মধ্যপ্রাচ্য, মার্কিন সেনা, অসহায় আরব জনসাধারণ এবং হলিউড। এই চারটা শব্দের কম্বিনেশন শুনলেই একটা স্টেরিওটিপিক্যাল ছবি আমাদের মনে ভেসে ওঠে। অত্যাচারী আরব শাসকের হাত থেকে মুক্তি দিতে সাত সমুদ্র তেরো নদী পার হয়ে বন্দুক হাতে শ্বেতদেবতারা আসলেন ত্রাতা হয়ে, ইত্যাদি ইত্যাদি। অনেক টুইস্ট এন্ড টার্নের পর বিজয়ীর আসনে যথারীতি তারাই, ন্যায়নিষ্ঠতার বিমূর্ত প্রতীক হিসেবে।

প্রোপাগান্ডা বলা হোক আর সোশ্যাল এঞ্জিনিয়ারিং যাই বলা হোক না কেন, ঘুরে ফিরে মূলধারার মার্কিন মুভিগুলোর কাহিনী এই সীমাবদ্ধতা থেকে কখনো বের হতে চায়নি। যুদ্ধফেরত সেনারা যখন অসম্ভব ট্রমা নিয়ে দেশে আসতে শুরু করলো, তখন এই ন্যারেটিভ কিছুটা চেঞ্জ হয়ে মার্কিন সেনাদের মানসিক টানাপোড়েনের গল্পে আবর্তিত হতে লাগলো, যার প্রতিফলন দেখা গিয়েছে ক্যাথারিন বিগলোর হার্ট লকার (২০০৮), ক্লিন্ট ইস্টউডের আমেরিকান স্নাইপার (২০১৫) কিংবা গ্যাভিন হুডের ব্রিটিশ মুভি আই ইন দ্য স্কাই (২০১৫)  তে।

কিন্তু এই চিরায়ত গল্পের বাইরে অনেকটা আচমকাই একটি সৎ এবং জীবনঘনিষ্ঠ গল্প বলার চেষ্টা করে হয়েছে ১৯৯ সালের থ্রি কিংস মুভিটিতে, এবং পরিচালক ডেভিড ও’ রাসেল এখানে যথেষ্ট মুনশীয়ানার পরিচয় দিয়েছেন।

কাহিনী সংক্ষেপ (যথাসম্ভব স্পয়লার মুক্ত)

এইখানে তিনজন মার্কিন সেনার গল্প বলা হয়েছে, যারা প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধ শেষে বাড়ী ফেরার অপেক্ষায় আছে। ইরাকের স্বৈরশাসক সাদ্দাম কুয়েত থেকে প্রচুর স্বর্ণ লুট করে এনে লুকিয়ে রেখেছেন, এই তিন মহারথীর ভাবনা সেগুলো পকেটস্থ করে একটি নিশ্চিন্ত ভবিষ্যৎ নিয়ে আমেরিকায় ফিরে যাওয়া। এই লক্ষ্যে গোপনে তারা ক্যাম্প ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে স্বর্ণের সন্ধানে।

এইদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ হারবার্ট বুশ ইরাকের জনসাধারণের প্রতি আহবান জানিয়েছেন ‘অত্যাচারী’ সাদ্দামের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে, ভাবখানা এমন যেন তারা মাঠে নামলেই মার্কিন সেনারা এসে তাদের পাশে দাঁড়াবে। জনগণ চেষ্টাও করে বিদ্রোহের, কিন্তু মার্কিন সেনারা ঘর ঘোছাতে ব্যস্ত, ফলে সাদ্দামের অনুগত বাহিনীর হাতে কচুকাটা হওয়া ছাড়া উপায় থাকে না তাদের। স্বর্ণের লোভে ক্যাম্পের নিরাপদ আশ্রয় থেকে বেরিয়ে ‘থ্রি কিংস’ দেখতে পান এই ইরাকী মানুষের এই নির্মম বাস্তবতা। তাদের সামনে প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায় সবকিছুই, এরপর তারা কি করবেন ?

এর জন্যে ১১৫ টি মিনিট ব্যয় করতে হবে আপনাকে।

মুভির জনরা বলছে এইটা একটা ব্ল্যাক স্যাটায়ার কমেডি, অর্থাৎ জটিল বাস্তবতাকে ঘিরে বিষণ্ণ এক নির্মম পরিহাস। রটেন টম্যাটোজে এটি ৯৪% ফ্রেশ রেটিং পেয়েছে, মেটাক্রিটিকে ৮২% রেটিং নিয়ে পেয়েছে ইউনিভার্সাল অ্যাক্লেইম। চলচ্চিত্র সমালোচক রজার এবার্ট এই মুভিকে ৪/৪ রেটিং দিয়েছেন। নিউইয়র্ক টাইমস এটিকে বলেছে প্রজন্মের সবচেয়ে ব্যাঙ্গাত্নক যুদ্ধবিরোধী মুভি।

থ্রি কিংস এর চরিত্রে জর্জ ক্লুনি, মার্ক ওয়ালবার্গ এবং আইস কিউব দুর্দান্ত অভিনয় করেছেন। তবে পরিচালক ডেভিড ও রাসেলের ক্যামেরার কাজ এবং কাহিনীর নাটকীয়তাই সম্ভবত এই মুভিকে সকল মধ্যপ্রাচ্যীয় ‘ওয়ার ফিল্ম’ এর চেয়ে আলাদা করে রেখেছে। অনেকেই এটিকে বলছেন হলিউড থেকে অকস্মাৎ বেরিয়ে যাওয়া একটি ‘আদর্শিক’ কাজ ।

এই কথা অস্বীকার করা যাবে না যে মুভিটা ১৯৯৯ সালের, তখনও পৃথিবী বিশেষ করে পশ্চিমা মনন ৯/১১ এবং ওয়ার অন টেরর নিয়ে আচ্ছন্ন ছিল না। সেই বাস্তবতাকে সামনে রেখেও বলতে হয় থ্রি কিংস একটি সাহসী কাজ, চেনাজানা গন্ডীর বাইরে এসে সত্যিকারের গল্প বলবার ক্ষমতা যা আমাদের আজকের পলিটিক্যাল কারেক্টনেসের যুগে বাষ্পীভূত হয়ে গিয়েছে।

ইন্টরেস্টিংলি, ১৯৯৯ সালে ডেভিড ও’ রাসেল জর্জ ডব্লিউ বুশকে অনেকটা ঠাট্টাচ্ছলেই বলেছিলেন, আমি এমন একটা মুভি বানাচ্ছি যেটা আপনার বাবার ইরাকে রেখে আসা কাজকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে।

জর্জ ডব্লিউ বুশের উত্তর ছিল, তাহলে আমাকে আমার বাবার অসমাপ্ত কাজটা শেষ করতে হবে……

মুভির ট্রেইলার দেখে নিন এখান থেকে

Advertisements