ইদানিং সোশ্যাল মিডিয়ার বদৌলতে কয়েকটি শর্টকার্ট মেথডে খুব অল্প সময়েই বাংলাদেশের সাইবার স্পেসে খ্যাতি অর্জন করা যাচ্ছে, জানতেন নাকি ? নাবালক পোলাপানের DSD, DSU বা Food Bank মার্কা আইডিয়াগুলো বাদ দিলেও যে বিশেষ কিছু সহজ পদ্ধতি অবলম্বন করলে আপনি একজন বিদগ্ধ জ্ঞানী মহাপ্রাণ দেশপ্রেমী সর্বজনাব মানুষ হিসেবে পরিচিত হতে পারবেন, সেই বিষয়ে কিছু সহজ তরিকা বাতলানোর চেষ্টা করছি। উঠতি বুদ্ধিজীবি হিসেবে এই বাংলার মাটিতে আপনার খ্যাতির বিস্ফোরণে যেন কোনরূপ বাঁধা বিধ্নের সৃষ্টি না হয়, সেটা নিশ্চিত করবার জন্য প্রয়োজনীয় সকল রিসোর্সও এইখানে দিয়ে দেয়া হচ্ছে। অ্যাকাডেমিক বা অন্য সব পড়াশোনাতে হয়তো আপনি নিয়মিত বৃত্ত পেয়ে আসছিলেন, তাই বলে বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনে পিছিয়ে থাকবেন কেন !

সুতরাং নিশ্চিন্তে লেগে যান, আপনার মগজের ভাঁজে ভাঁজে তৈরি হওয়া তত্ত্বের আলোড়ন আর স্ট্যাটাস-কমেন্টের পাঁচফোড়নে দেশ ও জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক নির্বাণ লাভ অত্যাসন্ন !

dg5hq2vqcgbkq

প্রথম ধাপঃ অবস্থান বা আইডেন্টিটি তৈরিকরণ

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপঃ কারণ এর উপরেই নির্ভর করবে যে, আপনি কি কি স্পেসিফিক উপায় গ্রহণ করবেন এবং আপনার বুদ্ধিজীবিতা আপনাকে নাজিমুদ্দিন রোডের চৌদ্দ শিক বা জার্মানির মিউনিখ কোথায় নিয়ে ফেলবে। অতএব, ভাবিয়া করিবেন কাজ।

যা হোক, আমাদের শাহবাগোত্তর বাইনারী সমাজে আপনার হাতে অপশন তেমন নেই; আপনি হতে পারেন ‘এ’ পন্থী বুদ্ধিজীবি, কিংবা হতে পারেন ‘ঐ’ পন্থী জ্ঞানসাধক। দেশের সামগ্রিক সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মেইনস্ট্রিম ট্রেন্ড হিসেবে ‘এ’ পন্থী বুদ্ধিজীবি হওয়াটাই এখন নিরাপদ, কারণ ‘ঐ’ পন্থী বুদ্ধিজীবি হতে গেলে অনেক ঠ্যালা সামলাতে হবে, সারাক্ষণ টেনশন আর দৌড়ের উপর থাকাও লাগতে পারে।

যেটাই নির্ধারণ করেন না কেন, দুই গোত্রেরই অনেকগুলো শাখা আছে, সেগুলোও দেখে বাছাই করবেন,  যেমন বাংলা মিডিয়াম~ইংলিশ মিডিয়াম, আস্তিক~নাস্তিক, প্রলেতারিয়েত – বুর্জোয়া, রাজনৈতিক কর্মী বা বাংলাদেশ আর্মি ইত্যাদি। আপনার খুঁটির জোর কোনদিকে সেটাও দেখবেন, ঢাকা দিল্লী ওয়াশিংটন বা ইস্তানবুল লন্ডন যাই হোক না কোন, নিজ গোত্রের লোকদেরকে চিনে নেবেন, তারা আপনার স্ট্র্যাটেজিক আপনজন।

সাবধানতাঃ নিজের অবস্থান একেবারে সাইনবোর্ড দিয়ে স্পেসিফিক করবার তেমন কোন প্রয়োজন নাই, কারণ এই বুদ্ধিজীবিদের সময়ে সময়ে পতাকা বদলানো লাগতে পারে। পট পরিবর্তনের ফলে নিন্দাবাদের জায়গায় জিন্দাবাদ আনতে যদি দেরী হয়ে যায় তাহলেই বিপত্তি।

রাজ গুরু চানক্য বলেছেন – সময় থাকতে সরে পড়, সময়ে আসল রূপ ধর !

দ্বিতীয় ধাপঃ কিতাব ও পত্র-পত্রিকা অধ্যয়ন ও চুরি করণ

যদিও এই পড়াশোনা বুদ্ধিজীবিতার অন্যতম প্রধাণ পার্ট; অবশ্য আপনি গুগলে এক্সপার্ট হলে কিতাবাদি অধ্যয়ন না করলেও চলবে, দ্রুত টাইপিং শিখে নেবেন। তবে একেবারেই কিছু বেসিক জিনিস আছে যা না পড়লেই নয়।

দ্রুত পড়ে ফেলবেন আহমদ ছফাকে নিয়ে বিভিন্ন লেখালেখি, ডঃ হুমায়ূন আজাদের বিভিন্ন উপন্যাস (উপন্যাস পড়তে পারলে তো ভালোই, নিদেন হুমায়ূন আজাদের প্রবচনসমগ্র মুখস্থ করে নিবেন), জাফর ইকবাল, আনিসুল হক, ইমদাদুল হক মিলনের বিভিন্ন ইতিহাসনির্ভর উপন্যাস, আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস (সব পড়তে না পারলেও অন্তত একাত্তরের দিনগুলি পড়া মাস্ট)। আরও পড়ে ফেলবেন কর্নেল তাহেরকে নিয়ে লেখা সব উপন্যাস (ক্রাচের কর্নেল টাইপ; প্রামানয় ইতিহাস টিতিহাস পড়তে যেয়েন না আবার), বা এই ধরনের বিভিন্ন উপন্যাস। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং কাজী নজরুল এর উপর ভালো দখল থাকা চাই, দুই একটা বিখ্যাত বইয়ের সামারি বা দু’চারটে ভালো গানের কলি (গুগল হেল্প করবে) মাথায় রাখবেন সবসময়। তবে কবি হিসেবে কাউকে কোট করতে গেলে অবশ্যই নির্মলেন্দু গুণকে স্মরণ করবেন সবার আগে, আর গায়ক হিসেবে লালন ফকির। কিছু অফ ট্র্যাকের পুরনো বাংলা বই পড়ে রাখতে পারলে ভালো হয়, যেগুলোতে বাংলাদেশের বিশেষত মুসলিম সামাজিক কাঠামোকে তির্যকভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে, যেমন সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, সৈয়দ শামসুল হক, কাজী ইমদাদুল হক, তসলিমা নাসরিন ইত্যাদি ইত্যাদি। পত্র-পত্রিকা বলতে স্রেফ প্রথম আলো-ডেইলি স্টার এবং এর বাইরে আর কিচ্ছু না। আর যে কোন ইস্যুতে উইকিপিডিয়ার পেইজটি পড়ে ফেলে নিন আগেভাগে, এরপর নিজের জ্ঞানের বহিঃপ্রকাশে মুগ্ধ করুন সবাইকে।

স্ব-বিরোধী চিন্তাধারা পোষণ করাও বাঙ্গাল বুদ্ধিজীবিতার একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ, আপনার কথা যেন শুনতে খুব ভালো শোনায় এবং সাধারণ লোকে বিভ্রান্ত হয়ে যায় সেটা নিশ্চিত করতে হবে। আমজনতা এই বিভ্রান্তিকে তাদের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা মনে করবে, এবং আলটিমেটলি তারা আপনাকেই পরম পূজনীয় করে নিবে। স্ব-বিরোধী চিন্তাধারা কেমন ? যেমন বাংলাদেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব যেমন দরকার, পার্বত্য এলাকার বিচ্ছিন্নতাবাদী লোকদেরও নানা রকম অধিকার দেয়া দরকার। অথবা, সঙ্গীতশিল্পী সংস্কৃতমনা ছেলে যদি জঙ্গী হয়ে যায়, তাহলে জঙ্গীবাদ দমনে সবাইকে সঙ্গীত সংস্কৃতি চর্চাই করতে হবে। নিজের বেলায় সকল অধিকারের জয়গান গাইতে হবে, প্রতিপক্ষ কেন সেইসন অধিকার পাবে না সেই তর্কও জুড়ে দিতে হবে। যুক্তিতর্কের নানা প্যাটার্ন আছে, অনেকগুলো ফ্যালাসি আছে, এগুলো রপ্ত করে ফেলতে পারলে আপনাকে আর পাবে কে ?

তবে মনে রাখতে হবে, সবার উপরে আবেগ সত্য – তাহার উপরে নাই। গলায় দলা পাকিয়ে ওঠা এক টুকরো আবেগ সব রকম যুক্তিকে কলা দেখিয়ে দিতে পারে, সেটা বাঙ্গাল ইন্টেলেকচুয়াল না হবার আগ পর্যন্ত আপনি টের পাবেন না।

সহজে মানুষের মনে প্রভাব বিস্তারের জন্য একটি অস্ত্র হচ্ছে যত্রতত্র বিখ্যাত মানুষদের কোটেশন মেরে দেয়া। এই কোটেশনের সংকলনটি আপনাকে সাহায্য করবে। কোটেশন মারবার সময়ে ভুলেও মূল ব্যক্তির নাম উচ্চারণ করবেন না।

তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে আপনাকে কিছু নাম মুখস্ত করতে হবে। একটা কাগজে লিখে নিয়ে জপ করতে পারেন কিছুদিন – কান্ট, হেগেল, রুশো, স্পিনোজা, ভলটেয়ার, হিউম, ম্যাকিয়াভেলি, ফ্রয়েড, জ্যাক দেরিদা, মিশেল ফুকো, এডওয়ার্ড সাঈদ, আরজ আলী মাতুব্বর, ফানো, ফুকুয়ামা, জিজেক (এই লোকগুলো আসলে কে সেটা না জানলেও চলবে)। সময়ে সময়ে দুই একটা নাম আউড়ে যাবেন জায়গামত, তবে ভুলেও ক্লাস ওয়ানে শিখে আসা সক্রেটিস প্লেটো অ্যারিস্টটল এইসব বলতে যাবেন না। আপনাকে নিয়ে হাসাহাসি পড়ে যেতে পারে।

সবসময়ে মনে রাখতে হবে, যেকোন বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই বা বিতর্কে আপনার ব্রহ্মাস্ত্র হবে গালিগালাজ। তাই গালাগালির উপর এই ৭টা বইয়ের সংকলন নামিয়ে ভালো করে অধ্যয়ন করবেন। যথাস্থানে যথাযোগ্য গালি প্রয়োগ আপনাকে বিজয়ী করবে সবসময়ই।

মূল কথা হচ্ছে,  ট্রিভিয়া ইজ বেটার দ্যান নলেজ, স্কুল ইজ বেটার দ্যান কলেজ। প্রতিপক্ষের সাথে বাহাস করবার সময়ে একটু পর পর অতি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ইনফরমেশন আর বই থেকে চুরি করা কোটেশন দিয়ে তাদের পিলে চমকে দিতে হবে, আর এর সাথে অতি অবশ্যই ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল।

তৃতীয় ধাপঃ বিশেষ ভাষা ও ভাব শিক্ষণ

খুব স্বাভাবিক ভাবেই বুদ্ধিজীবিরা সাধারণ মানুষের চেয়ে আলাদা। তাদের জ্ঞানসমুদ্রের যে তল পাওয়া দায়, সেটা যেন কথাবার্তাতেও বোঝা যায় সেটা নিশ্চিত করতে হবে। এই বাংলা অভিধানটিকে ব্যবহার করুন, সাধারণ মানুষের কথিত বাংলা ভাষার বদলে কঠিন কঠিন প্রতিশব্দ ব্যবহার করুন। তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, সাধারণ লোক যেভাবে লিখে তার চেয়ে কঠিন শব্দ এবং ব্যকরণ অনুসরণ করে লিখতে চেষ্টা করুন।যদি লিখতে চান – তাকে এইটা দিলাম, লিখুন – তার প্রতি তর্পণ করলাম।

কিছু জারগন বা শ্লোগান সবসময় ব্যবহার করতে হবে, যেমন, যুক্তিতে মুক্তি, বা চিত্ত যেথা ভয়শূন্য হ্যান ত্যান ইত্যাদি ইত্যাদি। বানান ভুল হবার ভয় না থাকলে কিছু ইংরেজী শব্দও মেরে দিতে পারেন, যেমন ডিসকোর্স, পোস্ট-মডার্নিজম, অ্যান্টি-এস্টাবলিশমেন্ট, হেজিমনি ইত্যাদি ইত্যাদি।

তবে বাংলা লিখার মধ্যে ইচ্ছেমত আঞ্চলিক শব্দ নিয়ে আসুন, সাধু-চলিত ভাষার মিশ্রণ ঘটান; ছত্রে ছত্রে এই বিশেষ শব্দ গুলো যেন বার বার ভেসে ওঠে তা নিশ্চিত করুনঃ বৌদ্ধিক, নষ্ট সময়, সংকট, উপনিবেশ, সাম্প্রদায়িক, ক্রান্তিকাল, উগ্র, বয়ান, মধ্যবিত্ত, দ্বান্দিক, উত্তরাধুনিক, সাম্রাজ্যবাদ, রাষ্ট্রশক্তি, ধর্ম নিরপেক্ষতা, মৌলবাদ, শ্রেণী সংঘাত ইত্যাদি ইত্যাদি। আপনার কথার মত লিখাও যত বেশি সম্ভব কঠিন করে তুলুন, সাধারণ মানুষ যেন পড়ে বুঝতে না পারে।

চতুর্থ ধাপঃ সর্বক্ষণ অনলাইনে অবস্থানকরণ এবং বিশ্বের সকল কিছুতে মতামত বিতরণ

প্রস্তুতি পর্ব মোটামুটি শেষ, এইবার অ্যাকশনের সময়।

গ্রামের বৃদ্ধ থেকে সিরিয়া যুদ্ধ এবং এর মাঝখানের সকল কিছুতে এক্সপার্ট ওপিনিয়ন বিতরণ করুন। এই কারণে সবসময়ে অনলাইনে অ্যাকটিভ থাকা জরুরী। ওপিনিয়ন বিতরণের ক্ষেত্রে ভাষা যতটা সম্ভব ভেইগ এবং ইরিলিভেন্ট হয়, ততই ভালো। ঘটনায় যদি আপনাকে ভিকটিম রোল প্লে করতে হয়, তাহলে আবেগের উপযুক্ত ব্যবহার এবং ক্ষেত্রবিশেষে মিথ্যে গল্প ফেঁদে একটা শোকাবহ পরিবেশ তৈরি করুন। আর যদি আপনি হন শিকারী, তাহলে রণমূর্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ুন, এক্ষেত্রেও আবেগের উপযুক্ত ব্যবহার এবং মিথ্যে গল্প আপনাকে প্রতিপক্ষের তুলনায় এগিয়ে দেবে অনেকখানি।

নিজেকে অন্য সবার চেয়ে আলাদা প্রমাণ করতে নিয়মিত কিছু বিদেশী পত্রিকার লিংক শেয়ার দেবেন, সেটা যদি ইংল্যান্ডের তাজাখবর টাইপ পত্রিকা হয় তাতেও ক্ষতি নেই; প্রতি মাসে একবার অন্তত সাধারণ মানুষ যে কত নির্বোধ, তারা যে কত রেডিও মুন্না বা শাকিব খান বা হিরো আলম এইসব নিয়ে দুঃখ-দীর্ঘশ্বাস ফেলবেন।

এই ক্ষেত্রে যারা নূন্যতম বিরোধিতা বা নাক সিটকান ভাব দেখাবে, তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ুন সদলবলে। বঙ্গীয় ভার্চুয়াল সমাজে সব সময়ে যুদ্ধংদেহী ভাব এবং শক্তের ভক্ত-নরমের যম রূপ ধারণ করতে পারলে আপনার খ্যাতির আলো বিচ্ছুরিত হতে থাকবে চারিদিকে।

fekoathv1l9w8
জয় সুনিশ্চিত !

তবে আবারও বলছি, এই জগতে কোন কিছুই চিরন্তন না ! সুতরাং এমন কিছু করে নিজেকে খুব বেশি ‘কালারড’ করে ফেললে সমস্যা; পট পরিবর্তনের ফলে নিন্দাবাদের জায়গায় জিন্দাবাদ আনতে দেরী হয়ে যাবে। মনে রাখবেন, আপনি কিন্তু বুদ্ধিজীবি, অর্থাৎ ‘সুশীল’। রাজনৈতিক অ্যাকটিভিস্টের চেতনা ধারণ করবেন মনে মনে, অনলাইনে সেটার সুবাস হয়তো মাঝেমধ্যে পাওয়া যেতে পারে কিন্তু একেবারে বিরিয়ানীর হাড়ি খুলে বসলেই কিন্তু ক্যারাবেরা লেগে যাবে।

স্যরি, ক্যারাব্যারা না। কথাটা হবে ‘ক্রান্তিলগ্নে বুদ্ধিবৃত্তিক মননের সংকট’ লেগে যাবে !

Advertisements