১৯৭৫ সালের বাংলাদেশ। ১৫ই অগাস্ট, ৩রা নভেম্বর এবং ৭ই নভেম্বর – মাত্র চার মাসে সংগঠিত হওয়া তিন তিনটি সেনা-অভ্যুত্থান বাংলাদেশের সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নিয়ে আসে এক আমূল পরিবর্তন, যার প্রভাব সম্ভবত এই দেশ ও দেশের মানুষকে আজীবন বহন করতে হবে।

কর্নেল এম এ হামিদ এমন একজন মানুষ যিনি এই তিনটি ঐতিহাসিক অভ্যূত্থানই একেবারে কেন্দ্রে থেকে দেখবার সুযোগ পেয়েছিলেন; এবং প্রতিটি অভ্যুত্থানের নায়ক-ভিলেনের সাথেই তার জানাশোনা ছিল। চাকুরী এবং দায়িত্বের কারণে প্রতিটিও ঘটনার সাথে কমবেশি প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে সংযুক্ত ছিলেন তিনি, এটি বইতে স্বীকার করেই নিয়েছেন।

এই কারণে আমার কাছে ১৯৯৩ লিখা এই বইটা একটা ভিন্ন মর্যাদা পেয়েছে। কারণ সামরিক-বেসামরিক বিভিন্ন লেখকদের বরাতে ৭৫ সালের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে যে বইগুলো পাওয়া যায় (তার অনেকগুলাই আমি পড়ে দেখেছি), সেগুলোর বেশিরভাগই  ঘটনাবলী শুনে শুনে অর্থাৎ সেকেন্ডারী সোর্সের ওপর ভিত্তি করে লিখা এবং অনেক ক্ষেত্রেই লেখকের মতাদর্শ এবং ব্যক্তিগত মনোভাবের প্রভাবে অতিসঞ্জিত হয়েছে, সেখানে এই বইটা একটা নিরপেক্ষ ধাঁচ বজায় রেখে বেশ কিছু চিত্র একেবারে ভিতর থেকে তুলে এনেছেন।

কর্নেল হামিদ ছিলেন কাকুল মিলিটারী অ্যাকাডেমিতে জিয়াউর রহমান এবং জেনারেল শফিউল্লাহর কোর্সমেট। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানে বন্দী থাকবার পর তিনি দেশে ফিরে আসেন। জিয়াউর রহমানের খুব ঘনিষ্ঠ হবার কারণে তাদের মধ্যে ছিল তুই-তোকারি সম্পর্ক। অবশ্য জিয়াউর রহমানের শাসনকালে জিয়ার সাথেই এক মনকষাকষির সূত্র ধরে তিনি সামরিক বাহিনী থেকে সেচ্ছায় অবসর নেন।

প্রত্যাবর্তনকারী অফিসার হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে পরিচয়ের কোন সুযোগ ছিল না তার, তবে ঐ সময়ে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের স্টেশন কমান্ডার থাকার সুবাদে একবার বঙ্গবন্ধুর সাক্ষাৎ পেয়েছিলেন তিনি। ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়িতে বসে বঙ্গবন্ধু তার কাছে কিছুটা ক্ষোভই প্রকাশ করেছিলেন সামরিক বাহিনী নিয়ে।

bangabandhu

ভাগ্যের ফেরে এই স্টেশন কমান্ডার থাকবার কারণেই কর্নেল হামিদ বঙ্গবন্ধু এবং তার পরিবারের সকল সদস্যদের লাশ উদ্ধার করে তা দাফনের ব্যবস্থা করান।

বইটিতে ৭৫ এর রক্তাক্ত অধ্যায়ের সকল কুশীলব সম্পর্কেই তিনি তার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন। এই তিন সেনা অভ্যুত্থানের পর সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী ব্যক্তি হিসেবে উঠে আসা জেনারেল এরশাদ সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল এইরকমঃ

ershad

নির্মোহ বিশ্লেষণে এবং ঝরঝরে ভাষায় লিখা এই বইটা পড়তে পড়তে থ্রিলারের স্বাদ পাওয়া যাবে। একের পর এক মিলিটারি অপারেশন, ক্যু এবং কাউন্টার ক্যু, সেনাসদর এবং অন্যান্য সশস্ত্র ইউনিটে অফিসারদের তৎপরতা, আওয়ামী লীগ এবং জাসদের রাজনৈতিক নেতাদের কাজ, আন্তর্জাতিক চাপ ও চালচিত্র সবকিছু মিলিয়ে একটা চিত্র চোখের সামনে ফুটে উঠবে। এরপর ৭৫ এর ঘটনাবলী নিয়ে লিখা অন্যান্য বইগুলো মিলিয়ে দেখলে তথ্যের দিক থেকে কোন গড়মিল পাওয়া যাবে না, অন্তত আমি যতদূর পড়ে বুঝেছি।

তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে তার বলার টোনে একটি ডিলেমা পাওয়া যেতে পারে। একদিকে জিয়ার সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক, আবার বঙ্গবন্ধুর উপর অপরিসীম শ্রদ্ধা, আবার প্রত্যক্ষভাবে ঘটনাবলীর মধ্যে জড়িয়ে যাওয়া – সবকিছু মিলিয়ে একজন মানুষের জন্য নিরপেক্কতা ধরে রাখা এখানে কঠিনই বটে। বইটা তিনি শেষ করেছেন তাই অনেকটা দুঃখ এবং কিছুটা যেন অভিমান নিয়েই।

finishing

 

তার ব্যক্তিজীবন সম্পর্কে একটি ইন্টরেস্টিং তথ্য জানিয়ে দেই, তিনি ছিলেন একজন ক্রীড়ামোদী ব্যক্তি। আমাদের কিংবদন্তী দাবাড়ূ রাণী হামিদ তার স্ত্রী, এবং বিখ্যাত ফুটবলার কায়সার হামিদ তার ছেলে।

যাদি কেউ পড়তে আগ্রহী হন, বইটা নামিয়ে নিন এখান থেকে – তিনটি সেনা অভ্যুত্থান ও কিছু না বলা কথা

৭৫ সালের ঘটনাবলী সম্পর্কে একটা পরিষ্কার চিত্রের জন্য জেনারেল মইনুল হোসেন, কর্নেল শাফায়াত জামিল, চৌধুরী খালেকুজ্জামান সহ সামরিক অফিসারদের স্মৃতিকথাগুলো, মহিউদ্দিন আহমদের কিছু লেখা আর বিদেশীরদের মধ্যে লরেন্স লিফশুলতজের ‘বাংলাদেশ : দ্য আনফিনিশড রেভ্যূলিউশন’ এবং অ্যান্থনী মাসকারেনহাসের দ্য লিগ্যাসী অফ ব্লাড নেড়ে দেখতে পারেন।

বিভিন্ন ডাইমেনশনের বিবরণের ভেতর থেকে সত্যটা হাতড়ে নেবার চেষ্টা আমাদের সবারই করা উচিৎ।

Advertisements