“আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়টির ছিলো গৌরবময় অতীত। অনেকে এই বিশ্ববিদ্যালয়টিকে গোটা দেশের আত্মার সঙ্গে তুলনা করে গর্ববোধ করতেন। … অতীতের গরিমার ভার বইবার ক্ষমতা বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের নেই। সাম্প্রতিককালে নানা রোগব্যাধি বিশ্ববিদ্যালয়টিকে কাবু করে ফেলেছে। মাছের পচন যেমন মস্তক থেকে শুরু হয়, তেমনি যাবতীয় অসুখের জীবাণু শিক্ষকদের চিন্তা-চেতনায় সুন্দরভাবে স্থান করে নিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্বরজারি, ধনুষ্টংকার নানা রকমের হিষ্টিরিয়া ইত্যাকার নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাধিগুলো শিক্ষকদের ঘায়েল করেছে সব চাইতে বেশি। এখন শিক্ষক সমাজ বলতে কিছু নেই, আছে হলুদ, ডোরাকাটা, বেগুনি এসব দল। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষমতা দখলের জন্য দলগুলো সম্ভব হলে সম্মুখ সমরে অবতীর্ণ হতো। মাঠ এবং রাস্তা ছাত্ররা দখল করে রেখেছে বলে শিক্ষকদের লড়াইটা স্নায়ুতে আশ্রয় করে নিয়েছে…”

১৯৯৫ সালে আহমদ ছফার লিখা এই ‘গাভী বিত্তান্ত’ উপন্যাসটি সময়ের আবর্তনে কালজয়ী এক উপাখ্যানে পরিণত হয়েছে – ২০ বছর পর আজকে এসেও এর আবেদন কিংবা গ্রহণযোগ্যতা খুব একটা কমে নি। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সামগ্রিক অবস্থান আর জ্ঞানচর্চার মোড়কের আড়ালে ভেতরকার কদর্য চিত্র এত নিখুঁতভাবে এর আগে কেউ ফুটিয়ে তুলতে পারেন নি। সাধারণ ঘটনার তির্যক বিশ্লেষণ আর দুর্দান্ত সেন্স অফ হিউমারে ভরা বইটা পড়তে পড়তে কিছুক্ষণ পর পরই ধাক্কা লাগবে, হাসি আসবে তবে সামগ্রিকভাবে কালো মেঘের ছায়ায় ঢেকে যাবে আপনার মন; দেশের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়, কিংবা বাকি সব বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থা যদি এইরকমই হয়, তাহলে এই তথাকথিত ‘জ্ঞান আশ্রম’গুলো থেকে কি আত্নাসমৃদ্ধ বিবেকবান মানুষ বের হচ্ছে, নাকি কলুষিত প্রেতাত্নার দল ?

কাহিনী সংক্ষেপঃ দেশের সেরা ও প্রাচীণতম বিশ্ববিদ্যালয়টির জ্ঞানতাপস শিক্ষকদের অভ্যন্তরীন দ্বন্দ্ব, রাজনীতি, স্বার্থপরতার নোংরা বলয়ের বাইরে স্রেফ নিস্ক্রিয় জীবনযাপনকারী একজন শিক্ষক রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক মিয়া মোহাম্মদ আবু জুনায়েদ। খুবই সাধারণ তার জীবনযাত্রা, তার চিন্তা বা স্বপ্ন। কিন্তু পরিবেশ-পরিস্থিতি আর অতিরাজনীতির ঘেরাটোপে একপ্রকার হঠাৎ করেই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিযুক্ত হন তিনি; এই উপাচার্যের পদে আসীন হওয়াটাই তার নিজস্ব জীবন যাপন এবং দৃষ্টি ভঙ্গীতে নিয়ে আসে এক আমূল পরিবর্তন।

পারিবারিক, সামাজিক বা পেশাগত বিভিন্ন সমস্যা নিরসন, বিশ্ববিদ্যালয়ের মিটিং মিছিল দুর্ঘটনা, নিজ দলীয় সহকর্মীদের অসন্তুষ্টি সামলে উঠতে গিয়ে তিনি বুঝতে পারেন, ক্ষমতা লাভের চেয়ে বরং তার সদ্ব্যবহার করা সত্যিই কঠিন। কখনো কখনো তিনি বেশ হাপিয়ে ওঠেন। তার চারপাশে গজিয়ে উঠতে থাকে সুবিধা শুষে নেবার মত ধুরন্ধর লোকেরা; পারিবারিক জীবনে চরমভবে অসুখী হয়ে উঠতে থাকেন তিনি, এক পর্যায়ে ভিসির বাংলোতে একটা দুর্দান্ত গোয়ালঘর বানিয়ে একটা দুর্লভ জাতের গাভী কিনে পুষতে শুরু করেন। অবলা প্রানীটাই বরং ভালো, কোন দাবী দাওয়া নেই, ষড়যন্ত্র নেই বা মাথা ধরানো হই চই নেই। এক পর্যায়ে শান্ত সমাহিত এই প্রাকৃতিক পরিবেশটিই হয়ে দাঁড়ায় তার মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু, এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাজ কিংবা শিক্ষক-ছাত্র রাজনীতির কাজও পরিচালিত হতে থাকে সেই গোয়ালঘর থেকে। এর শেষ কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় ? পড়তে হবে মূল বইটা।

Gavi 1

আহমদ ছফার অন্য সব উপন্যাসগুলোর মত এটাও একটু ধীরগতিতে চলতে শুরু করে, তবে আপনি যদি কাহিনীর সাথে রিলেট করতে পারেন তাহলে বইটা হয়ে যাবে আনপুটডাউনেবল – অর্থাৎ শেষ না করে উঠতে পারা খুব কঠিন। ক্ষমতা এবং ক্ষমতার বলয়ের চারপাশে থাকা নানারকমের মানুষজনের সংস্পর্শে এসে আবু জুনায়েদের চরিত্রে যে পরিবর্তন আসে সেটা আসলেই অকল্পনীয়। মানসিক দ্বন্দ্বের টানাপোড়েনে সবসময়ে জ্বলতে থাকা লোকটার জন্য হয়তো কখনো কখনো করুণাও হতে পারে।

কিছু কিছু সময়ে হতো মনে হবে, ২০ বছর পরেও এই উপন্যাসের চরিত্রগুলো আমাদের চারপাশেই ঘুরে বেড়াচ্ছে; বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসে, ছাত্র-শিক্ষকদের মধ্যে, রেজিস্ট্রার ভবনের শানদার কর্মচারী আর এই বিশ্ববিদ্যালয়কে রুটি-রুজির একমাত্র যোগানদার হিসেবে ধরে নেয়া মানুষগুলোর মাঝেই খুঁজে পাবেন দিলরুবা খানম, নুরুন্নাহার বানু কিংবা শেখ তবারক আলীকে। পড়তে গিয়ে এমনও মনে হতে পারে, আহমদ ছফা হয়তো তার সময়কার একটি নিখুঁত ধারাভাষ্যই লিখে গিয়েছেন, আসল পাত্র-পাত্রীদের নাম অদল বদল করে। কে জানে ? আবু জুনায়েদের গাভী ‘তরণী’ হয়তো অস্ট্রেলিয়ান-সুইডিশ ক্রস ব্রিডের একটা দুর্দান্ত গাভীই ছিল, অনেক শিক্ষক-ছাত্রই সাধারণ মানুষের পয়সা নষ্ট করে এই ধরনের বিলাসী ‘গাভী পোষা’ কাজ করে আসছেন, এসেছিলেন কিংবা ভবিষ্যতেও করে যাবেন। বইয়ে পাওয়া রসায়নের আধপাগলা শিক্ষক মুস্তাফিজুর রহমান রসায়নে বিশ্বকাঁপানো ব্রেক-থ্রু রিসার্চ করবার পরও তাতে ভ্রুক্ষেপের সময় নেই আবু জুনায়েদের, তিনি যে তার গাভী নিয়ে ব্যস্ত আছেন !

১৯৯৭ সালের নভেম্বরে আওয়ামী লীগ শাসনকালে ইসলামি নেতা হাফেজ্জি হুজুর ঢাকার কামরাঙ্গীরচরে একটি ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাকল্পে ইসলামি সম্মেলনের আয়োজন করেন। ওই সম্মেলনে আহমদ ছফাকে অতিথি হিসেবে বক্তৃতা করতে নিমন্ত্রণ করেছিলেন হাফেজ্জি হুজুর। বন্ধু রতন বাঙালিকে নিয়ে ছফা হাজির হলেন ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা অনুষ্ঠানে। সেখানে তার এক ঘণ্টার বক্তৃতা সবাই মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার স্পষ্ট বিরোধিতা করা সত্ত্বেও তার মাইক কেড়ে নিয়ে ছফাকে সভাস্থল থেকে বের করে দেয়া হয়নি। ছফার বক্তৃতার সারাংশ ছিল এরকম :

বিশ্ববিদ্যালয় একটি গালভরা শব্দ… কামরাঙ্গীরচরের নরম মাটি ভেদ করে হঠাত্ করে একটা বিশ্ববিদ্যালয় জেগে উঠবে এরকম অসম্ভব প্রত্যাশা আমাদের নেই। … বিশ্ববিদ্যালয় ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া জিনিস নয়। টাকা দিয়ে আসবাবপত্র কেনার মতো করে বিশ্ববিদ্যালয় সৃষ্টি সম্ভব নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি আত্মা থাকতে হয়। ইট, কাঠ, লোহালক্কড় দিয়ে ইমারত বানালে সেখানে আত্মার সঞ্চার হয় না।

শতাব্দী প্রাচীণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস গড়া সেই অঙ্গন আজও আছে, ইট-পাথরের জীবন্ত ঐতিহ্যগুলো আজও কথা বলে, প্রাণের স্পন্দনে মুখর ছাত্র-শিক্ষকেরা আজও ঘুরে বেড়াচ্ছেন এর অলিতে-গলিতে কিন্তু আত্না ?

এর আত্নাটি কোথায় ?


কেউ যদি পুরো বইটি পড়তে চান তাহলে নামিয়ে নিন আমারবই থেকে (পিডিএফ ৯ মেগাবাইট)

Advertisements