ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ সম্প্রতি ইভনিং এলএলএম কোর্স চালুর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন, এবং এই সংক্রান্ত একটি চিঠির ভিত্তিতে অনলাইনে ডিপার্টমেন্টের সাবেক এবং বর্তমান শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদের ঝড় বয়ে যাচ্ছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে আমার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ, যা হয়তো অনেকেরই ভালো লাগবে না।


 

একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞানগত উন্মেষের জায়গাটুকু সীমাবদ্ধ করে দেয়ার বিষয়টি আমি ব্যক্তিগতভাবে সমর্থন করতে পারি না। সম্মানিত সিনিয়র এবং স্নেহের জুনিয়র ভাইবোনেদের বেশিরভাগই হয়তো আমার এই দৃষ্টিভঙ্গীতে বিক্ষুদ্ধ হতে পারেন, সেই রিস্কটুকু নিয়েই এটা বলছি। ঢালাওভাবে গালিগালাজ খাওয়ার আগে আমার আর্গুমেন্টটা অন্তত পেশ করতে চাই।

এক ঘন্টার একটা ঝড়ে বক মরে টাইপ এমসিকিউ পরীক্ষা কোনভাবেই মানুষের সত্যিকার মেধা-আগ্রহ এবং প্যাশনকে মূল্যায়িত করতে পারে না, সেটা জুডিশিয়ারী-বিসিএস এর প্রিলি হোক, বার কাউন্সিলের প্রিলি হোক কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তিপরীক্ষা। অবশ্য এছাড়া আপাতত উপায়ও নেই, সীমিত সম্পদ আর অগণিত মানুষের দেশে সারভাইভাল অফ দ্য বেস্ট নয় বরং সারভাইভাল অফ দ্য ফিটেস্ট নীতিতে আমরা যে যার জায়গাটুকুতে পৌছাতে চেষ্টা করি, এবং একবার পৌঁছতে পারলে সেটা আঁকড়ে ধরি একান্নবর্তী পরিবারের ইনসিকিউরড সদস্যদের মত করে। এভাবেই জন্ম নেয় কাল্ট কালচার, সংকীর্ণ আঞ্চলিকতা, ইজম আর উগ্র জাতীয়তাবাদ।

নিওলিবারেল কাঠামোতে শিক্ষা যখন একটা পণ্য (এটা আমরা যত দ্রুত স্বীকার করে নেব, ততই মঙ্গল) তখন এর বিপণনটুকুও সে মানের হওয়া জরুরী। আইন বিভাগে নৈশকালীন কোর্স চালু করা নিয়ে হৈচৈ হচ্ছে, এর পক্ষে-বিপক্ষে অনেকগুলো যৌক্তিক কারণ আছে, কোনটাই ফেলে দেবার মত নয়। রেজাল্ট যথাসময়ে না পাবার কারণ স্রেফ দু’-তিন মাসের জন্য ২০১৫ সালের বার কাউন্সিল পরীক্ষা মিস করেছি আমরা। যেখানে আজকে প্র্যাকটিস জীবনে আমাদের সুপ্রীম কোর্টের জন্য কোয়ালিফায়েড পর্যায়ে চলে আসার কথা, সেখানে দুইটি বছর পিছিয়ে গিয়ে জজকোর্টে এনরোলড হবার জন্য আরও এক বছর অপেক্ষার চক্রে পড়ে আছি আমরা। অনার্স – মাস্টার্স মিলিয়ে পাঁচ বছরের ডিগ্রী সাত বছরে নিয়ে (এবং স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, জ্ঞানগত অর্জন প্রায় শূণ্যের কোঠায়) বের হয়ে স্রেফ দু’টো সার্টিফিকেট, একদল ছন্নছাড়া মেধাবী বন্ধুবান্ধব আর এক-দুইজন শিক্ষক মেন্টর ছাড়া প্রতিষ্ঠান হিসেবে “প্রাচ্যের অক্সফোর্ড” আমাকে খুব বেশি কিছু দিয়েছে বলে মনে পড়ে না।

প্রশ্ন হচ্ছে, এই বিষয়গুলো নিয়ে আমরা এমনিভাবে সোচ্চার হয়েছিলাম কি কখনো, নৈশ কোর্স চালু করার কথা চাউর হবার আগে ?

Evening LLM

আজকে আমাদের দাবীর মুখে, আমাদের পড়ায় না রেজাল্ট দেয় না ইত্যাদি ইত্যাদি, যদি নৈশকালীন কোর্স বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে বাঙ্গালীর বিষের মত আমাদের প্রতিবাদও কি থেমে যাবে ? সেই রেজাল্ট জট, সেই স্বপ্ন নষ্ট করা সময়ের অপচয় আর পরিত্যাক্ত কারিকুলামের পড়াশোনা? এর সমাধান কোথায় ?

যা হোক, শিক্ষা যখন পণ্যই হচ্ছে, তখন তো আমি চাইবো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ আরও অনেক বেশি “ব্যবসায়িক” হোক। এখানে পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমা, সামার স্কুল, সামার কোর্স, নতুন ডিপার্টমেন্ট (ক্রিমিনোলজি কেন সোশ্যাল সায়েন্সে ?), সার্টিফিকেট কোর্স, অনলাইন-অফলাইন মাস্টার্স সব কিছুই খোলা হোক। অবমাননাকর রাতের কোর্স না খুলে আমাদের রেগুলার মাস্টার্স কোর্সই বরং সবার জন্যে ওপেন করে দেয়া হোক, কম্পিটেটিভ পরীক্ষায় টিকে কোন অজপাড়াগায়ের প্রতিষ্ঠান থেকে আইন বিভাগে মাস্টার্স করতে আসার মত যোগ্যতা যদি কেউ দেখায়, তাকে স্বাগত না জানানোর মত সংকীর্ণতা রাখাটা হবে ধৃষ্টতা। বিদেশী ছেলেমেয়েরাও এইখানে পড়তে আসুক, রিসার্চ করুক, রিসার্চের ফান্ড দেয়া হোক, আমাদের ছেলেমেয়েরা ডিপার্টমেন্টের ফান্ডেড ট্রিপে বাইরে যাক। শিক্ষক হিসেবে শুধু অ্যাকাডেমিশিয়ান নয়, বরং প্রফেশনালদেরকেও আমন্ত্রণ জানানো হোক। মাহমুদুল ইসলাম স্যার, ডঃ কামাল হোসেন বা ডঃ জহিরের মত মানুষজন এখানে পড়িয়ে গেছেন। সেই ক্যালিবারের মানুষদের হাতে আইন বিভাগের ছেলেমেয়েরা পড়াশুনা করলে শিক্ষকদের মান-সম্মান কমবে না বেড়ে যাবে ?

স্রেফ করিডোরে আর টয়লেটে সাদা টাইলসআর ক্লাসরুমে এসি লাগিয়ে কসমেটিক ডেভেলপমেন্ট করা আর রডের বদলে মুলিবাঁশের উপর ঢালাই করে ছাদ তৈরি করা একই কথা।

অতএব, আজন্মকাল চলে আসা যে সমস্যাগুলো আমাদের আইন বিভাগে রয়েছে, যার প্রতি আমাদের অনেক শিক্ষকও সহনশীল, সেই বিষয়গুলো আগে সমাধান করা হোক। ঢালাওভাবে ইভনিং এলএলএম এর বিরোধিতা (মার্কেটে আমার কম্পিটিটর বেড়ে যাবে এই ভয়েই কি ?) করবার চেয়ে যেটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা হলো, বড় একটা স্বপ্ন, পরিবারের দায়-দায়িত্ব এবং ভবিষ্যতের একটা সাজানো ছবি নিয়ে সদ্য কলেজ পাস করা একটা ছেলে বা মেয়ে যখন এই বিভাগে পড়তে আসে, তাদের সব স্বপ্ন-পরিকল্পনা চুরমার করে অর্থগৃধু জ্ঞানতাপস সাজবার মত ভন্ডামীগুলোও বন্ধ হোক……

Advertisements