টেড-এক্স সিরিজে গ্রাহাম শ নামক এক ইংলিশ ভদ্রলোকের একটা বেশ জনপ্রিয় লেকচার আছে, সেখানে তিনি দাবী করেন যে প্রতিটা মানুষই আঁকতে পারে, এবং সেটা তিনি দশ মিনিটের মাঝেই হলভর্তি মানুষকে কাকের ঠ্যাং বকের ঠ্যাং আঁকিয়ে প্রমাণ করে দিয়েছিলেন। (ব্লগের শেষে দেখে নিন ১৫ মিনিটের ভিডিওখানা)। এই ভূত অবশ্য আমার মাথায়ও চেপেছিল একবার, এবং সেটা বেশ ভালোভাবেই।

troll_dancing

স্কুল পাশ করার পর ২০০৭ এর শেষ নাগাদ অনেকটা আকস্মিকভাবেই আমার জীবনের প্রথম ‘চাকরি’র অফারটা পেলাম, সেটা ছিল এক অপরিচিত এক কার্টুন ম্যাগাজিনে এডিটোরিয়াল অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ করা। এবং যা হয় যথারীতি, ঠ্যাকায় পড়লে কার্টুন আঁকা, ফানি থিম বের করা মোটকথা গ্যাটিস দেয়া। এইসব ‘ক্রিয়েটিভ’ পত্রিকার জন্য প্রতি মাসে ভালো ম্যাটার ম্যানেজ করা বিশাল ঝামেলার কাজ; সস্তা লিটলম্যাগ টাইপ ম্যাগাজিনে কলুর বলদের মত কে তার মেধা-শ্রম দিতে যায় ?

.

অতএব আমিই সেই কলুর বলদ। অদ্ভুত একতা মোহাচ্ছন্ন সময়ে স্রেফ উড়ে গেল পরের দু’টো বছর। ঐ সময়টাতে সমগ্র চিন্তা জুড়ে ছিল কার্টুন, যদিও আঁকার বেলায় আমি সবসময়ই ঠনঠন। পত্রিকার মাধ্যমে উন্মাদ-গুরু আহসান হাবীবের ট্রেনিং ক্লাস করবার সুযপগ পেয়েছিলাম পেয়েছিলাম, হাতে ধরে মাথামুন্ডু আঁকা শিখিয়েছেন, আর বলতেন প্রচুর জোকস পড়তে হবে। অতঃপর কলেজের ক্যালকুলাস বইয়ের ফাঁকে ফুটপাথ থেকে কেনা জোকস কালেকশন আর বায়োলজী ড্রইং এর মধ্যে এইসব ট্র্যাশ ড্রইং। কোন ঘটনা বা ক্যারেক্টার দেখলেই তাকে কার্টুন করার ধান্দা, আর নিজেরে সমাজের প্রতিবাদী চরিত্রে বিদগ্ধ কার্টুনিস্ট হিসেবে ‘কুকল্পনা’…..
.

আমাকে সপ্তাহে অফিস করতে হতো দু’দিন করে, আর নিজেই আকাশ কুসুম চিন্তাভাবনা আর পড়াশোনা করতাম সারাদিন। নেশাগ্রস্থ এই কাজের পর মাস শেষে বেতন পেতাম “পাঁচশো” টাকা (আজ্ঞে হ্যা, লিটারেলি পাঁচশো টাকা ওনলি)।

জীবনের প্রথম উপার্জনটা দিয়ে সম্ভবতা সবাইই ফ্যামিলিকে কিছু গিফট করেন বা স্মরণীয় করে রাখেন, আমি বায়তুল মোকাররমের সামনে থেকে একগাদা পুরানো কার্টুন আর জোকসের বই কিনে দুর্দান্ত একবাটি ছোলা-মুড়ি খেয়ে ঘরে ফিরে আসলাম………

মলিন হওয়া নিউজপ্রিন্ট আর অনভ্যস্ত হাতে আঁকা কিছু আজেবাজে আঁকাআঁকি দেখে ফিরে যাই অফিসের কোণার সেই ছোট্ট টেবিলটাতে। সাংবাদিকতা পেশাটার প্রতি দুর্দান্ত আগ্রহ ছিল ঐ সময়টাতে (ফ্যাসিনেশনতা এখনও কাজ করে)। ঘন্টার পর ঘন্টা বসে বসে ডিজাইন, পেইজ সেটআপ আর ট্রেসিং বের করা, সম্মানিত লেখক/ শিল্পীদের বাসায় পত্রিকা নিয়ে দৌড়ানো আর লিখা নিয়ে আসা, ফোনের পর ফোন আর কিছু জেনুইন আইডিয়ার জন্য মাথা কুটে মরা। হঠাত হঠাত ভাগ্যক্রমে সপ্তাহে একটা দুইটা চিঠি আসতো, দূর-দূরান্ত থেকে পাঠকেরা এইসব ট্র্যাশ পড়ে আবার একটা ফিডব্যাক লিখার কষ্টটাও স্বীকার করতেন।

হলুদ খাম আর অচেনা মানুষের আগোছালো হাতে লিখা একটা ফুলস্কেপ কাগজও যে কাজের সব কষ্ট আর স্ট্রেস ভুলিয়ে দিতে পারে, সেটা আগে কখনো জানতাম না।


আজাইরা আঁকাআঁকিগুলা তুলে রেখে দেই…

cartoon-bs_00001

cartoon-bs_00002

cartoon-bs_00003

cartoon-bs_00005

cartoon-bs_00006

আর গ্রাহাম শ’এর লেকচারটা দেখে নিন। সম্ভবত আপনিও দু’চারটা কার্টুন আঁকতে লেগে যাবেন 😉

Advertisements