Movie Review: ডেড পোয়েটস সোসাইটি (১৯৮৯)

জীবনানন্দ বলেছিলেন ‘যে জীবন দোয়েলের ফড়িঙের, মানুষের সাথে তার হয় নাকো দেখা’।

বাংলাদেশের মত সীমিত সুযোগের দেশে সদ্য স্কুল-কলেজ পেরোনো ছেলেমেয়েগুলোর জন্য সম্ভবত এটা খুব নির্মম একটা সত্য হয়ে দাঁড়ায়। পরিবারের চাপিয়ে চেয়া চাহিদা আর সমাজ-রাষ্ট্রের সেট করে দেয়া “স্ট্যান্ডার্ডের” যূপকাষ্ঠে প্রতিনিয়ত নিহত হতে থাকে ব্যক্তি হিসেবে নিজের স্বপ্ন-আগ্রহ আর ইচ্ছেগুলো। গ্রীক পুরাণের ইকারুসের সূর্য ছোয়ার স্পর্ধা আর প্রাণপন চেষ্টাও একটা পর্যায়ে এসে বিফল হয়ে যায় দেদীপ্যমান সূর্যের খরতাপে, তার রঙ্গিন পালকের ভেতর থেকে গলে পড়া মোমের মত আমাদের মনের ভেতরকার লুকোনো ইচ্ছেগুলো একে একে ঝেড়ে ফেলে আমরা হয়ে উঠতে থাকি গোমড়ামুখো “সফল” (?!) মানুষ।

DPS 3

রিয়েলিজম আর রোমান্টিসিজমের এই দ্বন্দ্ব অবশ্য তৃতীয় বিশ্বের বাংলাদেশেই নয়, সম্ভবত সারা পৃথিবীজুড়েই প্রকটভাবে বিদ্যমান। ডেড পোয়েটস সোসাইটি আমাদেরকে সেরকম একটি আখ্যানের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়।

আর দশটা হাই স্কুল ড্রামার মত ১৯৮৯ সালে মুক্তি পাওয়া এই ডেড পোয়েটস সোসাইটি মুভিটিও একটা স্কুল, তার ছাত্র আর একজন ভিন্নধর্মী শিক্ষককে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয় স্বপ্ন আর বাস্তবতার টানাপোড়েনের ভেতর দিয়ে। তবে সাহিত্য বিশেষত কবিতার মধ্য দিয়ে যে দর্শনের সাথে এইখানে আমরা পরিচিত হই তার স্বাদটা অনন্য।

অভিজাত সমাজের ছেলেদের জন্য রক্ষণশীল এক বোর্ডিং স্কুল ওয়েলটন একাডেমি। দুর্দান্ত সম্ভাবনাময় ছাত্র হিসেবে এখানে পড়তে আসে টড অ্যান্ডারসন, নিল পেরি, রিচার্ড, স্টিভেন, চার্লি সহ আরও অনেক অভিজাত তরুণ, যাদের পারিবারিক ঐতিহ্য এবং সম্পদ তাদেরকে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। তবে তারা ইংরেজি সাহিত্যের শিক্ষক হিসেবে জন কিটিং নামের এক পাগলাটে মানুষকে পান, যিনি তাদের কবিতা পড়ার এবং কবিতা অনুভব করবার দৃষ্টিভঙ্গিই সম্পূর্ণ পাল্টে দেন। কবিতার ব্যাখ্যা নিয়ে গুরুগম্ভীর তাত্ত্বিক পাঠ্যবইয়ের পৃষ্ঠা ছিড়ে ফেলবার মাধ্যমে যার শুরু, নির্জন গুহায় বসে কবিতার রস আস্বাদন এবং জীবনকে নতুনভাবে উপভোগ করবার স্বপ্নের মধ্য দিয়ে সে যাত্রা অব্যাহত থাকে। জন কিটিং তার ছাত্রদেরকে পরিচয় করিয়ে দেন ডেড পোয়েটস সোসাইটি’র সাথে, সেই সমিতির সভায় আলোচনা হয় রোমান্টিক কবি হেনরি ডেভিড, শেলি বা বায়রনের কবিতা। তরুণ ছাত্রদের মধ্যে তিনি গেঁথে দেন Carpe Diem – Seize the Day আপ্তবাক্যটি, আমন্ত্রণ জানান ক্ষণস্থায়ী জীবনটাকে নিজেদের মত করে সাজিয়ে নেবার জন্যে।

DPS 1

অবশ্যম্ভাবীভাবে এরপর শুরু হয়ে যায় রক্ষণশীল মনন এবং রোমান্টিক মননের দ্বন্দ্ব। দূঃখজনক এক ঘটনায় শেষ পর্যন্ত ওয়েলটন একাডেমীর শিক্ষকতা থেকে বিদায় নিতে হয় জন কিটিংকে। তবে যাবার আগে, অর্থাৎ মুভির শেষ দৃশ্যে তিনি তার ছাত্রদের কাছ থেকে যে বিদায় সম্ভাষণ পান, লোমখাড়া করা সেই দৃশ্যটি স্মৃতিতে আটকে থাকবে অনেকদিন।

পিটার উইয়ারের পরিচালনায় মুভিটিতে শিক্ষক জন কিটিং এর চরিত্রে রবিন উইলিয়ামস অসাধারণ অভিনয় করেছেন, যার জন্যে পেয়েছিলেন অস্কার নমিনেশন। টড অ্যান্ডারসন হিসেবে একেবারে তরুণ বয়সের ইথান হক কাঁপিয়ে দিয়েছেন আবেগী অভিনয় দিয়ে, আর অন্যান্য সকল চরিত্রই ছিল প্রাণ ছুঁয়ে যাওয়া। ফলাফল হিসেবে ডেড পোয়েটস সোসাইটি চারটি অস্কারের জন্য নমিনেশন (এবং সেরা চিত্রনাট্য হিসেবে অস্কার জয়), বাফটা, গোল্ডেন গ্লোব সহ অসংখ্য পুরস্কারের জন্যে মনোনীত হয়েছিল, এবং বেশ ক’টি ক্ষেত্রে পুরস্কারও জিতে নিয়েছিল।

রটেন টম্যাটোজে এর রেটিং ৮.৫, আর আইএমডিবি রেটিং ৮.০ অর্জনের পাশাপাশি বক্স অফিসেও সাড়া ফেলেছিল মুভিটা। আর জন কিটিং এর অমর সেই ডায়ালগ –  “Carpe Diem – Seize the Day, Make your lives extraordinary”  আমেরিকান ফিল্ম ইনস্টিট্যুটের সর্বকালের সেরা ১০০ মুভি কোটের তালিকায় ৯৫ নম্বর স্থানে রয়েছে।

২০১৪ সালে রবিন উইলিয়ামস যখন আত্নহত্যা করেন, তার স্মরণে পৃথিবীজুড়ে ভক্তরা তার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে বেছে নিয়েছিলেন এই মুভির অন্যতম সেরা ডায়ালগ, ওয়াল্ট হুইটম্যানের কবিতার লাইন – “O Captain, my Captain !”

সবার মাস্ট-ওয়াচ চলচ্চিত্রগুলোর তালিকাতেই এটা থাকা উচিৎ।

O Captain My Captain
মুভির শেষ দৃশ্য – O Captain, My Captain

 

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

w

Connecting to %s