এটা বছর দশেক আগের সেই সময়ের কথা যখন ছেলেপেলের হাতে নোকিয়া এন-সিরিজের ফোন থাকা মানেই আইফোনের পার্ট, ডিভিডিতে মুভি দেখার যুগ আর সদ্য স্কুলের খোলস ছেড়ে মুক্তির স্বাদ পাওয়া **পাকনা তরুণসমাজের হাতে হাতে চাইনিজ চার-পাঁচ ইঞ্চি স্ক্রিণের ফোন (বড় স্ক্রিণের ফোনে অবশ্য “রোমান্টিক অ্যাকশন মুভি” দেখতে সুবিধা)। কলেজের পড়াশোনার এক্সক্রুশিয়েটিং চাপ আর সমাজ-দেশ ও জাতির প্রত্যাশা (?!) পূরণের দোলাচালে বেচারা ছেলেপেলেগুলা হাঁপিয়ে উঠতে গেলেও এই কলেজের শিক্ষক মহোদয় আন্তরিকভাবে তা নস্যাৎ করে দিতে সদা সচেষ্ট থাকতেন।

অবশ্য কলেজটা ছেড়ে যে মুহূর্তে বেরিয়ে আসলাম, কেন যেন পেছনে ফেলে আসা লাল ইট আর পুরনো গাছগুলোর সোঁদা গন্ধ সারাজীবনের জন্যে মোহাচ্ছন্ন করে রেখে দিল……

কলেজে পড়াকালীন সেকেন্ড ইয়ারের ঘটনা, তারিখটা পর্যন্ত মনে আছে – ২৩ অক্টোবর, ২০০৮ !

দ্যাট স্পেশ্যাল ডে হোয়েন ইচ এন্ড এভরি স্টুডেন্ট অফ গ্রুপ টু স্টুড আপ অন দ্যা বেঞ্চ উইথ কান ধরা, এক্সেপ্ট……………… দ্যাট স্পেশ্যাল ওয়ান !

সায়েন্স গ্রুপ টু’তে নির্ঝর অধিকারী স্যার আমাদের পড়াতেন ইংরেজী। ইংলিশ ফর টুডে ক্লাসে বই না আনলে ধুন্ধুমার কান্ড লাগিয়ে দিতেন। ল্যাবের কাগজপাতি, ফিজিক্স কেমিস্ট্রির ভারী ভারী বই, মুভির ডিভিডি আরও কত হাবি জাবি দিয়ে ব্যাগ ভরা আমাদের, ফিফটি পারসেন্ট ভাইবেরাদার কখনোই বই আনতাম না। প্রত্যেকদিন ক্লাসের আগে পাশের আর্টস জি গ্রুপের ক্লাস থেকে জানালা দিয়ে ‘ভাই বইটা একটু দে’ সিস্টেমে বই এনে চালিয়ে দিতাম। দুর্ভাগ্যবশত একদিন ওদের ইংরেজী ক্লাস ছিলো না, আর ঐদিন স্যারের মেজাজও খারাপ ছিলো। ক্লাসে এসে শুরুতেই বই না আনা পার্টিদের কান ধরে বেঞ্চের উপর দাঁড়াতে বললেন। মুহূর্তেই অর্ধেকের বেশি পোলাপান দাঁড়িয়ে গেল (এইসব ক্ষেত্রে আমাদের লজ্জা শরম একটু কমই ছিলো)

NDC Punishment
নিজের পায়ে দাঁড়াতে শেখা


ঐতিহাসিক সেই মুহূর্তের সাক্ষী হয়ে থাকতে যারা বই এনেছিলো, তারাও টুক করে সেটা ব্যাগে ঢুকিয়ে উঠে গেলো বেঞ্চে… কেবল মাত্র একজন, সেই একজন বন্ধু যিনি সম্ভবত ল্যাব রিপোর্ট লেখায় বিজি ছিলেন।

পোলাপানের ঘটনা দেখে স্যারের মুখ আরও থমথমে……… মিনিট পাঁচেক পিনপতন নীরবতা। ফাকেফোকে আমরা ব্যাকবেঞ্চ থেকে যার যা আছে, তাই নিয়ে ফটু তোলার চেষ্টায় রত (সেলফি তোলার ট্রেন্ডটা ঐ সময়ে চালু থাকলে ওয়ার্ল্ডস বেস্ট সেলফি ঐ সময়ে তোলা যাইতো ফর শিওর)।

NDC 4
ভিন্ন অ্যাঙ্গেল থেকে সেই ঐতিহাসিক দিন


যা হোক, এক পর্যায়ে স্যার আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না, ফেটে পড়লেন হাসিতে, আর আমরাও সেই বিখ্যাত ওওওওওওওওওওও এবং ‘উইইইইইইইইই’ সহকারে তাতে যোগ দিলাম !

নির্ঝর স্যার কলেজের চাকরি ছেড়ে দেবার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজী বিভাগের সামনে একবার দেখা হয়েছিলো। কলেজে ওনার সাথে ব্যক্তিগত জানাশোনা ছিলো না, কিন্তু পরিচয় দিতেই একেবারে আপন করে নিলেন। এরপরে ক্রুশ্যাল কিছু ব্যাপারেও ওনার অনেক হেল্প পেয়েছিলাম।

কি কারণে ? স্রেফ, তাঁর অচেনা একজন ছাত্র হিসেবে, সেই পরিচয়ে।

রক্তের বন্ধন, যায় না খন্ডান !


নোটঃ এই কলেজের সুনাম দুর্নাম যাই কিছু থাকুক না কেন, ইনোভেটিভ অপমান আর শাস্তির জন্য চ্যাম্পিয়নশিপ দেয়া যেতে পারে নিঃসন্দেহে। ফিজিক্যাল মারামারি শাস্তির কোন প্রয়োজন নাই, মানসিক নির্যাতন যথেষ্ট……

NDC 2
নির্ঝর স্যারের ক্লাসে, অন্য এক দিন। বই না-আনা পার্টির সংখ্যা ঐদিন বেশ কম ছিল……
Punishment 2
হাতে হারিকেন, মাথায় ব্যাগ……
Advertisements