহজে হিসাবের জন্য এক লক্ষ রুপি = ৫৮০ টাকা।

শুধু জাকার্তা কেন্দ্রিক থাকলে, সব মিলিয়ে হয়তো ৩০-৩৫ হাজার খরচ পড়বে সিজনভেদে, যদি আমার মত ফইন্নি স্টাইল ফলো করেন আর কি।

ঢাবি আইন বিভাগে আমার শিক্ষক প্রফেসর মাইমুল খান বলেছিলেন, হোটেলে রুমে বসে স্রেফ পাউরুটি খেয়ে দিন কাটিয়ে দিয়ে কিভাবে নতুন একটা দেশ বা শহর এক্সপ্লোর করতে হয়। অতটা এক্সট্রিম ব্যাকপ্যাকার হতে পারলাম না এখনও, আফটার অল – বাঙ্গালী তো, পয়সা আসলে কোন সমস্যা না, মানসিকতাটাই যে মূল বিষয় সেটা বুঝতে অনেক দেরি !

হ্যাপি ট্র্যাভেলিং !

Jakarta 01

Advertisements

2 comments

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

w

Connecting to %s