‘ব্যর্থতা’ আমাকে দেয় না অবসর……

সফল মানুষের গল্প সবাই করে, তাদের থেকে অনুপ্রেরণা খোঁজে। আর ব্যর্থ মানুষের গল্পও অনেকে শোনে, নিজের ভাগ্যকে ধন্যবাদ দিতে কিংবা সেইরকম ভুলগুলো শুধরে নিতে। পারফেকশনিস্ট হতে যাবার এই ইঁদুর দৌড়ে সাদা-কালো রেখার মাঝে এক গভীর ধূসর লাইন আছে, যেখানে থাকে মিডিওকার মানুষজন। যাদের জীবনে চোখটাটানো সাফল্য নেই কিংবা আহ-চুক-চুক ব্যর্থতার গল্পও নেই, স্রেফ নিরামিষ আটপৌরে মধ্যবিত্ত টাইপ জীবন। এই মানুষগুলোর ম্যাড়ম্যাড়ে অনুভূতিগুলোর কথা শোনা যায় খুব কম…..

এই পোস্টটা মূলত Notredamian Worldwide ফেসবুক গ্রুপে করা পোস্টের একটা পরিমার্জিত সংস্করণ। ক্যাম্পাস লাইফ শেষ, তবে বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে দু’চারটে আবেগ রোমন্থন করলেও কলেজ লাইফ নিয়ে কখনো তেমন কিছু লিখা হয়নি। আমার ব্লগের ক্যাম্পাস সেকশনের সম্ভবত শেষ পোস্ট হতে যাচ্ছে এইটা, অ্যাটেনশন সিকারদের মত ফেসবুক লাইক বা ডোপামিনের তাড়নাও প্রবল তবে কঠোর বাস্তবতার সাথে প্রথম পরিচয় ঘটেছিল এই জায়গাটিতেই, সেটা জাজ্বল্যমান করে রাখবার একটা চেষ্টা করতেই হচ্ছে। তার চেয়েও বড় কথা, এই ব্লগের একটি পরিমার্জিত সংস্করণ কলেজের ২০১৮ সালের রিইউনিয়ন উপলক্ষ্যে প্রকাশিত স্মরণিকাতেও স্থান পেয়ে গেছে (ছবি নিচে)।

মেধাবীদের আকর এই কলেজের ফেসবুক গ্রুপে সবাই অনারেবল মেনশন বা পারফেক্ট অ্যাটেনড্যান্স সার্টিফিকেট বা দুর্দান্ত অ্যাচিভমেন্ট এর ছবি-স্মৃতি শেয়ার দিচ্ছেন যেগুলো দেখে খুবই ভালো লাগে; তবে কলেজের একটা বিশাল অংশ জুড়ে আমরাও কিন্তু ছিলাম, যারা ব্যাকবেঞ্চার শ্রেনীর লোকজন, কলেজে আসা-যাওয়া করা ছাড়া যাদের বলার মত সেইরকম কোন অ্যাচিভমেন্ট নেই। ওয়েল, মেধার র‍্যাংকিং এ কলেজের নিম্নবিত্ত শ্রেণীর অংশ হলেও আমাদেরও কিছু স্মৃতি আছে বটে, সেটাই শেয়ার করতে চাই। (চান্স নিচ্ছি, উকিল জাতীয় লোকের নাকি লাজ-শরম কম )

ndc-love

এইটা নটর ডেম কলেজে আমার ফার্স্ট ইয়ারের রেজাল্ট কার্ড; আমার মত ‘ব্রিলিয়ান্ট’ যারা ছিলেন তারা অবশ্য এইটা গোপন করে ফেলেন হয়তো বা, তবে নির্লজ্জ আমি যাকে তাকে এগুলো দেখিয়ে বেড়াই। কারণ এই টুকরো কাগজটা শুধু একটা রেজাল্ট কার্ড না, বরং যুদ্ধে এগিয়ে যাবার অনুপ্রেরণা, হার না মানা পথচলার সাহস আর নিরন্তর সংগ্রামের নাম; অন্তত আমার জন্য……

খুব চিজি শোনাচ্ছে আমি জানি; সস্তা ওভার দ্য টপ আবেগের হিন্দি সিনেমার মত। তবে উপলদ্ধিগুলো যখন শব্দে রূপ নিতে যায়, এর চেয়ে রূঢ় কোন ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না। স্কুল থাকতে মোটামুটি লেভেলের ‘ভালো’ ছাত্র ছিলাম, প্রথম দশ জনের মধ্যেই সবসময় থাকা হতো। সেই আমার এহেন ‘পারফরম্যান্সে’ আমার মায়ের চোখে প্রথমবারের মত পানি দেখেছিলাম, তাও এই লেখাপড়ার মত ‘তুচ্ছ’ বিষয়টা নিয়ে। জীবনে কখনও নিজেকে এতো ছোট মনে হয়নি, অপমান আর নিজের প্রতি এতো ঘৃণা আর কখনো মাথায় চেপে বসেনি।

নাহ, এরপর ফেয়ারি টেলের মত সব বাধাবিঘ্ন উপেক্ষা করে একেবারে হিমালয়ের চূড়ায় উঠে বসতে পারিনি; নিজের ঢোল পেটানোর মত কোন কিছুই এখনও করতে পারিনি, কখনও করতে পারবো সেই সম্ভাবনাও খুব ক্ষীণ। বাংলা সিনেমার শেষ দৃশ্যের সফল সেই নায়ক কিংবা হলিউডের ‘ফিল-গুড’ মোটিভেশনাল মুভির মত অধরা জীবন কি আর সবাই পায় ?

এই ঠেলা ধাক্কায় কোনরকমে শিখতে পেরেছি কেবল একটা জিনিস – সংগ্রাম। হাজারী ক্লাবের ‘গর্বিত’ সদস্য হয়ে জহর স্যারের ম্যাথ রেমেডিয়াল ক্লাসে বসে শিখেছি গণিতের মধ্যেও কিভাবে জীবন-দর্শন খুঁজে পাওয়া যায়। ম্যাথ ল্যাবে স্ট্যানলি স্যার আর ফিজিক্সে ফিলিপ স্যারের একের পর এক রিপিট খেয়ে খেয়ে সফলতার ডেফিনিশনই চেঞ্জ হয়ে গেছে, উৎসাহ খুঁজে ফিরতাম মুখতার স্যার আর মিজান স্যার- আজমল স্যারের ক্লাসে। আশেপাশের দুর্দান্ত উজ্জ্বল মুখগুলোকে দেখে মাঝেমধ্যেই মনে হতো, আমি কি আসলে ঠিক জায়গায়ে এসেছিলাম ? ডু আই রিয়েলি বিলং হিয়ার ?

notre-dame

এই পরিবেশ বা চাপ বা শিক্ষায় জীবন বা দৃষ্টিভঙ্গিতে কোন পরিবর্তন এসেছিল কি ?

সেটার প্রথম টেস্ট হয়ে গেল এইচএসসি’র পর ভর্তি পরীক্ষায়। টেনেটুনে এ-প্লাস একটা পেয়েছিলাম বটে, কিন্তু বুয়েট মেডিক্যাল ঢাবি আইবিএ কুয়েট ইভেন টেক্সটাইল, কোথাও চান্স পেলাম না; এবং কেন যেন তাতে খুব বেশি দুঃখ বা হতাশাও লাগলো না। মনের মধ্যকার ঋণাত্নক অনুভূতির ঐ স্নায়ুগুলো কলেজের সেই দুই বছরেই নিস্প্রভ হয়ে গেছে। অ্যাডমিশন সিজনের লাস্ট পরীক্ষা হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডি ইউনিটে পরীক্ষা দিলাম। রেজাল্ট বের হবার পর প্রথম দশ জনের মধ্যে ৯ জনকে নিয়ে সব কোচিং সেন্টার মাতামাতি করলো, প্রসপেক্টাসে ছবি, উপহার-পুরস্কারের বন্যা বয়ে গেল, একজনের কোন সন্ধান পাওয়া গেল না। ঐ গর্দভ নাকি কোথাও কোন কোচিং-টোচিং করে নাই।

পরের গন্তব্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ। অসংখ্য অম্ল-মধুর-তিক্ত অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে পড়াশোনা শেষ হলো, তবে কলেজ জীবনের সেই ধাক্কাটার মত ধাক্কা আর কেউ দিতে পারেনি; রিচার্ড ব্র্যানসনের ভাষায় ‘লুজিং মাই ভার্জিনিটি’। পড়ার ফাঁকেফোকরে দেশে বিদেশে বিভিন্ন জায়গায় সাফল্য-ব্যর্থতা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় এবং দেশের প্রতিনিধিত্ব করলাম, অনেক ক্ষেত্রেই খাঁদের মুখে দাঁড়িয়ে নানারকম ‘অ্যাচিভমেন্ট’ (?!) ছিনিয়ে আনবার সৌভাগ্য হলো; কিছু কিছু জায়গায় চরম অপমানিত হয়ে পরাজিত হয়ে ফিরে আসতে হলো। আন্ডারগ্র্যাডে থাকাকালীন দু দু’টো ইন্টারন্যাশনাল ট্রাইব্যুনালে কাজ করবার সুযোগ পেলাম, আবার কখনও কোন একটা কাজের জন্য প্রায় শ’খানেক আইনজীবি- চেম্বারের সাথে যোগাযোগ করেও জিরো রেসপন্স পেলাম; এমন কি ভদ্রতা করে ‘না’ পর্যন্ত কেউ বললেন না। তবুও মন-অনুভূতি এখন অনেকটাই ভোঁতা হয়ে গেছে। গুরু সত্যজিৎ রায়ের ছোটগল্পের সেই বাতিক বাবুকে মনে পড়ে বারবার – জগতের কোন কিছুই যাকে বিস্মিত করে না।

এইটা আবার কোন সাইকোলজিক্যাল সিনড্রোম-টিনড্রোম হয়ে গেল কি না কে জানে ? প্রায় সময়ই সোশিওপ্যাথ মনে হয় নিজেকে।

টানাপোড়েনের আবর্তনে লেখাপড়া শেষে কর্মজীবনের অনিশ্চিত প্রান্তরে এসে নানাদিকের চাপে মাঝেমধ্যে দিশেহারা হয়ে যাবার দশা হয়, তখন  পেছন ফিরে তাকালে এই ছবিগুলো দেখতে পাই। মনে পড়ে যায় নটর ডেম কলেজের সবুজ ক্যাম্পাসের পুরনো ঝিমধরা ভবন আর আকাশছোঁয়া প্রাচীণ গাছগুলোর সোঁদা গন্ধ। আমি এখন শিখেছি, জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য, এইম ইন লাইফ কিংবা আল্টিমেট সফলতা বলে আসলে কিছু নেই, এবং হতাশা ব্যর্থতা বলেও কিছু নেই। জীবনের মানে হলো নিরন্তর ছুটে চলা, আর এই দৌড়ের মধ্যে বারংবার হোঁচট খেয়ে পড়ে গিয়ে আবার উঠে দাঁড়ানোটাই সম্ভবত সফলতা।

অতএব, আমার মত আন্ডার-অ্যাচিভার হতাশ ফ্রাস্ট্রেটেড কোন ব্যাকবেঞ্চার যদি থেকে থাকেন ভাই, সাহস না হারায়ে জান খিঁচে দৌড়াতে থাকেন এই লাইফ ম্যারাথনে, ফরেস্ট গাম্পের মত……

আর মনের গহীনে গান বাজুক – ‘ব্যর্থতা’ আমাকে দেয় না অবসর !

NDC (1)NDC (2)

Advertisements

One comment

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

w

Connecting to %s